পাহাড়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে ‘মোনঘর’

যেসব জীবন অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে পারত, সেসব জীবন এখন সূর্যের আলোর মতো ঝলমল করছে। এক সময় যারা অনিশ্চিত এক জীবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল আজ তারাই একেকটি সফল জীবনের উদাহরণ। মা-বাবা হারানো শিশুর মুখের হাসি মন ভরিয়ে দেয়। মোনঘরের সংস্পর্শে আসা প্রতিটি শিশু, কিশোর এবং যুবকের জীবনই যেন অন্ধকার থেকে আলোর মুখে যাত্রার কাহিনি।

পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে মোনঘর। ১৯৭৪ সালে রাঙ্গামাটির কয়েক জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর উদ্যোগে মোনঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের সুবিধাবঞ্চিত গরিব, এতিম ও দুস্থ শিশুদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় এবং শিক্ষা নিশ্চিত করা।

দুর্গম পাহাড়ের এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কাছে মোনঘর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠার প্রথম কয়েক বছর শুধু এতিম সন্তানদের নিয়ে কাজ করলেও ধীরে ধীরে মোনঘর সব শিক্ষার্থীদের জন্যই আবাসিক শিক্ষা কর্মসূচি চালু করে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চায় না। প্রতিদিন স্কুলে আসা-যাওয়াও একটা বড়ো বাধা। মেয়েদের জন্য এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা অনিরাপদও।     সে কারণে আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছে মোনঘর।

বর্তমানে মোনঘরের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছেন। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বেসরকারি ও বিদেশি সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ পদেও মোনঘরের শিক্ষার্থীরা দক্ষতার সঙ্গে তাদের কর্মজীবন পালন করে যাচ্ছেন। শুধু বিসিএস ক্যাডার ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক রয়েছেন ১৬ জন। এছাড়াও সরকারি চিকিত্সক, সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি উন্নয়ন খাতেও অনেকেই ভালো অবস্থানে কাজ করছেন।

মোনঘরের নির্বাহী পরিচালক অশোক কুমার চাকমা জানান, মোনঘর অরাজনৈতিক ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এটি বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়ন ও অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে আর্থিক ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মোনঘর সেবা দিয়ে সব জাতিসত্তার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধনের মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে।

গত ৪৬ বছর ধরে ‘মোনঘর’ তার শিক্ষার আলো পাহাড়, সমতল ও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে প্রায় ১ হাজার ১০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন আবাসিক যার মধ্যে ২৮৫ জন মেয়ে শিক্ষার্থী। মেয়েদের জন্য ‘বিশাখা ভবন’ নামে আলাদা কম্পাউন্ডসহ আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ১২টি আবাসিক ভবন রয়েছে। পরিধি বেড়ে যাওয়ায় এখন সামর্থ্য আছে এমন পরিবারের কাছ থেকে খরচের টাকা নেওয়া হয়। আর যাদের দেওয়ার সামর্থ্য নেই তাদের খরচ বহন করে সমাজের বিত্তবান মানুষ এবং মোনঘর। শুধু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনাতেই দায়িত্ব শেষ করে দিচ্ছে না মোনঘর বরং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যারা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে তাদেরও দায়িত্ব নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। উচ্চশিক্ষার জন্য যাদের অর্থ সহযোগিতা করা হয়, তাদের পরবর্তীকালে সেই অর্থ ফেরত দিতে হয়। যাতে সেই টাকায় আরেকজন লেখাপড়া করতে পারে।

মোনঘরের নির্বাহী পরিচালক অশোক কুমার চাকমা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক, মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং পর্যায়ে পড়াশুনার সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে মোনঘর উচ্চশিক্ষা কর্মসূচি বা সংক্ষেপে ‘হেল্প’ পরিচালনা করছে। বর্তমানে এই কর্মসূচির অধীনে ৯৫ জন ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত রয়েছে। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ হলো সুবিধাবঞ্চিত এলাকার গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা লাভে সহায়তা প্রদান করা। ২০১১ সালে এই কর্মসূচি পুনরায় চালু করার পর আজ পর্যন্ত ৩৩ জন শিক্ষার্থী হেল্প-এর সহায়তায় পড়াশুনা শেষ করেছে। মূলত মোনঘরের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করে এই শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়ে থাকে। তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশে বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজন করা হয়।

যেভাবে শুরু

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সুবিধাবঞ্চিত, এতিম শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষায় গড়ে তুলে পাহাড়ি সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই গুরু ভান্তে নামে খ্যাত শ্রীমত্ জ্ঞানশ্রী ভিক্ষুর নেতৃত্বে শ্রীমত্ বিমল তিষ্য ভিক্ষু, শ্রীমত্ প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুসহ পাঁচ জন ভিক্ষু মোনঘর পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মোনঘরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ১৯৭৪ সালে শুরু হলেও এর গোড়াপত্তন ঘটে আরো আগে। জ্ঞানশ্রী ভিক্ষু ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ির ‘গৌতম বিহার’-এ গিয়ে অবস্থান শুরু করেন। তিনি বিহার এলাকার শিশুদের শিক্ষা-দীক্ষায় গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ১৯৬১ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন ‘পার্বত্য চট্টল বৌদ্ধ অনাথ আশ্রম’। এ আশ্রম মূলত এলাকাবাসীর সহায়তায় পরিচালিত হতো। ১৯৬৮ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক এটি নিবন্ধিত হয়। স্বাধীনতার পর পাহাড়িদের বিরাট একটি অংশ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের এই অনাথ আশ্রমে আশ্রয় নেওয়ার হার অনেক বেড়ে যায়। সে সময় দীঘিনালা ছিল অত্যন্ত দুর্গম এলাকা এবং যোগাযোগব্যবস্থা নাজুক হওয়ার কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ অন্যান্য কাজে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো। তাই ১৯৭৪ সালে এ অনাথ আশ্রম দীঘিনালা থেকে রাঙ্গামাটি শহরের কাছে রাঙ্গাপানির মিলন বিহারকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে।

মোনঘরের আরো যত কার্যক্রম

মোনঘর প্রথম দিকে অনাথ ও দুস্থ শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও দিন দিন এর পরিধি বেড়ে চলেছে। মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়, মোনঘর শিশুসদন ছাড়াও মোনঘরের অধীন ভোকেশনাল স্কুল, পালি কলেজ, কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার, রিসোর্স সেন্টার ও মিনি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মোনঘরের ছাত্রছাত্রীরা যাতে তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষায় পিছিয়ে না থাকে, সে জন্য কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার, ভোকেশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মোনঘরের ছাত্রছাত্রীরা যাতে বিশ্বের ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে, সে জন্য মোনঘর রিসোর্স সেন্টারে রয়েছে নানা সাময়িকী, প্রামাণ্যচিত্র, চলচ্চিত্র ও বই।