বাণিজ্য মেলায় বাণিজ্য

/ নীরব চন্দন

 

ঢাকায় কয়েক বছর ধরে বসবাস করলেও বাণিজ্য মেলায় যাওয়া হয়নি আমার। তাই এবারের বাণিজ্য মেলায় যাওয়া কোনোভাবেই মিস করতে চাই না। কিন্তু বাণিজ্য মেলায় গিয়ে বাণিজ্য করতে তো টাকার প্রয়োজন। মানিব্যাগে হাতে নিয়ে হতাশ হয়ে গেলাম। বাণিজ্য মেলায় গিয়ে বাণিজ্য করা দূরে থাক; বাণিজ্য মেলা পর্যন্ত যাওয়ারই টাকা নেই। কী করা যায়, ভাবছিলাম আমি। এমন সময় আহসান ভাইয়ের ফোন। তিনি আমার মেসের প্রাক্তন বড়ো ভাই। এতদিন পর আহসান ভাইয়ের ফোন পেয়ে কিছুটা চমকে গেলাম। কারণ মেয়ে ঘটিত ঝামেলার কারণে তাকে মেস থেকে বিতাড়ন করা হয়েছিল। আহসান ভাই বললেন, ‘কেমন আছ? ফ্রি থাকলে আগামীকাল বিকেলে চলে আসো। বাণিজ্য মেলায় যাব।’ আমি তো খুশিতে গদগদ হয়ে গেলাম। তাই কোনো রকম চিন্তা-ভাবনাই ছাড়াই আহসান ভাইকে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলাম। পরের দিন বিকেলে নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হলাম। কিন্তু আহসান ভাইয়ের কোনো দেখা নেই। এক ঘণ্টা চলে গেলেও তার ছায়া পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। ভীষণ বিরক্ত হয়ে গেলাম! এদিকে তার ফোনটাও বন্ধ। পুরো এক ঘণ্টা বিশ মিনিট পর আহসান ভাই এলেন। কিছু বলার আগেই আহসান ভাই বলে উঠলেন, ‘স্যরি, আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। পুরো পথটা হেঁটে এসেছি। তাই সময় একটু বেশি লেগেছে।’

—মানে কী! হেঁটে এসেছেন এতটা পথ?

—হুম।

—কিন্তু কেন? বাসে ওঠেননি?

—উঠেছিলাম।

—তাহলে?

—টাকা না থাকায় কিছুদূর আসার পরেই আমাকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ আমার মানিব্যাগ হারিয়ে গেছে।

আর কোনো উপায় না থাকায় আমরা মেলায় হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। হেঁটে হেঁটে মেলায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। একটা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দুজনে দুটি অ্যাকাউন্ট খোলায় এন্ট্রি টিকিট ফ্রিতে পেয়ে গেলাম। মেলায় ঢোকার পর পুরো মেলা কয়েকবার চক্কর দিলাম আমরা। হঠাত্ আহসান ভাই বললেন, ‘বাণিজ্য মেলায় এসে বাণিজ্য না করলে মানসম্মান বলতে তো কিছুই থাকবে না।’ আহসান ভাইয়ের কথায় সমর্থন জানালাম। কিন্তু টাকা ছাড়া কীভাবে বাণিজ্য করা যায়? ভাবতে লাগলাম আমরা। হঠাত্ আহসান ভাই চিত্কার করে বললেন, ‘আইডিয়া পেয়ে গেছি।’ ‘আইডিয়াটা কী ভাই?’ জানতে চাইলাম। আহসান ভাই আমাকে তার আইডিয়ার কথা খুলে বললেন। আমরা আইডিয়া অনুযায়ী কাজে নেমে পড়লাম। প্রথমে আমরা একটা শার্ট-প্যান্টের দোকানে ঢুকলাম। আহসান ভাই তার জন্য দুটি শার্ট ও দুটি প্যান্ট কিনলেন। এবার বিল দেওয়ার পালা। বিল কাউন্টারে গিয়েই আহসান ভাই তার অভিনয় শুরু করলেন। আহসান ভাই দোকানিকে বললেন, ‘আপনার এখানে কার্ড পেমেন্ট হবে?’

—স্যরি স্যার, আমাদের এখানে কার্ড সার্ভিস নেই। আপনাকে ক্যাশ পেমেন্ট করতে হবে।

—এত বড়ো দোকানে কার্ড পেমেন্ট হবে না? আগে জানলে তো এখান থেকে কিনতামই না।

—স্যরি স্যার।

—আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি এটিএম বুথ থেকে ক্যাশ করে আসছি।

দোকানিকে কথাটা বলেই আহসান ভাই শপিং ব্যাগটি হাতে নিয়েই দোকান থেকে বেরিয়ে পড়লেন। আমাদের প্ল্যান ছিল, আহসান ভাই বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আমিও সুযোগ মতো বের হয়ে যাব। কিন্তু আমাদের প্ল্যান কোনো কাজেই এলো না। কারণ দোকানি আমাকে চোখে চোখে রেখেছে। এদিকে আমি আহসান ভাইকে ফোন দিয়েই যাচ্ছি। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করছেন না। টেনশনে আমার ঘাম ঝরছে। এভাবে অনেক রাত হয়ে গেলেও আহসান ভাইয়ের দেখা নেই। দোকানি আমাদের প্ল্যান ধরে ফেললেন। ফলাফলস্বরূপ আমাকে তাদের দোকানে বেঁধে রাখা হলো। আমি তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, ‘জীবনে আর কোনোদিন বাণিজ্য মেলায় আসব না।’    g