নির্বাচনী ইশতেহারে কী আছে, কী নেই

ড. এম এ মাননান

ত্রিশে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অনেক দিন ধরেই তোড়জোড় চলছে ইশতেহার প্রকাশের। চিন্তাবিদেরা, দলগুলোর হিতৈষীরা, রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা লেখালেখি আর টকশো’র মাধ্যমে নানা পরামর্শ ও  প্রত্যাশা প্রকাশ করে ইশতেহার-প্রণেতাদের পথনির্দেশ দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং ঐক্যফ্রন্টসহ অন্য অনেক দল নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। দলগুলোর রাজনৈতিক আদর্শ, প্রতিশ্রুতি, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পন্থাগুলোসহ বিভিন্ন ভবিষ্যত্-ভাবনা ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে। এগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, দলগুলো নির্বাচনে জিতলে কী কী কাজ করতে চায় আর কীভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে চায়।

 দেশের প্রাচীনতম, তৃণমূলে সুগভীর শেকড় থাকা, কাজে বিশ্বাসী, জনহূদয়ে প্রোথিত, সারা দেশের সর্বত্র বিস্তৃত, স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে প্রায় এককভাবে সকল বাঙালিকে এক মঞ্চে নিয়ে আসায় পারঙ্গম এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করাসহ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠিত করে টিকিয়ে রাখার কঠিন যুদ্ধে নিবেদিত রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার প্রকাশ করেছে তার বিষয়বস্তু সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছে বলে মনে হচ্ছে। এটি বাস্তবসম্মত একটি ইশতেহার যেখানে প্রতিশ্রুতির ফাঁপা বেলুন নয়, আছে সুচিন্তিত ভাবনার ছোঁয়া। দেখা যাক,  ৮০ পৃষ্ঠার এই ইশতেহারে কী আছে, কী নেই, আর যা আছে তা কতটুকু বাস্তবসম্মত।

বাস্তবতার আলোকে বিগত দশ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে দলটি ইশতেহারটিতে বলছে প্রত্যয় নিয়ে: সকলের জন্য ২০২০ সালের মধ্যে বিদ্যুত্ নিশ্চিত করবে; ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ এবং পাঁচ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করবে; প্রতিটি গ্রামে নাগরিক সুবিধা দেওয়া হবে; তারুণ্যের শক্তিকে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি হিসেবে চিহ্নিত করে এক কোটি আটাশ লাখ তরুণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে; ধর্মের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে কোরআন-সুন্নাহ্র আলোকে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে; রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর করার লক্ষ্যে বুলেট ট্রেন চালুসহ উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যাতায়াতের সুবিধার্থে যমুনার তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণ করা হবে এবং টেকসই বিনিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। অঙ্গীকারের মধ্যে আরও রয়েছে তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গসমতা ও শিশু কল্যাণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স গ্রহণ, মাদকের কবল থেকে জাতিকে রক্ষা, জঙ্গিবাদ আর সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলকরণ, পুষ্টিসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা, শিক্ষার মান আর স্বাস্থ্য সেবা উন্নতকরণ, দারিদ্র্য নির্মূল, কর্মক্ষেত্রে নারীপুরুষের সমান মজুরি প্রদান নিশ্চিতকরণ সহ বাল্যবিবাহ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা, দারিদ্র্যের হার ১২.৩ শতাংশে আর চরম দারিদ্র্যের হার পাঁচ শতাংশে হ্রাসকরণ, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প অব্যাহত রাখাসহ প্রতি পরিবারে অন্তত একজনের রোজগারের ব্যবস্থাকরণ, সর্বপ্রকার বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আইনের শাসন আর গণতন্ত্র সুদৃঢ়করণ, যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষিব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ সড়কে নিরাপদে চলার নিশ্চয়তা, সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার, সমুদ্র-অর্থনীতি ও সমুদ্র সম্পদ উন্নয়ন, প্রবীণ আর প্রতিবন্ধীদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণ, নির্বাচন-পরবর্তী পাঁচ বছরে জিডিপি দশ শতাংশে উন্নীতকরণ,  প্রতিটি উপজেলায় যুব-উন্নয়নের লক্ষ্যে যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট আর সুস্থ বিনোদন নিশ্চিতের লক্ষ্যে তরুণদের জন্য বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনসহ প্রতি বছর এক হাজার যুবক-যুবতীর বিদেশে কর্মসংস্থান ও প্রতিটি জেলায় যুব স্পোর্টস কমপ্লেক্স স্থাপন, প্রতি বিভাগীয় শহরে আইটি শিল্পপার্ক আর মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং সারা দেশে এক বছরের নিচে আর ৬৫ বছরের উপরে সকল নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।  প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে তারুণ্যকে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বিনা জামানতে ও সহজশর্তে জনপ্রতি বর্তমানের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণসুবিধা আরও সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি মহাসড়কের পাশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আন্ডারপাস/ওভারপাস নির্মাণসহ সামষ্টিক অর্থনীতি বিষয়ক করণীয়গুলোকে স্পষ্ট করা হয়েছে। সম্পূর্ণ বাস্তবতার আলোকে বলা হয়েছে: বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে ২০২১ সালে যে বছরটি হবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছর। আগামী পাঁচ বছরে মাথাপিছু আয় ১০ শতাংশে উন্নীত করে মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে ২০৩০ সালে করা হবে পাঁচ হাজার ৪৭৯ ডলারের বেশি এবং ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে উন্নত দেশ, যখন সমগ্র দেশ হবে দারিদ্র্যমুক্ত। বাজেট হবে জেলাভিত্তিক, কর্মসংস্থান হবে দেড় কোটি মানুষের, থাকবে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা আর যুবসমাজকে করা হবে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর।

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ইতিহাসে এই প্রথম মেগা প্রকল্প সংক্রান্ত বিশাল চ্যালেঞ্জিং অঙ্গীকার করা হলো আওয়ামী লীগের ইশতেহারে। কোনো রাজনৈতিক দল কখনও কোনো প্রকার মেগা প্রকল্প নিয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সাহস দেখায়নি। এবার শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে আওয়ামী লীগ ইশতেহারে দশটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেগুলো হলো— পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা মাস-রেপিড ট্রানজিট প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল, মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম, পায়রা সমুদ্র বন্দর, পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন স্থাপন। পদ্মাসেতুসহ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ আগে থেকেই শুরু হয়েছে, কিছু সমাপ্তও হয়েছে। সুতরাং সরকার গঠন করতে পারলে আওয়ামী লীগ যে সকল মেগা প্রকল্প সফলভাবে সমাপ্ত করতে পারবে তা সহজেই অনুমেয়। অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। অভিজ্ঞদের জন্য যা সংগত তারই প্রতিফলন হয়েছে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে। বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রবৃদ্ধির উপর— যাতে দেশ অব্যাহতভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে, সব মানুষ উন্নয়নের সুবিধা সমভাবে ভোগ করতে পারে।

তারুণ্যের শক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্বে সম্পৃক্ত করার প্রত্যয়টি বিশেষভাবে ভালো লেগেছে। আরও ভালো লেগেছে সরকারি চাকরিতে মেধা আর যোগ্যতার বিষয়টিকে বিবেচনা করার অঙ্গীকার, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি কমিশন, গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করার ইচ্ছা, আর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ বিধানের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।  

কাজ করে যারা, ভুলও করে তারাই। সক্রিয় কর্মীদের জন্য ‘ভুল’ ভবিষ্যতের সাফল্যের পিলার হিসেবে কাজ করে। আর যারা কাজ করে না বা কাজ করতে জানে না, এমন ধরনের লোকদের ভুল হওয়ার কোনো সুযোগও আসে না। বিগত দশটি বছর ধরে টানা ক্ষমতায় থেকে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে সরকার হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল করতে পারে, যা প্রকৃতির নিয়মেই স্বাভাবিক। যদিও বিগত বছরগুলোতে নেতৃত্বের দূরদর্শিতার কারণে অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য প্রায় সবকিছুতে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় পর্যায়ে এগিয়ে গেছে, তবুও মনে করি আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। পৃথিবী এগুচ্ছে দ্রুত গতিতে। আমাদেরকেও এ গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তাই আমরা আশা করব, ভবিষ্যতে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সে বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতিপ্রণেতাসহ বাস্তবায়নকারীরা সচেষ্ট থাকবে। আমাদের প্রত্যাশা, সুশাসনে আরও বেশি নজর দেওয়া হবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত থাকবে এবং স্বাধীনতা-বিরোধীদের কোনো অবস্থাতেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না (যা অন্যরা সরকারে থাকলে করবে না, তা তো তাদের ইশতেহার থেকেই বোঝা যায়), গ্রামেগঞ্জে শান্তিশৃঙ্খলা আরও সুসংহত করা হবে, শিক্ষাখাতের উন্নয়নে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার প্রতি সকল স্তরের মানুষের আগ্রহকে আরও বেশি করে উদ্দীপিত করা হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকে গতিশীল ও মানবিক করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা/ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা তৈরি করে দেওয়া হবে, চাঁদাবাজি-হয়রানি আর নারী নির্যাতন-যৌতুক নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সর্বোপরি, ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য কী করা হবে, কীভাবে করা হবে সে সম্পর্কিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা থাকাও কাম্য।

‘দিন বদলের সনদ’ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’-কে বাস্তবে রূপ দিয়ে আজকের ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শ্লোগানে দেশটি এগিয়ে যাবে স্বাধীনতার স্বাপ্নিক স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যার হাত ধরে আরও আরও সমৃদ্ধির পথে, আকাশ-ছোঁয়ার পথে, স্বপ্নের সোনার বাংলার পরিপূর্ণ রূপ দেওয়ার পথে। নির্বাচনকে উপলক্ষ করে পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যেক ভাবনায় রেখে জাতি আজ এটাই প্রত্যাশা করে।

n লেখক: উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়