সকাল ৭টা। কলাতলীর বাসিন্দা ভুট্টো ভাইয়ের চান্দের গাড়িতে ছুটে চলি মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে টেকনাফ। নির্দিষ্ট আসন সংখ্যার চাইতে মানুষ ছিল বেশি। প্রথমে বসা কষ্ট হলেও মেরিন ড্রাইভ সড়কের দু-পাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য গাড়ির সিটে তেমন বসতে দেয়নি, বরং অনেকেই আফসোস করেছে কেন পারছে না ঠিকমতো দাঁড়াতে, লোহার খাঁচার ফাঁক দিয়ে মাথা বের করতে। ছাদবিহীন নীল আসমান দেখতে পারা, একপাশে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আরেক পাশে পাহাড়। বাতাসের ঝাপটা চৈত্রের খরতাপকেও ম্লান করে দেয়। যেতে যেতে জালিয়াপালং ব্রেক। প্রস্তাবিত ইফতি সি প্যালেসে খানিকটা সময় বিরতি। ওপেন ফ্রেন্ডস গ্রুপের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন হবে এখানে। প্রথমেই প্যালেসের মালিক হামিদুর রহমান রহমান হামিদ ভাইয়ের পূর্ব নির্দেশে কেয়ারটেকার আমাদের কচি ডাবের পানি পান করালেন। এরপর উদ্বোধনী কার্যক্রম। সেইসঙ্গে বিগত ২৬ বছরের সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য পর্ব শেষে আবারো ছুটলাম টেকনাফের পথে। কেউ একজন প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর গান ছাড়ল—‘আমার কী দোষ/ আমিত মানুষ/ শুধু স্মৃতিগুলো রেখ/ কখনো যদি আমায় মনে পড়ে।’ গানের লিরিকগুলো ভ্রমণের সঙ্গে বেশ মানিয়ে গেল। পৃথিবীর বৃহত্তম মেরিন ড্রাইভ সড়কে গাড়ি চলতে চলতে একেবারে প্রায় শেষ প্রান্তে। এপাশটায় পাহাড় আর সমুদ্রের রয়েছে অপূর্ব মিতালি। সাগরের নীলাভ পানি আর পাহাড়ের হাতছানি, মাঝে বয়ে যাওয়া ৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভ। সব মিলিয়ে অসাধারণ সৌন্দর্যের এক নজরকাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশ। এপাশটার ন্যাড়া পাহাড়গুলোর আকৃতিও বেশ অদ্ভুত। গাড়ি থেকে নেমে ছুটে যাই সৈকতে। ছলাত্ছলাত্ ঢেউ আঁছড়ে পড়ে দু-পায়ে। মাছ ধরার সাম্পানগুলোর বাঁশের আগায়, রঙ-বেরঙের পতাকা আকৃতির কাপড় দখিনা বাতাসে পতপত করে ওড়ে। পুরো সৈকতজুড়ে পিনপতন নীরবতা। আমরা হেঁটে বেড়াই। এক মাঝির জীবন সংগ্রামের গল্প শুনি। পাশেই দাঁড় করিয়ে দিই বৈমানিক জামিলকে। একজন আকাশ, আরেকজন পানি পথের চালক। অথচ দু’জনের জীবনযাপনে কী অদ্ভুত গড়মিল। এবার যাই চলে যাই হ্যোয়াইকং। শ্যামলাপুর বাজার পেরিয়ে অবারিত সবুজের ক্যানভাসের ভিড়ে, সরু সড়কে চান্দের গাড়ি ছুটে চলছে হেলেদুলে হাঁড়িখোলার দিকে। চলতে চলতে টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য পেছনে ফেলেই কুদুমগুহা যাওয়ার ফটকে গাড়ি ব্রেক। বন বিভাগের বেশকিছু সাইনবোর্ড ঝুলছে, কিন্তু কাউকে পাওয়া গেল না। ইট বিছানো পথে গাড়ি কিছুদূর গেল। এবার গাড়ি ছেড়ে পায়ে হাঁটা শুরু। বন্ধুদের শোনালাম হাতি, অজগরের কাহিনি। জানিয়ে দিলাম হাতি সামনে পড়লে সালাম দিয়ে পরিচয় জানাবে। শুধুমাত্র ভয়ে পিলে চমকালো হালিমের। এছাড়া সবাই যেন প্রস্তুত রয়েছে বন্যপ্রাণী আক্রমণের লাইভ দেখার প্রত্যাশায়। কিছুক্ষণ হাঁটার পরই পেয়ে গেলাম কয়েকজন বন প্রহরীকে। তাদের একজনকে সঙ্গী করে ছুটলাম। শুরু হলো রোমাঞ্চকর ট্রেইল। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই কুদুমগুহা মুখের দেখা পেলাম। আমিত পুরোই থ। অথচ ৮/৯ বছর আগে যখন এসেছিলাম তখন হাইকিং-ট্র্যাকিং ছিল প্রায় ঘণ্টা দেড়েক। সঙ্গে পুলিশ স্কটও ছিল। পর্যটনবান্ধব করায় আজ আর নেই সেই অ্যাডভেঞ্জার ফ্লিংস। দিনদিন সবকিছুই কেমন যেন কৃত্রিমতায় গ্রাস করে নিচ্ছে।
এবার গুহার ভেতরে প্রবেশের পালা। ১৬ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন আমি, নাদিম, রনি ও সবুর পানিতে নেমে গেলাম। বাকিরা হা করে তাকিয়ে রইল। বুঝে নিলাম এরা দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের দামাল নয়। তাই বেশি জোর করলাম না। শুরুতেই কমর পানি। ধীরে ধীরে গুহার ভেতর এগিয়ে যাচ্ছি। অন্ধকার অনেকটাই গিলে খেলো। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে দিলাম। মাঝামাঝি যাওয়ার পর বুক পর্যন্ত পানি। শতশত চামচিকা আর বাদুড়ের উদ্ভট আওয়াজ। গুহার দৈর্ঘ্য প্রায় ২০০ মিটার। প্রথমদিকে প্রস্থ প্রায় ১২ ফুট হলেও শেষের দিকে সম্ভবত ৪/৫ ফুট হবে। অনেকটাই ভূতুড়ে পরিবেশ। এবারের প্রাপ্তি ছিল গুহার শেষ প্রান্ত প্রর্যন্ত পৌঁছানো। শুনেছি অজগরের প্রিয় খাবার নাকি চামচিকা। দুঃখের বিষয় অজগরের দেখা মেলেনি। বেশ কিছুটা সময় গুহার ভেতর কাটিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে বের হয়ে এলাম। কুদুমগুহা মূলত বালুমাটির তৈরি প্রাকৃতিক গুহা। এর ভেতরে থাকা জমানো পানি বেশ স্বচ্ছ টলটলে। গুহার প্রাচীর থেকে অনবরত পানি চুয়ে পড়ে। গুগল সূত্রে জেনেছি, গুহার ভেতর ছোট ছোট আকৃতির অজগর, বিরল প্রজাতির প্রভাতি বাদুড় ও নানা প্রকারের মাছের বিচরণ রয়েছে। গুহার প্রবেশমুখে মাকড়শা রয়েছে। সব মিলিয়ে কুদুমগুহাটি বেশ রোমাঞ্চকর।
ফিরতি পথে বন্ধুরা হাসতে হাসতে বললো, কত কী শোনাইলি, কতই না দেখাইলি ভয়, তার তো কিছুই দেখলাম না। এই জগতে মানুষের ওপর যেমন ভালো কিছু নেই, ঠিক তেমনি ক্ষতিকারক প্রাণী হিসেবেও জুড়ি মেলা ভার। আগের যখন এসেছিলাম তখন গুহার প্রবেশমুখেই মাকড়শার বিশাল জাল আর অজগরের খোলস দেখতে পেয়েছিলাম। আর এবার সব শ্রেণির অবাধ আগমনের লক্ষ্যে, পর্যটনবান্ধব কার্যক্রম চালাতে গিয়েই হয়তো আসল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিলীনের উপক্রম। রতন-মান্নান তো হাতির মল দেখেই বেশ তৃপ্তি পেল। আর পাবেই বা না কেন! আফ্রিকা মহাদেশে এই হাতির মল থেকেই দুনিয়ার সবচাইতে দামি কফি বানানো হয়। ইস! খাবারের কথা ভাবতেই পেট বাবাজি জানান দিলো। সেই সকালে খেয়েছিলাম। এখন প্রায় ৫টা। যাই খেয়ে নিই আগে। শ্যামলাপুর বাজারের এক হোটেলে, সাগরের সুরমা মাছ দিয়ে গরম গরম ভাত খেলাম সাবাই পেটপুড়ে। একটা সময় ছিল যখন এই বাজারের নাম শুনলেই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কারণে ভয়ে দেহ-মনে জেগে উঠতো শিহরণ। কোথাও ঘুরতে গেলে বিন্দুমাত্র বন্যপ্রাণীর জন্য ভয় লাগে না, কিন্তু মানুষরূপি জন্তুদের হিংস্রতা মাথায় রাখতে হয় ঠিকই। শ্যামলাপুর বাজারে আতঙ্কের সেদিন আর নেই। যে কেউই এখন খাবেন-দাবেন নিশ্চিন্ত মনে। যাই এবার গেম রিজার্ভ ফরেস্টের গর্জন বাগান। সেখানে রয়েছে শতশত বছরের পুরনো সব দিগন্ত ছোঁয়া গর্জন বৃক্ষ। আজ থাক সেই গল্প। তুলে রাখলাম প্রাকৃতিক গর্জনের কাহিনি আগামী কোনো এক সময়ের জন্য।
যাতায়াত:
ঢাকার সায়েদাবাদ, গাবতলীসহ দূরপাল্লার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে কক্সবাজারের বাস ছাড়ে। কক্সবাজার থেকে সিএনজি, চান্দের গাড়ি কিংবা মাইক্রোতে চড়ে মেরিন ড্রাইভ ঘুরে হোয়াক্যং-এর কুদুমগুহা।
খরচ:
ঢাকা-কক্সবাজার বিভিন্ন পরিবহন অনুযায়ী প্রতি আসন ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত। কটেজ/রিসোর্ট ভাড়া ৪ জনের রুম প্রতি ২০০০ থেকে ১২০০০ হাজার টাকার ওপরেও পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের প্রতিটি পর্যটন এলাকায় সিজন ভেদে খরচের তারতম্য ঘটে।
ছবি: ওপেন ফ্রেন্ডস গ্রুপ