টানা-টুনি

/ বিশ্বজিত্ দাস

 

জন্ম পর্ব

‘টানো!’

ঠিক মনে নেই, তবে শব্দটা এমনই মনে হয় শুনেছিল সে। কে যেন তাকে ধরে টানছিল। অন্ধকার আর শুয়ে শুয়ে আরাম-আয়েশের দিনগুলো শেষ হয়েছিল তখনই। প্রচণ্ড আলো তার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল।

‘কী হলো? টোনা না টুনি?’ কে যেন জানতে চেয়েছিল।

অমনি বিকট শব্দে কাঁদতে শুরু করেছিল সে।

‘টুনি হয়েছে, টুনি।’ মেয়ে কণ্ঠ বলল।

চারদিকে আনন্দের শব্দ শুনতে পেল সে।

‘দাও। আমার কোলে দাও।’

‘আরে আমি আগে নিই।’

এভাবে টানাটানির মধ্য দিয়ে জীবনের যাত্রা শুরু করল টুনি।

 

শৈশব পর্ব

টিভি দেখছিল টুনি।

সবিতা বলল, ‘চল আমরা ছাদে গিয়ে লুকোচুরি খেলি।’

শম্পা বলল, ‘না। ও আমার সাথে খেলবে। চল আমাদের ফ্লাটে। তুই আমার সাথে লুডো খেলবি।’

‘না। ও আমার সাথে যাবে।’ সবিতা বলল।

‘না। আমার সাথেই খেলবে। চল টুনি।’

‘টুনি, ভালো হবে না কিন্তু। আমার সাথে চল।’

‘আম্মু।’ চিত্কার করে ডাকল টুনি।

 

কৈশোর পর্ব

‘আমি আজই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। পেয়েছ কী তুমি! যা খুশি তা-ই করে বেড়াবে আর আমি বসে বসে দেখব।’ চিত্কার করে বললেন রেশমা। টুনির মা।

‘যাও। তোমার যেখানে খুশি যাও। জীবনটা আমার ত্যানা ত্যানা করে দিয়েছ তুমি।’ পাল্টা চিত্কার করে বললেন কাদের। টুনির বাবা।

‘যাবই তো। ভেবেছ তোমার সংসারে থেকে যাব। বহুদিন সামলেছি। আর না। চল টুনি, এক্ষুনি আমরা তোর নানিবাড়ি চলে যাব।’

‘তুমি কোথায় যাবে যাও, টুনি তোমার সাথে যাবে না।’

‘যাবে।’

‘যাবে না।’

‘যাবে।’

টুনি উঠে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

 

ভর্তি পর্ব

টুনির মন খারাপ। ভীষণ খারাপ।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, দিনাজপুরসহ সব জায়গার বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে সে। কোথাও চান্স পায়নি। ঢাকা ভার্সিটিতে কোটায় ভর্তির জন্য সব মূল কাগজপত্র জমা দিয়েছে। এখনো রেজাল্ট দেয়নি। বুঝতে পারছে ভালো সাবজেক্ট পাবে না।

মোবাইল বেজে উঠল।

রিম্পি। বান্ধবী।

‘কী রে, কী খবর?’

‘খবর শুনেছিস?’

‘কী খবর?’

‘রাজশাহী ভার্সিটিতে ওয়েটিং থেকে ভর্তি নিচ্ছে। পরশু আর তরশু এই দুদিন। যে আগে যাবে, সেই ভর্তি হতে পারবে।’

‘তাই! তুই কি যাচ্ছিস?’

মন ভালো হয়ে গেল টুনির। তার নামও ওয়েটিং লিস্টে আছে।

‘যাব। চল একসাথেই ভর্তি হই। দুই বান্ধবী মিলে থাকতে পারব।’

এক মুহূর্ত ভাবল টুনি। ভর্তি নিয়ে টানাটানি আর ভালো লাগছে না।

রাজশাহী যাওয়া এত সহজ হলো না। মূল কাগজপত্র ওঠানোর জন্য নিজ জেলা থেকে ঢাকা যেতে হলো ওকে। সেখান থেকে কাগজপত্র নিয়ে রাজশাহী যেতে যেতে চার দিন পেরিয়ে গেল। ফলাফল, টুনি আর ভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারল না। শেষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্থানীয় একটা কলেজে ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হতে হলো ওকে।

 

প্রেম পর্ব

‘তোমার জন্মদিনটা বিশেষভাবে সেলিব্রেট করতে চাই।’ মেসেঞ্জারে লিখল জুনাইদ।

‘ওমা, তাই! কীভাবে?’ জানতে চাইল টুনি।

‘আজ দুপুরে তোমাকে চাইনিজ খাওয়াব। সেখানেই তোমার জন্মদিনের কেক কাটব।’

‘ও মাই গড ! এত আয়োজন কীসের জন্য?’

‘প্রিয়জনের জন্য আয়োজন। তুমিই তো আমার প্রিয়জন।’ গভীর আবেগে বলল জুনাইদ।

‘তা এই আয়োজনটা কোথায় হবে জনাব?’ আদুরে গলায় জানতে চাইল টুনি।

‘সিমলা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। আজ দুপুরে। ওকে।’

‘ওকে, বাবা।’

ফোন কেটে দিয়ে টুনি চিত্কার করে বলল, ‘মা, আজ দুপুরে আমি বাসায় খাব না। বান্ধবীরা চাইনিজে দাওয়াত দিয়েছে।’

একটু পরই মিলন ফোন করল, ‘হ্যাপি বার্থ ডে সোনা।’

‘থ্যাংকস, মিলন ভাইয়া।’

‘আজ দুপুরে আমি কিন্তু লাঞ্চ করাব তোমাকে। না করতে পারবে না।’

‘কিন্তু।’

‘কোনো কিন্তু নয়। আজ দুপুরে সিমলা চাইনিজে আমি কিন্তু তোমার জন্য অপেক্ষা করব। বাই।’ ফোন রেখে দিল মিলন।

সেই প্রথমবার নিজের জন্মদিনে দুপুরে না খেয়ে থাকল টুনি।

 

পারিবারিক পর্ব

‘চন্দনাকে পরশু দেখতে আসবে। আমি তো যেতে পারব না। অফিসে কাজের চাপ। তুমি বাচ্চাদের সাথে নিয়ে যাও।’ হাসান বলল। সে টুনির স্বামী। চন্দনা টুনির একমাত্র ননদ।

‘আব্বা খুবই অসুস্থ। আমি চেয়েছিলাম, উনাকে দেখতে যেতে।’ টুনি অসহায়ভাবে বলল।

‘বুড়ো মানুষ অসুস্থ তো হবেই। তুমি বরং আমাদের গ্রামের বাসাতেই যাও। আম্মা এত করে তোমাকে যেতে বলেছে। না গেলে খুব রাগ করবেন।’

এরমধ্যে ছুটে এলো হাসান। টুনির বড়ো ছেলে।

‘আম্মু, আমরা কবে পিকনিক যাব। সবাই যে যাচ্ছে।’

টুনি কী বলবে ভেবে পেল না।

 

বৃদ্ধ পর্ব

‘নানি, এবার কিন্তু তোমাকে আমাদের বাসায় যেতেই হবে।’ ইতু বলল। টুনির নাতনি।

‘না। দাদি আমাদের বাসায় যাবে।’ ইউসুফ বলল। টুনির আরেক নাতি।

টুনি শুয়ে আছে। ওর দুই পাশে নাতি-নাতনি।

‘তোরা দুজনাই তো আমাকে নিয়ে টানাটানি করছিস। বল, আমাকে তোরা কী কী খাওয়াবি। দেখি কারটা বেশি লোভনীয়।’ হেসে জানতে চাইল টুনি।

‘আম্মু বলেছে, তুমি গেলে তোমাকে রেখে আমরা সবাই ইন্ডিয়া বেড়াতে যাব। অন্য কাউকে রেখে যেতে আম্মু ভরসা পাচ্ছে না। তখন তোমার জন্য আমরা ফ্রিজে একগাদা খাবার রেখে যাব। যত খুশি যা খুশি ইচ্ছেমতো খেতে পারবে।’ ইতু বলল।

‘না। দাদি আমাদের সঙ্গেই যাবে। আম্মু বলেছে, আমাদের বাসায় যে কাজের বুয়াটা আছে না, সে খালি চুরি করে করে খায়। দাদি গেলে ঐ বুয়াকে আর রাখবে না। তাহলে ঐ বুয়ার বেঁচে যাওয়া খাওয়াটা তখন দাদি খাবে। বুঝেছ দাদি!’

 

মৃত্যু পর্ব

যমরাজ ঢুকে দেখল, ডায়াবেটিস আর প্রেসার দুজনে মিলে পাঞ্জা লড়ছে। টুনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। তার নাকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের নল লাগানো।

‘কী ব্যাপার? মুর্দা কি মরে নাই?’ যমরাজ জানতে চাইল।

‘আমাদের মধ্যে যে জিতবে, সেই নেবে এই মুর্দা।’

হাই তুললেন যমরাজ, ‘ঠিক আছে তোরা লড়াই কর। দেখিস আবার নিজেই মরিস না। সময়মতো আমাকে রিপোর্ট করিস। আমি অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছি।’

‘অস্ট্রেলিয়ায়!’ সমস্বরে জানতে চাইল দুজন।

‘আরে ওখানে দাবানলে অনেক প্রাণ মরেছে রে! তাই জরুরি কলে যাচ্ছি। এদিকে আবার ইরান থেকেও জরুরি ডাক এসেছে। এত টানাটানি আমাকে নিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয়, সুইসাইড করে আত্মহত্যা করি।’    g