আজ অপুর একটুও মন ভালো নেই। মায়ের হাতের সুগন্ধি তুলসীমালা চালের পোলাও, খেজুরের রসে ঘন দুধে রান্না পায়েসেও একদম রুচি নেই! বড়বিলার মাঠে ডাংগুলি খেলতে ডেকে গেল বন্ধুরা। তা-ও গেল না সে!
যাবে কী করে? অপুর ভেতরে একটা প্রচণ্ড অপরাধবোধ কাজ করছে। করবেই বা না কেন? ও যে গতরাতে ভয়ানক এক স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নটা ছিল এরকম—
দিনটা ছিল শনিবার। অপু একাই হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছে। হঠাত্ ওর গা ঘেঁষে একটা মাইক্রোবাস থেমে গেল। ভয়ানক চেহারার অপরিচিত এবং আধেকটা মুখ মুখোশে ঢাকা দুজন লোক নেমে এসে অপুর নাকেমুখে একটা রুমাল চেপে ধরল। এরপর ওকে উঠিয়ে নিয়ে গেল! গভীর রাতে যখন অপুর হুঁশ ফিরে এল, তখন সে বুঝতে পারল যে তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। লোকগুলো অপুকে ভেংচি কেটে বলছে,
খোকাবাবু কাঁদিস নে তুই
কাঁদতে যে তোর মানা,
তোদের আছে টাকাকড়ি
তা আমাদের জানা।
ধনী লোকের ছেলে রে তুই
লক্ষ্মীপেঁচার ছানা,
কান্না ভুলে টাকা চেয়ে
মোবাইলে গান গা না।
লোকগুলো অপুর চোখ বেঁধে রেখেছে। দুই হাতও শক্ত করে বেঁধে রেখেছে। ও যাতে করে কথা বলতে না পারে, সেজন্য মুখে কচট্যাপ এঁটে দিয়েছে। ওরা থেকে থেকে বলাবলি করছে—টাকা না পাঠানো পর্যন্ত ছেমরাটাকে কোনোপ্রকার ভালো খাবার খেতে দেওয়া হবে না। ওরা যেসব খাবার খেতে দিচ্ছে, ওগুলো অপুর মোটেই পছন্দ নয়। অপু মনে মনে ভাবছে, তবে কি আমাকে না খাইয়ে মেরে ফেলতে চায় ওরা?
দুইবার অপুর মা-বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। তারা খুব কান্নাকাটি করছেন। শেষ পর্যন্ত কী হবে অপু কিছুই বুঝতে পারছে না।
হঠাত্ করে মোরগের ডাকে অপুর ঘুম ভেঙে গেল। দুঃস্বপ্নের ঘোর কাটতে না কাটতেই সে পিঞ্জিরার কাছে ছুটে যায়। সে পিঞ্জিরার কাছে গিয়ে দেখল দোয়েলছানাটা মরে গেছে!
অপুর ভীষণ মনখারাপ হলো। সে তার মায়ের কাছে খাঁচাটা নিয়ে গেল। মা তা দেখেই বললেন, ‘তোর জন্যই দোয়েলছানাটা মরে গেছে! শুনতে পাচ্ছিস না, মা দোয়েলটা কেমন করে অনবরত শিস দিচ্ছে? তোকে আমি কতবার বলেছি পাখির বাচ্চা ধরতে নেই। এসব খাঁচায় পোষা অন্যায়। আমার কোনো কথা শুনিস না তুই! দিন দিন তোর ভেতর থেকে দয়ামায়া উঠে যাচ্ছে। এবার পারলে মা পাখিটার কান্না থামা!’
অপু আরেকটা খাঁচায় একটা টিয়েপাখি পুষেছে। অপুর ছোটবোন রুপু এক দৌড়ে ছুটে গিয়ে টিয়ের পায়ের রুপার শেকল খুলে দিল। অমনি টিয়েপাখিটা ফুড়ুত্ করে উড়ে গেল।
অপু তো ভীষণ রাগে রুপুকে মারতে যাবে। অমনি আদুরে মিষ্টি মেয়ে মুচকি হেসে বলে উঠল,
‘দাদাভাই, তোমাকে যদি কেউ ঘরে বন্ধ করে রাখে, তোমার কি ভালো লাগবে? তবে টিয়ে পাখিটাকে তুমি কেন বন্দি করে রাখবে?’
অপুর মুখে আর কোনো কথা নেই। বরং ওর গতরাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেল। অগত্যা সে খাঁচাদুটো ভেঙে ফেলল। এরপর সে ওর মায়ের কাছে গতরাতের স্বপ্নের কথা বলল। এবার অপু ওর মায়ের পা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা, আমি আর কখনোই পাখি পুষবো না।’
এবার মা অপুকেও বুকে টেনে নিয়ে কপালে চুমু দিলেন।
অপু তার মাকে বলল, ‘মা, এই চুমুটা যে রুপুর প্রাপ্য। ওই তো আমার খাঁচায় বন্দি সুখকে মুক্ত করে দিয়েছে।’