চট্টগ্রামে থামানো যাচ্ছে না কিশোর অপরাধীদের তত্পরতা। নগরীর প্রতিটি অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, শপিং মল, ফাস্ট ফুড শপসহ সর্বত্রই কিশোর অপরাধীদের সরব বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। মাদক ব্যবসা, মেয়েদের উত্ত্যক্তকরণ, চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোররা। জানা গেছে, গত দুই বছরে নগরীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া ৩০টির বেশি মামলার আসামিরা কিশোর বয়স অতিক্রম করতে পারেনি। অধিকাংশ ছিনতাই মামলার বেশির ভাগ আসামিই কিশোর। ঘটনার পর কিশোর আসামি ধরা পড়লেও তাদের কথিত ‘বড়ো ভাইরা’ ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে পুলিশ দাবি করলেও বড়ো ভাইরা নেপথ্যে থেকেই নিত্যনতুন অপরাধের ছক আঁটছে।
সিএমপি সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরীর ৩০০ স্পটে অন্তত ৫৫০ জন কিশোর অপরাধী রয়েছে যারা বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্য। এসব গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে বড়ো ভাইরা। এসব স্পটে নিয়মিত আড্ডাবাজি করে তারা। কথা কাটাকাটি, নারীঘটিত বিষয়, ফেসবুক-মোবাইলসহ তুচ্ছ ইস্যুতে সামান্য মতানৈক্য হলেই এরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে যা অনেক সময় মৃত্যুও ডেকে আনে। বড়ো ভাইদের দেওয়া অস্ত্র হাতে নিয়ে এরা বন্ধুকে লক্ষ্য করে গুলি করতেও দ্বিধা করে না। বড়ো ভাইদের ছত্রছায়ায় এসব কিশোর অপরাধী দিন দিন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
গত দুই বছরে চট্টগ্রামে বেশ কিছু রোমহর্ষক অপরাধ ঘটিয়েছে কিশোর অপরাধীরা। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনানকে প্রকাশ্যে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এ খুনের জন্য সাব্বির নামে এক কিশোরকে দায়ী করা হয়। ঐ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। তৈরি করা হয় অপরাধ চক্রে জড়িত কিশোর এবং অপরাধপ্রবণ এলাকার তালিকা। ঐ তালিকায় প্রায় ৫৫০ জন কিশোর অপরাধীর নাম আসে। বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরকে দিয়ে প্রায় ৩০০ অপরাধপ্রবণ স্পটের তালিকা তৈরি হয়। সন্ধ্যার পর এসব স্পটে আড্ডায় দেখা গেলে কিশোর-তরুণদের আটকের ঘোষণাও দেওয়া হয় নগর পুলিশের পক্ষ থেকে। তবে এই ঘোষণাতেও দমানো যায়নি কিশোর অপরাধীদের। এরপর নগরীতে ঘটে যায় একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনা যাতে জড়িত ছিল কিশোর গ্যাং। গত বছরের ৬ এপ্রিল এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার জেরে কিশোরদের দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ দ্বন্দ্বের জেরে নগরীর গোলপাহাড় এলাকার যুবলীগ কর্মী এম এইচ লোকমান রনি নিহত হন স্থানীয় সন্ত্রাসী সাইফুল ইসলামের গুলিতে। এর দুই দিন পর পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় সাইফুল। ১৪ এপ্রিল ইয়াবা সেবনের টাকা না পেয়ে বাবা রঞ্জন বড়ুয়াকে ছুরিকাঘাতে খুন করে তার ছেলে রবিন বড়ুয়া। কোতোয়ালি থানার কাজির দেউড়ীর ব্যাটারি গলিতে এ ঘটনা ঘটে। বাবার ঘাতক এই কিশোরের বয়সও ১৮ বছরের নিচে। গত ১০ মে নগরীর পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর পিলখানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ছুরিকাঘাতে খুন হন মোস্তাক আহমেদ নামে এক যুবক। ছেলের সঙ্গে বখাটে কিশোরদের ঝগড়া মেটাতে গেলে তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এ ঘটনায় জড়িত ১০-১৫ জনের সবার বয়স ১৮ বছরের কম। ১৪ মে নগরীর ডবলমুরিং থানার হাজিপাড়ায় রিকশাচালক রাজু আহমেদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেয় ১০-১২ জন কিশোর। জানা যায়, তাদের ‘বড়ো ভাই’ ছগির হোসেন জেল থেকে নির্দেশ দেন মফিজ নামের একজনকে খুন করার জন্য। কিন্তু টার্গেট মিস করে কিশোররা রাজুকে খুন করে ফেলে। পুলিশ পরে ঐ গ্রুপের ৮ সদস্যকে গ্রেফতার করে যাদের সবার বয়স ১৮ বছরের মধ্যে। সর্বশেষ গত ১৮ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলী থানার দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় নিজেদের মধ্যে কোন্দলের জেরে খুন হয় এক কিশোর।
সিএমপির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, শুধু আইন দিয়ে কিশোর অপরাধ দমন করা যাবে না। এ জন্য পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। সন্তানরা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে—অভিভাবক ও শিক্ষকদেরকে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদেরকে আরো বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে।