নিজের ফাঁদেই ট্রাম্প

তালেব রানা

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের ভোটে তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসিত হয়েছেন। কিন্তু কোনো প্রেসিডেন্ট প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেই পদ হারান না। পদ থেকে সরাতে হলে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের বিচারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়। এজন্য সিনেটের ১০০ সদস্যের কমপক্ষে ৬৭ জনকে অপসারণের পক্ষে ভোট দিতে হয়। বর্তমানে সিনেটে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের ৫৩ জন সিনেটর রয়েছে, ডেমোক্র্যাটদের আছে ৪৫ আর দুই জন সিনেটর হলেন স্বতন্ত্র। এ অবস্থায় ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরানোর সম্ভাবনা খুবই কম। সিনেটে অভিশংসন বিচারের ধরন কেমন হবে বা নিয়ম কী হবে— সেটা নিয়ে রিপাবলিকান সিনেটরদের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের মতভিন্নতার কারণে বিচার শুরু হতে বিলম্ব হয়েছে। সিনেটের বিচারে নতুন সাক্ষী ও তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের জোর দাবি জানিয়ে আসছে ডেমোক্র্যাটরা। তারা চাইছিল, এ নিয়ম নিশ্চিতের পরই আর্টিকেল অব ইমপিচমেন্ট সিনেটে পাঠাতে। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত আর্টিকেল অব ইমপিচমেন্ট পাঠানোর পর গত মঙ্গলবার থেকে সিনেটে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। যদিও প্রথমদিনই বিচারের নিয়ম নিয়ে আনা প্রস্তাবের ওপর বিতর্ক হয় দুই পক্ষের মধ্যে। ঐ বিতর্ক চলে প্রায় ১৩ ঘণ্টা।

আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের বাত্সরিক ভাষণ বা স্টেট অব দি ইউনিয়নের দিন ধার্য রয়েছে। রিপাবলিকানরা চাইছে, এর আগেই বিচার শেষ করতে। সিনেটের মেজরিটি লিডার মিচ ম্যাককনেল তার প্রস্তাবে বলেন, দুই পক্ষ তাদের যুক্ততর্ক তুলে ধরতে দুই দিনে মোট ২৪ ঘণ্টা সময় পাবে। কিন্তু এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ডেমোক্র্যাটরা। শেষ পর্যন্ত ম্যাককনেল তার প্রস্তাবে কিছুটা সংশোধনী আনেন। এখন দুই পক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক তুলে ধরতে ২৪ ঘণ্টা করে সময় পাবেন তিন দিনে। আর নতুন সাক্ষী ও তথ্যপ্রমাণ সিনেটের বিচারে তোলা হবে কিনা এ বিষয়ে দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের পর আবারও বিতর্ক ও ভোটাভুটি হবে। এই প্রস্তাব পাশ হতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে। এরই মধ্যে তিন দিন যুক্ততর্ক উপস্থাপন করেছেন ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে কাজ করা ইমপিচমেন্ট ম্যানেজাররা। এই টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডেমোক্র্যাট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যাডাম শিফ। বুধবার যুক্তিতর্কের প্রথম দিন তিনি বলেন, বেশির ভাগ মার্কিনি বিশ্বাস করে সিনেট হবে নিরপেক্ষ। উপযুক্ত বিচারক হিসেবে কাজ করার জন্য সিনেটরদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। শুনানিতে ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ উপস্থাপন করেন অ্যাডাম। এর একটিতে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, সংবিধান তাকে যা খুশি করার ক্ষমতা দিয়েছে। তার বিচারে যেসব কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেবেন—তাদের জরিমানা করা হবে। শিফ বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার নামে ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহারের ভয়ংকর সব প্রমাণ আড়াল করতে চান। দ্বিতীয় দিনের যুক্তিতর্কে অ্যাডাম শিফ বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছেন। এটা সম্পূর্ণ সত্য। এ সত্যকে যদি আমরা গুরুত্ব না দিই তাহলে সংবিধানও আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। শুক্রবার তৃতীয় ও শেষদিনের যুক্তিতর্কে শিফ সতর্ক করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। তাকে ক্ষমতা থেকে না সরালে আবারও তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে অপব্যবহার করবেন। তিন দিনের যুক্তিতর্কে মূলত ট্রাম্পের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কংগ্রেসের বিচারে বাধাদানের অভিযোগের পক্ষেই যুক্তি দেন অ্যাডাম শিফ ও তার টিমের সদস্যরা। একইসঙ্গে চলে নতুন সাক্ষী ও প্রমাণ আনতে রিপাবলিকান সিনেটরদের প্রভাবিত করার চেষ্টা। শনিবার প্রথম দিনের অল্প সময়ের জন্য যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন ট্রাম্পের আইনজীবীরা। আজ সোমবারও তারা ট্রাম্পের পক্ষে লড়বেন। 

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরাবরই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এমনকি তাকে কেন অভিশংসিত করা হয়েছে—সেটা তিনি বুঝতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। কিন্তু তার এ ধরনের কথাবার্তা তাকে বিপদে ফেলতে পারে! মার্কিন গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের অডিও টেপই তাকে বিপদে ফেলতে পারে। সিএনএনের এক খবরে বলা হয়েছে, সিনেটের বিচারে নতুন সাক্ষী আনা বন্ধ করতে পারে রিপাবলিকানরা। কিন্তু এই মামলায় অন্য কারোর চেয়ে ট্রাম্প নিজেই ডেমোক্র্যাটদের সুবিধা করে দিতে পারে। অ্যাডাম শিফ উপস্থাপন করা ভিডিওতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ-২ অনুযায়ী আমার যা ইচ্ছা করার অধিকার আছে। এই ভিডিওর মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা বলার চেষ্টা করেছেন, ইউক্রেনের ওপর সৃষ্টির মূল হোতা বাইরের কেউ নন বরং ট্রাম্প নিজেই।

খবরে বলা হচ্ছে, এ মন্তব্যের টেপ সামনে আসার পর সিনেটরদের সাক্ষী আনার বিষয়টি ভাবতে হবে। রক্ষণশীল কলামিস্ট স্কট জেনিংস সিএনএনকে বলেন, ট্রাম্পের আচরণ দেখে কোনো কোনো রিপাবলিকান সিনেটর মনঃক্ষুণ্ন হতে পারেন। কিন্তু এর ভিত্তিতে কোনো বড়ো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ কম। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের দুটি ভিডিও বারবার দেখিয়ে সিনেটরদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, ন্যায়বিচারের জন্য সাক্ষী আনা প্রয়োজন। এরই মধ্যে রিপাবলিকান সিনেটর মিট রমনি জানিয়েছেন, বিচারে সাক্ষী আনার পক্ষে মত দিতে পারেন তিনি। তবে এই প্রস্তাব পাশ হতে ৫১ জন সিনেটরের সমর্থন লাগবে। সেক্ষেত্রে অন্তত চার জন রিপাবলিকান সিনেটরকে ভোট দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকান সিনেটররা নতুন সাক্ষী আনতে দেবেন কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।