রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারকে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি থেকে সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীগুলো যাতে নতুন করে গণহত্যা না চালায় কিংবা উস্কানি না দেয় সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে, সেসব তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেবার জন্য মিয়ানমার কী ধরণের ব্যবস্থা নিয়েছে সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী চার মাসের মধ্যে আইসিজে’তে জমা দিতে হবে। এরপর চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ছয় মাসে একটি করে প্রতিবেদন দিতে হবে। এসব প্রতিবেদন গাম্বিয়ার কাছে তুলে ধরা হবে। আদালতের এসব নির্দেশনা সর্বসম্মতভাবে এসেছে।
আইসিজে’র আদেশ মানার আইনি বাধবাধকতা মিয়ানমারের রয়েছে। তবে আদেশ মানতে আদালত চাপ প্রয়োগ করতে পারে না। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারপতিরা সর্বসম্মতিতে আদেশ দেওয়ায় তা উপেক্ষা করা মিয়ানমারের জন্য কঠিন হবে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি তল্লাশি চৌকিতে বিদ্রোহীদের হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নিধন অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সে সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মুখে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার অভিযোগ এই অভিযানে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ হয়েছে।
এই ঘটনায় গত বছরের ১১ নভেম্বর অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) সমর্থনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলা করে আফ্রিকার ছোট গাম্বিয়া। গত ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এই শুনানিতে গাম্বিয়ার পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির বিচার বিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। গাম্বিয়াকে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ, কানাডা ও নেদারল্যান্ডস। শুনানিকালে গণহত্যার তদন্ত শুরু না হওয়া পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায় গাম্বিয়া।
অন্যদিকে এই মামলা লড়তে আদালতে হাজির হয়েছিলেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। তিনি রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। একইসঙ্গে এই মামলার শুনানি করতে আদালতের কোনো এখতিয়ার নেই বলে দাবি করেন। দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শোনার পর আইসিজের ১৭ সদস্যের বিচারক প্যানেল বিষয়টি আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।
গতকাল আইসিজে’র প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ অন্তর্বর্তী আদেশ পড়ে শোনান। এ সময় অপর ১৪ জন স্থায়ী ও দুইজন অ্যাডহক বিচারপতি উপস্থিত ছিলেন। বিচারক আহমেদ ইউসুফ বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আদালতের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। গণহত্যা সনদের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর আওতায় (ধারা ৮ ও ৯) এই মামলা দায়েরে গাম্বিয়ারও ‘প্রাইমা ফেসি’ অধিকার আছে। গাম্বিয়া যেসব অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার আদেশ চেয়েছে, সেগুলোর প্রথম তিনটির লক্ষ্য হচ্ছে- রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা দেওয়া। জাতিসংঘ তথ্যানুসন্ধান দলের প্রতিবেদনে রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে যে উল্লেখ রয়েছে, তা আদালতের নজরে এসেছে। আদালত মনে করে, গণহত্যা সনদের ধারা-২ অনুযায়ী রোহিঙ্গারা একটি বিশেষ সুরক্ষার অধিকারী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচ্য। আদালত ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের কথা তুলে ধরে বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ক্ষতি করেছে। রোহিঙ্গাদের রক্ষায় মিয়ানমারকে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। আদালতের আদেশকে বিচার ছাড়া সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
আদালতের আদেশের পর গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী তামবাদু বলেন, রোহিঙ্গাদের দুর্দশা নিরসনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গণহত্যার অভিযোগ তদন্তে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে সহায়তা করার জন্য গাম্বিয়া মিয়ানমারের প্রতি আহবান জানিয়েছে।
আদেশের পর ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টের কমিশনার রিড ব্রোডি আল জাজিরাকে বলেন, এটি লাখ লাখ রোহিঙ্গার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। আদালত তাদের দুর্দশার স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে তার মতে, এসব আদেশের বাস্তবায়নের জন্য অনেক দূর যেতে হবে। কিন্তু আজ এসব মানুষ বিচারের প্রাথমিক স্বাদ পেয়েছে।
আদালতে মিয়ানমারের প্রতিনিধি এবং আইনজীবীরা আদেশের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। যদিও গতকাল রায় ঘোষণার কিছু আগে ফিনান্সিয়াল টাইমসকে মিয়ানমারের নেত্রী সু চি বলেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলো অপরাধমূলক তদন্তের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই মিয়ানমারের নিন্দা করে এসব অপ্রমাণিত বিবৃতি দিচ্ছে।
মানবতার জয় হয়েছে:পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন
রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় আইসিজে যে আদেশ দিয়েছে তাকে মানবতার জয় এবং বিশ্বের মানবাধিকার কর্মীদের জন্য মাইলফলক বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। গতকাল ইকুয়েডর থেকে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি আরো বলেন, এটি গাম্বিয়া, ওআইসি, রোহিঙ্গা এবং অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য এক বিজয়। মানবতা এবং মাদার অব হিউম্যানিটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মঙ্গল হোক।