নতুন রপ্তানি পণ্য হওয়ার পথে পানির পাম্প
আহমেদ সাঈদ বুলবুল, যশোর অফিস
ভারত-চায়না থেকে আগে পাথরভাঙা মেশিন আসত বাংলাদেশে। এখন ভারতে সেই মেশিন রপ্তানি হচ্ছে। তাও আবার যশোরেই হালকা প্রকৌশল কারখানায় তৈরি। গত অর্থবছরে এখানকার রিপন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে তৈরি ১৪টি মেশিন ৮৮ লাখ টাকায় রপ্তানি হয়েছিল। আর ২০২০ সালের শুরুতেই ছয়টি মেশিন গেছে ভারতে। আগামী মাসে যাবে আরো আটটি। মাস জুড়েই ১০-১২টি মেশিনের অর্ডার এখন অতি মামুলি ঘটনা। এর সঙ্গে ইটভাঙা মেশিন তো যাচ্ছেই। নতুন রপ্তানি পণ্য হওয়ার পথে পানির পাম্প।
হালকা প্রকৌশল পণ্য উত্পাদনের এমন বিপ্লবকে জোয়ারের সৃষ্টি করেছে সরকারি একটি সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য হালকা প্রকৌশল পণ্যকে ২০২০ সালের ‘বর্ষপণ্য’ ঘোষণা করেছেন। এতে এই শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তারা আশা করছেন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় হালকা প্রকৌশল পণ্যে বাংলাদেশে নতুন বিপ্লব সৃষ্টি হবে। এজন্য সরকারি কিছু সহায়তাও চান শিল্পমালিকরা।
সূত্র জানায়, সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ছোটো, মাঝারি ও বৃহত্ ফাউন্ড্রি শিল্প কাজ করছে। প্রায় ৩ লাখ মানুষ এবং উদ্ভাবনী উদ্যোক্তারা সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের ফাউন্ড্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। মূলত ঢাকা, বগুড়া ও যশোর জেলায় ফাউন্ড্রি শিল্প অবস্থিত। যশোরে আধুনিক বৃহত্ আকারে এ শিল্প স্থাপন করা হয়েছে। দেশের ফাউন্ড্রি শপ বা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপগুলোতে প্রায় ৫০০ ধরনের পণ্য উত্পাদন হয়। এর মধ্যে রয়েছে শিল্প ও ওয়ার্কশপ মেশিনারি, অটোমোবাইল, স্পেয়ার পার্টস, কৃষি যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ, লৌহঘটিত ও অলৌহঘটিত কাস্টিং পণ্য, ছাঁচ ও ডাই, নির্মাণ যন্ত্রপাতি, সিমেন্ট মিলের খুচরা যন্ত্রাংশ, জাহাজ ও ফিশিং ট্রলারের খুচরা যন্ত্রাংশ, মুদ্রণ ও প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি, মেশিন ও সরঞ্জামের প্রায় সকল বিভাগের জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ, রুটি-বিস্কুট যন্ত্রপাতি, পশুর ফিড যন্ত্রপাতি, ময়দা কল যন্ত্রপাতি, নলকূপ, চা-বাগান ও কারখানার যন্ত্রপাতি, টেক্সটাইল অংশ, পাট যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ প্রভৃতি।
এই শিল্পের সম্প্রসারণে সরকার ২০২০ সালকে ‘হালকা প্রকৌশল বর্ষপণ্য’ ঘোষণা করেছেন। এতে আশায় বুক বেঁধেছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে তারা চান আইনি জটিলতা নিরসন, ফাউন্ড্রি শিল্প অঞ্চল স্থাপন ও আর্থিক সহায়তা। যশোর লাইট অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং মালিক সমিতির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম বাবু বলেন, মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১ অনুযায়ী মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে উত্পাদনের ক্ষেত্রে প্রস্ততকারক বা উত্পাদক মূল্য সংযোজন কর ব্যতিরেকে সরবরাহ করতে পারবেন মর্মে আইন ছিল। কিন্তু মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১৯ অনুযায়ী মূসক হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি—যে সুবিধা আগে ছিল। তিনি পূর্বের সুবিধা চান। এ প্রসঙ্গে যশোর কাস্টমসের কমিশনার মুহম্মদ জাকির হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ১৯৯১ সালের বিধান যা ছিল, এখনো একই রয়েছে। নতুন আইনের আওতায় প্রত্যেককে পৃথকভাবে আগের মতোই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আবেদন করতে হবে।
যশোর লাইট অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং মালিক সমিতির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম বাবু বর্ষপণ্য ঘোষণার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে ইইএফ ফান্ডের সহায়তা দরকার। মাছ ও গরু পালন, দুগ্ধ খামারে এই ফান্ড দেওয়ায় এসব সেক্টরে বিপ্লব হয়েছে। হালকা প্রকৌশল খাতে শিল্প অনুযায়ী ১০ থেকে ২৫ কোটি টাকার ইইএফ ফান্ড দেওয়া হলে এই শিল্পে জোয়ার সৃষ্টি হবে—যা দেশের অর্থনৈতিক ভিতকে আরো সুসংহত করবে।
বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির কনসালট্যান্ট মাসুম তালুকদার বলেন, ভারত ফাউন্ড্রি পণ্য রপ্তানি থেকে ২.৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে। চীন তার নিম্ন প্রযুক্তির ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ (কাস্টিং ওয়ার্কস) আউটসোর্সিংয়ের জন্য অনেক এশীয় দেশের সন্ধান করছে। বাংলাদেশে চীন থেকে কাজের আদেশ নিতে একটি কেন্দ্র হতে পারে। ভারতের সেভেন সিস্টার, মায়ানমার, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, নেপালের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোতেও ফাউন্ড্রি পণ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। যশোর ও বগুড়া জেলার ফাউন্ড্রি উদ্যোক্তাদের যথাযথ সহায়তা করলে বাংলাদেশেও বৈদেশিক মুদ্রার ফ্লো বাড়বে। তিনি আরো বলেন, রপ্তানি বাজারের উন্নয়নের জন্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং যশোর ও বগুড়া জেলায় দুটি ফাউন্ড্রি শিল্প অঞ্চল স্থাপন করা উচিত।