সুলতান হেমেতের টিউলিপ উত্সব

 ‘আপনাদের পাশের গলির পামুক প্যালেস বাড়িটি কি ওরহান পামুকের বাড়ি?’—হোটেল থেকে প্রাতঃরাশের সন্ধানে বেরিয়ে যাবার সময়ে রিসেপশনের যুবককে জিজ্ঞেস করি। গতকাল সন্ধ্যায় এ হোটেলে যখন ঢুকি, তখন তিনি একপাল বন্ধু নিয়ে সামনের জায়গাটিতে আড্ডার আসর বসিয়েছিলেন। তাদের একজনের মস্ত বড়ো হারলে ডেভিডসন বাইক ঢোকার মুখের দরজাটিকে প্রায় আদ্দেক আগলে দাঁড়িয়ে ছিল। আর এই আসরে অভ্যাগতদের চেহারা-সুরত দেখে মনে হয়েছিল—যেন সকলেই কোনো গুণ্ডা গ্যাং-এর সদস্য। হোটেলে ঢুকতে গিয়ে বেশ ভয় খেয়ে গিয়েছিলাম। এ বেলায় তাই প্রশ্নটি করলাম খানিকটা সভয়ে। সামনে থাকা টুথপিকের হোল্ডার থেকে একটি কাঠি বার করে দাড়ির জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া ঠোঁটের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়ে তিনি কিছুটা তাচ্ছিল্যের স্বরে জবাব দিলেন, ‘ওরহান পামুক? তিনি আবার কে? কার কথা বলছেন?’ বুঝে গেলাম—ভুল নম্বরে ডায়াল করে ফেলেছি। তাই কাঁচুমাচু স্বরে বললাম—‘পামুক! মানে, ওই যে যিনি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন, আপনাদের শহরের সাহিত্যিক।’ যুবকের কণ্ঠে তবুও একরাশ বিরক্তি। যেন আমার এমন সব অদ্ভুত প্রশ্নের হাত থেকে রেহাই পেলেই বাঁচোয়া। রিভলভিং চেয়ারে একটি মোচড় দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন—‘দেখুন, পামুক এখানকার এক পদবি। এ শহরে কম করে হলেও হয়তো কয়েক হাজার পামুক আছে। ওই ধরুন—যারা সুতি কাপড়ের ব্যবসা করতেন, তারাই পামুক পদবির অধিকারী। কিন্তু তাই বলে শহরের সব পামুকই তো আর আপনার সেই ওরহান পামুকের জ্ঞাতি সম্পর্কীয় না। পরের গলির বাড়িটি হবে সেই হাজার পামুকের কোনো একজনের।’ এটুকু বলে তিনি লেজার খাতা বার করে সেদিনের বোর্ডারদের লিস্টে চোখ বোলানো শুরু করেন। বুঝে নিলাম, এ নিয়ে বিন্দুমাত্র কথা বাড়াতে তিনি আর ইচ্ছুক নন।

হোটেল থেকে বেরিয়ে আমি টাকসিম স্কয়ারের পথে হাঁটি। স্কয়ারটি এ বেলায় কিছুটা সুনসান। অফিসগামী দু-একজন কাঁধে র?্যাক্সিনের ফাইলব্যাগ ঝুলিয়ে হনহনিয়ে হেঁটে চলেছেন মেট্রো স্টেশনের পানে। আমাকেও ওই স্টেশনেই যেতে হবে। সেখান থেকে ফিউনিকুলার চেপে কাবাতাস স্টেশনে নেমে তারপর ট্রামে করে সুলতান হেমেত।

সকালের অলস সময় বলে ফিউনিকুলারগুলো ছাড়ছে কিছুটা সময় বাদে বাদে। বোর্ডে টানানো সময়সূচি অনুযায়ী পরেরটি ছাড়বে আরো প্রায় মিনিট দশেক বাদে। যদিও সেটি এই মুহূর্তে যাত্রীর অপেক্ষায় দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে জনাকয়েক যাত্রী। আমি সামনের দিকের একটি ফাঁকা চেয়ারে বসি। উল্টোদিকে এক তরুণী। হলফ করে বলতে পারি, এ-ও আমার মতোই এ শহরে আগন্তুক। সেটি বুঝে নেবার জন্যে যে আমাকে বেজায় তীক্ষ পর্যবেক্ষণ-শক্তির দ্বারস্থ হতে হয়েছে, তেমন নয়। মেয়েটি যেহেতু কোলের ওপর শহরের ম্যাপ বিছিয়ে বেশ চিন্তিত চিত্তে কিছু একটা খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে, তাই এই বিশ্লেষণ বেশ সহজসাধ্য। ‘আমি কি কোনোভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি? যদিও আগেই স্বীকার করে নিচ্ছি, আমি নিজেও এ শহরে নবাগত।’ আমার কথায় মেয়েটি ম্যাপ থেকে মুখ উঠিয়ে আমার দিকে তাকায়। এবার আমি তাকে আরো খানিকটা পর্যবেক্ষণ করবার সুযোগ পাই। মেয়েটি কিছুটা শীর্ণকায়া। উন্মুক্ত কাঁধে আটকে থাকা সাদাটে টপসের স্ট্র্যাপের জায়গাটা ঢেকে রেখেছে মশারির মতো পাতলা এক ফালি কাপড়। কেশদাম পাটের আঁশের মতোই সোনালি। সেগুলো পনিটেইলের মতো পেছনে ব্যান্ড দিয়ে বাঁধা। মুখখানা কিছুটা ফ্যাকাসে। কেমন যেন এক নিষ্প্রাণ অভিব্যক্তি ছড়িয়ে আছে পুরো মুখখানিতে। আমার কথার প্রতিউত্তরে সে যখন জানায়, তার গন্তব্যস্থলও সুলতান হেমেত, তখন উচ্চারণ শুনে বুঝি—শ্বেতাঙ্গিনী এই মহিলা খুব সম্ভবত ইউরোপিয়ান নন। তার প্রকৃত নিবাসের খোঁজ নেবার আগেই কোনো স্টেশনে নেমে ঠিক কোথায় যাওয়া যায়, সে নিয়ে আমাদের মাঝে একটা শলাপরামর্শ হয়ে যায়। ঠিক হয়—প্রথমে গ্র্যান্ড বাজারে নেমে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে তারপর আমরা যাব টিউলিপ বাগানে। প্রথমেই বাজারে যাবার আরেকটি কারণ হলো, লিনা অর্থাত্ এই ভদ্রমহিলা সাথে থাকা কিছু ডলার তুর্কি লিরায় বদলে নিতে চান। 

গ্র্যান্ড বাজারে ঢুকতেই স্বাগত জানায় দুই পাশের দোকানে ঝুলে থাকা অজস্র বাহারি শেডের বাতি। সেগুলোর ঝলমলে আলোয় গুমোট চলার পথটা আলোকিত। সকালের দিক বলে ক্রেতাদের ভিড় কম। অনেকেই দোকানের বাইরে এসে আশপাশের দোকানের ভাই-ব্রাদারদের সঙ্গে খোশগল্প করছেন। বেচাবিক্রির তাড়া নেই। বাজারের ভেতরে অসংখ্য গলি-উপগলি। সে গলিগুলো কখনো ভরে ওঠে টার্কিশ ডিলাইট নামক মিষ্টির সুঘ্রাণে, আবার কখনো ঝলকায় সিলভারের শোপিসের প্রগাঢ় উজ্জ্বলতায়। কখনো আবার নাসারন্ধ্রে এসে ঢোকে নানা পদের চায়ের মিশ্র সতেজ ঘ্রাণ। তেমন একটি দোকানের সামনে কৌতূহলবশে থেমে দেখি, দোকানের সামনের ডালায় শুকনো গোলাপ-কুঁড়ির সমাহার। পাশে লেখা—লাভ টি। মানে, এটি হয়তো ভালোবাসাবর্ধক চা। হাতের মুঠোয় সেই বিশেষ টি-র খানিকটা নিয়ে গন্ধ শুঁকছি, এমন সময়ে পাশ থেকে লিনা বলে, ‘ডু ইউ ওয়ানট টু বাই সাম?’

‘নো, নট রিয়েলি’—বলে এড়িয়ে যাই, আর মনে মনে ভাবি, ‘এমন অজানা চা টেস্ট করার ঝুঁকি না নেওয়াই হয়তো ভালো। বলা তো যায় না, পরে দেখা গেল, চায়ের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাজারের পাগলা ষাঁড়ের মতো যাকে-তাকে ঢুস মারতে যাচ্ছি।’ লিনা হয়তো আমার মনের সেই কথাটি ধরতে পেরেই মুখ টিপে হেসে পরের গলির ‘মানি এক্সচেঞ্জ’ লেখা দোকানটির দিকে এগিয়ে যায়।

বাজার থেকে বেরিয়ে আসার মুখে চোখে পড়ে—ঢাকার ভ্রাম্যমাণ চটপটি গাড়িগুলোর মতোই দেখতে একটি ঠেলাগাড়ি। গায়ে লেখা—‘চেস্তানি, ১০০ গ্রাম ১০ লিরা’। সেখানে হালকা আঁচে ভাজা হচ্ছে চেস্টনাট। যিনি ভাজছেন, তার গায়ে ডাক্তারের পোশাকের ন্যায় সাদা অ্যাপ্রন। অনেকেই ঠোঙায় করে কিনে নিয়ে যাচ্ছে তার দোকানের গরমাগরম চেস্টনাট। আমরা সে দোকানটিকে পাশ কাটিয়ে আর পথের মাঝ দিয়ে তেড়ে আসা ট্রামের হাত থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে থাকি সুলতান হেমেতের দিকে। চত্বরের একদিকে বাঁধানো বসার স্থান। অনেকেই সেখানে বসে আশপাশের দোকানে বিক্রি হওয়া তরমুজের ফালিতে ঠোঁট রক্তিম করায় মত্ত। কাছেই কোথাও উচ্চ স্বরে মিউজিক বাজছে। আমি যখন মিউজিকের উত্সস্থল খুঁজছি তখন লিনা আমার দিকে ফিরে বলে, ‘তুমি খানিকক্ষণ এখানে আমার জন্যে অপেক্ষা করবে? আমার একটু টয়লেটে যাওয়া প্রয়োজন।’ ঠিক কোন স্থানটিতে বসে অপেক্ষা করব সেটি জানিয়ে দিলে লিনা হনহনিয়ে চত্বরের উল্টো দিকে টয়লেটের সন্ধানে ছুটে যায়।

আমি যেখানে বসি, গত বিকেলেও ঠিক সেখানেই বসেছিলাম। রাতের প্রমোদতরির টিকেট কিনেছিলাম যে লোকটির কাছ থেকে, তিনি আজও ডেকে ডেকে কাস্টমার খুঁজছেন। পরনে সেই গতকালের লাল গেঞ্জিটাই। আমাকে দেখতে পেয়ে সহাস্যমুখে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ডিড ইউ লাইক ইট ইয়েস্টার ডে?’ আমার ‘ইয়েস’ কথাটি শেষ হবার আগেই দেখি—তিনি চলে গেছেন পাশের এক টংঘরে। সেখান থেকে দুই কাপ হাতে করে এনে আমার হাতে এক কাপ ধরিয়ে বললেন, ‘অ্যাপেল টি, ভেরি টেস্ট, ইউ উইল লাইক। ড্রিঙ্ক। ড্রিঙ্ক।’ ভদ্রলোকের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে অ্যাপেল টিয়ের কাপে চুমুক দিয়ে বুঝি—এটি সেই আমাদের প্রথাগত চায়ের স্বাদের মতো নয়। কিছুটা চুকো ধরনের। হাতে চায়ের কাপ নিয়েই এবারে তিনি পথচলতি ট্যুরিস্টদের হাতে নৌকাভ্রমণের মূল্যতালিকার কাগজ ধরিয়ে দিতে লাগলেন। এই লোকটির খুব কাছেই আরেকটি লোক ট্যুরিস্টদের পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে। এই লোকটির পোশাক-পরিচ্ছদ কিন্তু বেশ পরিপাটি। পায়ে

চকচকে জুতো। গায়ে ধূসর রঙের ব্লেজার। চোখের নিচে সুরমা। গালে তামাটে বর্ণের চাপ দাড়ি। এমন একটি লোককে সেই টিকেটবিক্রেতা লোকটির মতো দু পয়সা কমিশনের ধান্ধায় খেটে মরা কেউ বলে মনে হয় না। আমি তাই কৌতূহলি হয়ে একদৃষ্টিতে তার কর্মকাণ্ড দেখি, আর সেইসঙ্গে উত্কর্ণ হয়ে শোনার চেষ্টা করি ট্যুরিস্টদেরকে প্রদেয় টোপের মর্মার্থ। প্রথমত খেয়াল করি, ইনি মূলত পথ আগলে কথা কইছেন, একাকী যে নারী ট্যুরিস্টরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাদের সঙ্গে। দ্বিতীয়ত, তার কথার বিষয়বস্তু হলো, সামনের পথটির একেবারে শেষ মাথায় তার একটি সুভেনির শপ আছে। তার সঙ্গে সেই শপে গেলে তিনি এখানকার অন্য যেকোনো দোকানের প্রায় অর্ধেক মূল্যে সুভেনির বিক্রি করবেন। সেইসঙ্গে যোগ করছেন, যেহেতু তার দোকানটি ঠিক মূল রাজপথের সান্নিধ্যে নয়, তাই বেচাবিক্রি কিছুটা কম হওয়ায় বাধ্য হয়ে এখান থেকেই ট্যুরিস্টদের পথ দেখিয়ে দোকানে নেবার জন্যে তিনি প্রস্তুত। বেশকিছু নারীর পথ আগলে এসব গালগল্প মারার পর কিছুটা যখন তিনি হতোদ্যম, সেই মুহূর্তে তার চোখ পড়ে আমার ওপর। আমি যে ঈগলের চোখে এতক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ করছি, সেটি তিনি বুঝে ফেলেন। আমার কাছে এসে মুচকি হাসি দিয়ে বলেন, ‘সিমস লাইক নো গার্ল লাভস মি টুডে।’ যেন তার মূল অভিসন্ধি ধরে ফেলেছি, এমন এক ভঙ্গিতে আমি বলি, ‘ধরে নিলাম কেউ তোমার টোপ গিলে না হয় তোমার দোকানে গেল। কিন্তু তারপর? তোমার আসল ধান্ধাটা কী? শুধুই দোকানের মাল বেচা তো তোমার মূল উদ্দেশ্য বলে মনে হচ্ছে না। ঝেড়ে কাশ।’ অমায়িক একখানা দন্তবিকশিত হাসি হেসে সে বলে, ‘আই লাইক গার্লস। আমি দোকানে নিয়ে প্রথমে তাদের সাথে খাতির জমাই। তারপর ইস্তাম্বুল ঘুরে দেখাবার কিংবা রাতে কোনো ডিস্কোতে নিয়ে যাবার অফার দেই।’ আমার চোখের অভিব্যক্তিতে ‘তারপর?’ শব্দটি বুঝতে পেরে সে এক হাতের মুঠো দিয়ে আরেক হাতে বার কয়েক ঘুষি মেরে বলে, ‘তারপর আর কী? ব্যাং ব্যাং ব্যাং।’ এই সময়ে দুই ইউক্রেনিয়ান মেয়ে খুব কাছ দিয়েই হেঁটে গেলে সে আমার সঙ্গে কথা থামিয়ে দ্রুত সেই মেয়ে দুটির পিছু নেয়। টিকেটবিক্রেতা লোকটি এই সময়ে ফিরে এসে রিরংসায় পুড়ে মরা যুবকের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে, ‘ডোন্ট লিসেন টু হিম। হি ইজ অ্যা ব্যাড গাই।’ 

এর মাঝেই লিনা ফিরে এসেছে। ওর নাকি টয়লেট খুঁজে পেতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল, সেজন্যেই খানিক বিলম্ব হয়েছে ফিরে আসতে। এই দু লাইনের কথাগুলো বলতে গিয়ে লিনাকে বারকয়েক থামতে হয়—সঠিক ইংরেজি শব্দ খুঁজে বার করার জন্য। বেশ লজ্জিতভাবে ও তারপর বলে, ‘আমি এখন একটা ব্যাংকে কাজ করি। কাজের প্রয়োজনেই কিছুদিন আগে থেকে ইংরেজি শিখছি। ভেবেছিলাম, বেশ শিখে গেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, কিছুই হয়নি। আবারও শুরু থেকে শিখতে হবে।’ আমি অভয় দিয়ে বলি, ‘আরে ধুর। ও কিছু না। ইংরেজি জানা আর বলতে পারা, দুটো একেবারেই ভিন্ন বিষয়। কিছুদিন যদি বলাটা অভ্যাস করো, তাহলেই দেখবে জড়তা একেবারেই কেটে গেছে।’ ও হ্যাঁ, ভালো কথা, গ্র্যান্ড বাজারের কয়েকটি দোকানে ঘুরে ঘুরে সওদা দেখবার সময়েই জেনে নিয়েছি, লিনার বাড়ি রাশিয়ায়। বছর দুয়েক আগে থিতু হয়েছে মস্কোতে। তার আগে প্রায় পুরো জীবন কাটিয়েছে সেভেরদভিন্সক নামক এক শহরে। ও যখন আমাকে সেভেরদভিন্সকের কথা বলেছিল, আমি চমকে উঠেছিলাম। কারণ, এই শহরটি স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের টপ সিক্রেট শহরগুলোর অন্যতম। মানচিত্রে অদৃশ্য হয়ে থাকা এক শহর। উত্তর সাগরের ধারে এই শহরটিতে তৈরি আর মেরামত করা হতো রাশিয়ার পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো। বাইরের বিশ্বের মানুষ দূরে থাকুক, রাশিয়ার অন্য শহরের মানুষেরও এখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। লিনার পিতা ছিলেন সাবমেরিন তৈরির কারখানায় মেকানিক। সেই সূত্রেই এই শহরে ওদের পরিবারটির পত্তন। শৈশবে নাকি স্কুলের বাকি সবাইয়ের সঙ্গে বেশ কয়েকবার দল বেঁধে গেছে সেই কারখানায়। ওখানেই পড়াশোনা শেষ করে লিনা একটি স্কুলে চাকরি নিয়েছিল।

‘স্কুলের চাকরি ছেড়ে হঠাত্ মস্কোতে গেলে কেন? আগের চাকরি ভালো লাগছিল না বুঝি?’—সুলতান হেমেতের কোণে চৌকোনা একটি স্থানে টিউলিপের বাগান গড়া হয়েছে। তবে তার কাছেই মিউজিক সিস্টেম লাগিয়ে চড়া বাদ্য বাজিয়ে দেওয়ায় ওখানে দাঁড়াতে ভালো লাগছিল না। আমরা তাই ওখান থেকে সরে এসেছি; হাঁটছি পাশের গুলহানে পার্কের দিকে। পার্কে ঢোকার মুখে লিনাকে আমি প্রশ্নটি করি। লিনার কাঁধে যে দুধের উপরিস্তরে পড়ে থাকা সরের মতো একখানা ফিনফিনে সাদা কাপড় ছিল, সেটিকে সেই মুহূর্তে ও ভরে নিচ্ছিল নিজের হাতব্যাগে। সেইসঙ্গে ব্যাগ থেকে বেরিয়ে এল কালো রোদচশমা। সকালের কুয়াশা ভাবটা কেটে এর মধ্যেই রোদের তীর্যক রশ্মি চুইয়ে পড়ছে গুলহানে পার্কের মেহগনি গাছের ঘন পত্রালীসম্ভারের মাঝ দিয়ে। বেশ দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছি পুরো পার্কটা ছেয়ে গেছে রঙের প্লাবনে। উজ্জ্বলবর্ণা টিউলিপের চাদর ঢেকে দিয়েছে পার্কের জমিন। সেদিকে তাকিয়ে লিনার উচ্ছ্বসিত ভাবটা গোপন থাকে না। দু পাশে জিগজ্যাগের মতো করে থাকা টিউলিপ বাগানকে রেখে মাঝের হাঁটাপথটি ধরে চলার সময়ে ও ফিরে আসে আমার আগের প্রশ্নে—‘একসময় ভাবতাম, স্কুল শিক্ষিকা হিসেবেই রিটায়ার করব। কিন্তু কয়েক বছর কাজ করার পরই ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। আমি যে স্কুলে পড়াতাম, সেটি ছিল সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুল। অনেকটা সংশোধানাগারের মতো। আচ্ছা, আমাকে এখানে একটা ছবি তুলে দেবে?’—স্কুলের কথাটি শেষ হবার আগেই লিনা ওর মোবাইল ফোনের ক্যামেরা আমার দিকে মেলে ধরে। টিউলিপের পাপড়িতে ডুবে থাকা ভঙ্গিমায় বেশ কয়েকটি ছবি তুলে দেবার পর ‘পেসিবা’ অর্থাত্ ধন্যবাদ জানিয়ে ও বলে—‘তো সেই স্কুলে পড়াতে গিয়ে দিন-দিন আমি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম। মানসিকভাবে। বোঝোই তো, এরা ঠিক আর দশটা বাচ্চার মতো নয়। অনেকেই দাগি অপরাধী। একদিন কী হলো শোন, সেদিন ছিল মাসের প্রথম দিন। বেতন তুলেছি। সব টাকা ছিল আমার পার্সে। ওটা একপাশে রেখে আমি হয়তো গিয়েছি ক্লাসের বাইরে। অল্প কয়েক মিনিটের জন্যে। সেদিন বাড়ি ফিরে দেখি, টাকাগুলো নেই। উধাও। খুব কাঁদলাম আমি। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম, আর নয় এই শহরে কিংবা এই চাকরিতে।’ লিনার কথায় হতাশা আর তিক্ততার অনুরণন থাকায় বুঝি, শুধু এমন এক মানসিক উত্পীড়নমুখী দিকের কারণেই যে চাকরি ছেড়েছে তেমন হয়তো নয়; হয়তো অর্থনৈতিকভাবেও চাকরিটি খুব একটা প্রণোদনাদায়ী ছিল না।  সেটি অবশ্য না হবারই কথা। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সেভেরদভিন্সক তার আগের জৌলুস হারায়। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকটি ছিল সবচেয়ে খারাপ। শিপ ইয়ার্ডে কাজ নেই। মেকানিক মজুররা মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছে না, এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এসব লিনার মুখেই শোনা। ওর বাবাকেও সেসময়ে খুব খারাপ সময় পার করতে হয়েছে। অনুমান করি, শহরটি হয়তো আজও সেই অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠে লিনার মতো শিক্ষিকাকে প্রাপ্য সম্মানী প্রদানের মতো অবস্থায় আসতে পারেনি।   

একচিলতে ঘাসে ছাওয়া জমিন পেয়ে আমরা সেখানে বসি।  অদূরেই একটি পরিবার তাদের তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে কাপড় বিছিয়ে বসেছে। দুটো বাচ্চা ছুটোছুটি করে পাশের টিউলিপ গাছে গিয়ে লুটিয়ে পড়ছে। তাদের মা বারবারই দৌড়ে গিয়ে পাকড়াও করে আনছে। লিনার রোদ চশমায় সে দৃশ্যের প্রতিফলন দেখে আমি জিজ্ঞেস করি, ‘ডু ইউ হ্যাভ চিলড্রেন? ওর হ্যাভ ইউ এভার থট অ্যাবাউট হাভিং চিলড্রেন?’ সেই একই পাণ্ডুর নিষ্প্রাণ মুখে লিনার জবাবু—‘নাহ, আমার বয়ফ্রেন্ড আছে। মস্কোয় আসার পর ওর সঙ্গে পরিচয়। তবে আমরা সন্তান নেবার কথা কখনো ভাবিনি।’—এটুকু বলেই ও আবার নীরব। আমি ভাবতে থাকি, রহস্যময় শহরের অবগুণ্ঠনে বেড়ে ওঠা এই নারীর মনোজগত্ও কি রহস্যের ছায়াতে ঘেরা? উত্তর সাগরের যে বিষণ্ন কালচে মেঘ বছরের নয় মাস জাপটে ধরে রাখে সেভেরদভিন্সকের আকাশকে, সেই একই মেঘ কি স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছে লিনার চেতনার গহিন অন্তরালে? তেমন হলে তো সেই ডিপ সি সাবমেরিনের মতোই ওর মনের হাজার ফুট গভীরে ডুব না মেরে ওর জীবনের আর সব কাহিনি জানা দুঃসাধ্যপ্রায়। গুলহানের পার্কের শেষ সীমানায় ফসফরাসের দিকে তাকিয়ে থাকা কামাল আতাতুর্কের প্রস্তর মূর্তিকে পাশ কাটিয়ে বিশাল একটি মালবাহী জাহাজ সেই মুহূর্তে ভেসে যায়। তারও বহুদূরে নদীর ওপারের পাহাড়ে যে বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয়, তাদেরকে আমার লিনার মতোই ঝাপসাপ্রায় মনে হয়। তারা যেন আমার খুব নিকটেই, তবুও তাদের জানালা, পর্দা, বারান্দার ফুলটব—এসবকে আমি আলাদা আলাদা করে দৃষ্টির প্রখর সীমানায় আনতে ব্যর্থ হই। দুর্বোধ্য এক মায়াজাল তৈরি করে ঝকমকে সেই সকালে তারা আমাকে দূরে ঠেলে দেয়।