এক জয়িতার গল্প

জীবনের গল্প অথবা গল্পের জীবন যেটাই বলি না কেন, সে জীবন যদি আনন্দময় না হয়ে বিষাদপূর্ণ হয়, তাহলে বেঁচে থাকার কী অর্থ আছে বলুন! আকাশে যখন রংবেরঙের ঘুড়ি ওড়ে, আমরা মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি। দেখি ওদের কাটাকুটি খেলা, কিন্তু নাটাই থেকে সুতা কেটে ঘুড়িটা যখন আটকে যায় পুরোনো কোনো বাড়ির ভাঙা অ্যান্টিনার ফাঁকে, দুম করে মনটা খারাপ হয়ে যায়। জীবনটাও ঘুড়ির মতো, এই বেশ উড়ছে, আবার আটকে যাচ্ছে কোথাও না কোথাও। সেই আটকে যাওয়া জীবন থেকে মুক্তি পেতেই কেউ কেউ কাটাকুটি খেলার মতো অবিরাম লড়াই করে চলেছে।

আজ তেমনই এক জয়িতার গল্প বলব। যে গল্পে  কোনো রাজনীতিবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, মডেল বা অভিনেত্রী নেই। তবুও এ শহরের অনেকেই চিনবে তাকে। ভাবছেন, লোকে কেন চিনবে?

কারণ এ শহরের একটা বিশেষ আঙিনাজুড়ে তার বসবাস। উচ্চমার্গীয় কোনো ব্যক্তি নয়, খেটে খাওয়া খুব সাধারণ একজন মানুষ সে। সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রেখেছে এই তারকা মানবী। হ্যাঁ, সে আমার কাছে তারকা তো বটেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে সেই ছোটবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে চা বিক্রি করে জীবনধারণ করছে, জোগাড় করছে আর পাঁচটা ভাই-বোনের মুখের অন্ন। অভাবের সংসারে বাবা ফেলে রেখে পাড়ি জমিয়েছেন ওপারে, জন্ডিস বাঁধিয়ে। অসহায়-নিরুপায় মায়ের একমাত্র ভরসা এই ছোট্ট মেয়ে—কণা।

অভাব-অনটনের ভেতর থেকেও কণা যে জিনিসটাকে অহর্নিশ সঙ্গী করে রেখেছে, সেটা ওর হাসি। মিষ্টি মায়াবী সেই হাসি আলতো করে ওর পাতলা গালে সব সময় লেগেই থাকে। চোখে চোখ পড়লেই হাসি দিয়ে সৌহার্দ্য প্রকাশ করে বোঝায়, জীবনটা শুধু বিষাদের নয়, উচ্ছ্বাসেরও।

কেবল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নয়, টিএসসিতে আগত কমবেশি অনেকেই কণাকে চেনে। শীতের মৌসুমে কণার ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। নরম কচি হাতে নারকেল আর গুড় মাখিয়ে চালের গুড়ি দিয়ে বানাতে থাকে একের পর এক ভাপা পিঠা। ক্যাম্পাসের তারুণ্য দীপ্ত ছেলেমেয়েদের হাতে গরম চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে কণা দীক্ষা নেয় অগ্নিকন্যার। এই তরুণদের দিকে তাকিয়েই কণা নিজেকে সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার এক দৃঢ় বাসনা লালন করে নিজের ভেতরে। আর তাই একটু একটু করে চালিয়ে নেয় নিজের লেখাপড়াটা।

সেদিনের সেই ছোট্ট কণা আজ এইচএসসি পাস করেছে। অনেক দিন পর কণার সঙ্গে দেখা হলো। হলো নানা পারিবারিক গল্প। ভাই-বোনদের কেউ কেউ বিয়ে থা করেছে।

জানতে চাইলাম, ‘নিজে বিয়ে করছিস না কেন?’ জানাল, মায়ের ক্যান্সার। মাকে দেখতে হয়। টাকার অভাবে অনার্সে আর ভর্তি হওয়া হয়নি। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাই ওকে ঢাবির রেজিস্ট্রার অফিসে একটা চাকরি দিয়েছে। তাতে কণা কৃতজ্ঞ ও খুশি। সারাদিন অফিসের কাজ করে ভাইকে সাহায্য করতে কণা চলে আসে সন্ধ্যায় ওর প্রিয় ক্যাম্পাসে। যেখান থেকে ও স্বপ্ন বুনতে শিখেছে। যে ক্যাম্পাস ওকে পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবার প্রেরণা জোগাচ্ছে রোজ।

‘কণা, পড়ালেখাটা চালিয়ে যা যেভাবেই হোক।’ ‘হ্যাঁ, আপু ভাবছি। এবারই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনের বিএতে ভর্তি হব, দোয়া করবেন।’

সব মানুষের শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য এবং সর্বোপরি জীবন একই রকম হয় না বা হতেই হবে এমন কোনো বিধি-বিধান কোথাও লেখা নেই। বিধাতা হয়তো চাননি বলেই জীবনের এত এত ভাঙা-গড়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয় কাউকে কাউকে। কণা হয়তো তাদেরই একজন। কিন্তু প্রকৃতি বিরূপ হলেও তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রকৃতি ও নিয়তি দুটোকেই মোকাবিলা করতে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করেছে যে জয়িতা, সে আর কেউ নয়, সেদিনের সেই ছোট্ট চা-বিক্রেতা আজকের কণা। ভাইবোনদের জন্য, মায়ের জন্য নিরন্তর ভেবে চলেছে এই মেয়েটা। পারিবারিক মূল্যবোধ আজকাল খুব কম মানুষের ভেতরে দেখা যায়। ক’জন ভাবে নিজেকে ছাড়া অন্যদের নিয়ে? এটাই বোধহয় শিক্ষা, এটাই বোধহয় মানবতা! সাধুবাদ কণা—এভাবেই একজন স্বপ্নবাজ হয়ে, আগামীর সম্ভাবনা হয়ে, পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে বেঁচে থাক এই ক্ষয়ে যাওয়া ধরণীর বুকে। নাটাইবিহীন ঘুড়ি হয়ে রঙিন প্রজাপতির মতো ইচ্ছে ডানায় ভর করে উড়ে বেড়াক আকাশজুড়ে...