ফেলুদার শারীরিক গঠন অনেকটা জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র নানি-নাতি চরিত্রের নাতির মতো! ফেলুদা হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে ঝালমুড়ি-পেঁয়াজু বিক্রি করেন। তবে মাঝেমধ্যে রিকশাও চালান। একদা তার শখ হলো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করবেন। এতে এলাকাবাসীও বেশ উত্ফুল্লের সহিত তাকে সমর্থন দিতে লাগলেন! সবার সার্বিক সহযোগিতায় অবশেষে তিনি একদিন নমিনেশন পেপার জমা দিয়ে আমাদের ৮নং ওয়ার্ডের গর্বিত মেম্বারপ্রার্থী হয়ে গেলেন। এদিকে তার এই নির্বাচন কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে আমরা এলাকার সকল আবাল-বৃদ্ধবণিতা একযোগে মাঠে নামলাম। যে করেই হোক; আমাদের ফেলুদাকে পাস করিয়ে তবেই আমরা ঘরে ফিরব! এভাবে দিন নেই, রাত নেই; নাওয়া-খাওয়া ভুলে সর্বক্ষণ আমরা তাকে জয়যুক্ত করার মহাপরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এতে পোস্টার লাগানো থেকে শুরু করে এলাকার মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানগুলোতেও উত্সব-আমেজের ধুম পড়ে গেল। যে যেমনে পারছেন চা-টা খাওয়াচ্ছেন; বিল পরিশোধ করছেন। কোনো কার্পণ্য নেই। শুধু তাই-ই নয়, এতে এলাকার সকল রিকশাওয়ালা ভাইয়েরাও একজোটে জানপ্রাণ দিয়ে খাটতে লাগলেন। সেইসঙ্গে প্রতিদিন নিয়ম করে রিকশায় বসিয়ে আমাদের অত্র ওয়ার্ডের প্রতিটি অলিগলিতে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে তাকে ঘুরাতে লাগলেন। এতে চলমান রিকশায় উপবিষ্ট আমাদের প্রিয় ফেলুদাকে সবাই সালাম দেয়; তিনি সমূহ ভবিষ্যত্ মেম্বার হওয়ার সুখ-ভাবনায় হাত উঁচিয়ে সেই সালামের জবাব দেন। আবার ক্ষণে ক্ষণে রিকশা থেকে নেমে এলাকাবাসীর হাত ধরে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিমূলক বাক্য আওড়ান! নির্বাচনে জিতলে তিনি অমুক করবেন, তমুক করবেন! আবার অনন্ত জলিলের মতো আধুনিক ফোরজি গতিতে সব অসম্ভবকেই রাতারাতি সম্ভবও করে ফেলবেন। চোর-ডাকাত মেরে সব তক্তা বানিয়ে এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনবেন ইত্যাদি ইত্যাদি! এমন নরমগরম প্রতিশ্রুতি পেয়ে আমরা এলাকাবাসীও এক অন্যরকম সুখস্বপ্নে তাকে পুরো সমর্থন দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাম।
অন্যদিকে একই গ্রামের ফেলুদার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাক্তন শফিউদ্দিন মেম্বার ফেলুদার এহেন জনপ্রিয় নির্বাচনী ইস্তেহার এবং ঘাটে মাঠে পুকুরে সর্বত্র এমন জনপ্রিয়তা দেখে ভড়কে গেলেন। সমূহ পরাজয়ে ভীতু হয়ে তিনি আমাদের নানা কৌশল ও বিভিন্ন লোভনীয় প্রস্তাবে তার দিকে ভেড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। যেমন :একদিন গভীর রাতে ইয়া বড় বড় দুটি খাসি জাবাই করে তিনি আমাদের তার অন্দর মহলে ডাকলেন। আমরা পড়লাম মহা-ফ্যাসাদে! কী করি... কী করব! একসঙ্গে কয় ডিঙ্গিতে পা রাখব? এমনিতেই শফিউদ্দিন মেম্বার যে রগচটা লোক! পরে যদি বিশেষ কোনো ক্ষতি করে ফেলে! আবার এটাও ভাবি, ফেলুদা আমাদের খাওয়াতে পারেন না সত্য; কিন্তু তার মতো আন্তরিক উদার মনের মানুষ খুব কমই হয়! অবশেষে আমরা কয়েকজন বাধ্য হয়েই গভীর রাতে শফিউদ্দিন মেম্বারের বাড়ি উপস্থিত হলাম। তার স্থায়ী বাবুর্চি ফখরুদ্দিনের রান্না করা বিরিয়ানির মৌ মৌ সুগন্ধে পুরো বাড়ির আকাশ-বাতাসে সুবাস ছড়াচ্ছে! দীর্ঘ নিঃশ্বাসে আমরা সেই সুগন্ধ নাকে টেনে অনেকক্ষণ দম বন্ধ করে রাখি। আহা! কতকাল এমন বিরিয়ানি খাইনি! গোপনে আমাদের প্রত্যেকের জিভের পানি টলটল করতে লাগল। আমরা ঘনঘন ঢেঁকুর গিলে সেই বিরিয়ানির সমূহ স্বাদ আস্বাদন করতে লাগলাম। সত্যি বলতে কি, আমরা তখন ফেলুদার কথা ভুলেই গেলাম! বড় বড় গোস্তের টুকরোয় মিহি চালের বিরিয়ানি! আহা! কী যে স্বাদ! এমন বিরিয়ানি ফেলুদার চৌদ্দ গোষ্ঠী কখনো চোখে দেখেছে? আর আমাদের খাওয়ানো তো দূরের কথা!
পরের দিন শফিউদ্দিন মেম্বারকে নিয়ে আমরা পুরো গ্রামের অলিগলিতে এক বিশাল মিছিল নিয়ে চক্কর মারলাম! ‘জিতলে মোদের শফি ভাই... মোদের কোনো চিন্তা নাই!’ ‘শফি ভাই তোমার ভয় নাই... আমরা আছি তোমার সাথে!’ ইত্যাদি ইত্যাদি স্লোগানে আমরা পুরো ওয়ার্ড কাঁপিয়ে তুললাম! এদিকে এলাকায় সমস্ত রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সমস্ত গ্রামবাসীরাও আমাদের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকায়! ব্যাপার কী? এক রাইতেই দুনিয়া উল্টায়া গেল? ক্যামতে কী?
আজ ভোটের দিন। ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনায় তেঁতুলঝোড়ার স্কুল মাঠ প্রাঙ্গণ সাজসজ্জায় ঝলমল করছে। মাঠের একপ্রান্তে প্রার্থীদ্বয়ের বিশাল বড় বড় দুটি ছবি শোভা পাচ্ছে। এদিকে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে ভোটারের সংখ্যাও বাড়তে লাগল। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সকল শ্রমজীবী ভোটাররা ফেলুদার সমর্থকদের কাছ থেকে টোকেন সংগ্রহ করতে হুমরি খেয়ে পড়ল। এই দেখে আমরা ভড়কে গেলাম! আর একে অপরের সঙ্গে বলতে লাগলাম, ‘আমরা যে এত বস্তার বস্তা টাকা উড়ালাম; সেই ভোটাররা কই? তাদের কেউ কেউ দেখছি ফেলুদার সমর্থকদের কাছ থেকে টোকেন সংগ্রহ করে ভোট দিয়ে হাসতে হাসতে বের হয়ে আসছেন।’ এভাবে নানা চড়াই-উতরাই, সামান্য তর্ক-বিতর্ক পেরিয়ে অবশেষে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হলো। আমরা টানটান উত্তেজনায় ফলাফলের আশায় মাঠের এক প্রান্তে চুপটি মেরে বসে রইলাম। হঠাত্ মাইকে ঘোষণা—সুপ্রিয় এলাকাবাসী! এবার চূড়ান্ত ফলাফল! অত্র নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে নব্য প্রার্থী ফেলু মিয়া, প্রাক্তন মেম্বার শফিউদ্দিন সাহেবকে মাত্র ২ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।
মুহূর্তেই ফেলুদার সমর্থকেরা মাঠ কাঁপিয়ে হর্ষধ্বনিতে মেতে উঠলেন। ফেলুদাকে তারা পুনঃ পুনঃ শূন্যে ছুড়ে আবার কোলে নিয়ে আনন্দে নাচতে লাগলেন! আর আমরা বিড়ালের মতো মাথা নিচু করে মাঠ ত্যাগ করে বাড়ি চলে এলাম। তবে সবিশেষ গোপন কথাটি শেষতক আপনাদের জানিয়ে যাই! বউ তানিয়া ও আমার ভোটটি কিন্তু শফিউদ্দিন মেম্বারের তালগাছ মার্কায় পড়েনি! পড়েছে ফেলুদার রিকশা মার্কায়! কারণ আজ থেকে ১০ বছর পূর্বে সেই বৃষ্টিস্নাত আষাঢ়ে রাতের কর্দমাক্ত রাস্তায় এই ফেলুদাই তার রিকশা যোগে আমাদেরকে বাসর ঘর অবধি পৌঁছে দিয়েছিলেন! ভুলি কিভাবে?
হেমায়েতপুর, সাভার, ঢাকা