করোনা অ্যান্টিভাইরাসের খোঁজে মাসুদ রানা

রম্য গল্প

/ বিশ্বজিত্ দাস

‘তোমাকে চীনে যেতে হবে?’ গমগম করে উঠল বজ্র কণ্ঠস্বর। ঘর প্রায় কেঁপে গেল।  ‘চী...চী...নে...!’ চিনচিনে গলায় আর্তনাদ করে উঠল মাসুদ রানা। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের দুর্ধর্ষ স্পাই।

‘হ্যাঁ, চীনে। চাইনিজ সিক্রেট সার্ভিসের লি ফু চুং আজ সকালে ফোন করেছিল। তুমি ঢাকাতেই আছ জেনে তোমাকেই চেয়ে বসল।’

রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিলেন বিসিআইয়ের কর্ণধার মেজর জেনারেল রাহাত খান (অব.)। যেন কথা শেষ হয়ে গেছে, তুমি এবার যেতে পার।

‘স্যার, চীনে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আমার কি ওখানে যাওয়া ঠিক হবে?’

‘না কোরো না তো রানা। করোনা ভাইরাসে তোমার কিছু হবে না।’

‘হবে না! মানে?’ চমকে গেল রানা।

‘ছোটবেলায় টিকা দিয়েছ না?’ জানতে চাইলেন বুড়ো।

মনে মনে বুড়োর পিণ্ডি চটকাল রানা। আর ছোটবেলায় টিকা দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা বাসায় এলে টয়লেটে যেয়ে লুকিয়ে থাকত রানা। সেখান থেকে হিড়হিড় করে ধরে এনে জোর করে সিরিঞ্জ বিঁধিয়ে দিত তারা।

সেসব কথা এখন কেন!

রানার মনের কথা যেন পড়তে পারলেন বুড়ো।

‘শোন রানা, তুমি যেসব টিকা নিয়েছিলে বেশিরভাগই ছিল নকল, যা আবার বর্তমান করোনা ঠেকাতে বেশ কার্যকরী। তাই চীনে গেলে করোনাতে তুমি আক্রান্ত হবে না, বুঝেছ।’

মাথা ঝাঁকাল রানা।

‘চীনে তাহলে কেন যাচ্ছি স্যার?’

‘ফু চুং ধারণা করছে, কোনো থার্ড পার্টি আমেরিকা আর চীনের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চাইছে। কে বা কারা যেন আন্তর্জাতিক মহলে গুজব রটাচ্ছে, করোনা ভাইরাস নাকি আমেরিকার সৃষ্টি। তারাই চীনে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। ট্রাম্পও এ নিয়ে চিন্তিত। কাল রাতে ফোন করে আমার কাছে হেল্প চেয়েছে। ওদিকে চীন চাইছে আমরা যেন সত্যিটা উদ্ঘাটনে সাহায্য করি।’

‘এমন ভাইরাস ছড়ানোর মতো শয়তান তো একজনই আছে।’ চিন্তিত স্বরে বলল রানা।

‘কবির চৌধুরী। বেঁচে আছে? কী মনে হয় তোমার?’

‘ওর তো মতিগতি কিছুই বুঝি না। এই মরে, এই বাঁচে। কখনো নিজের কপি বানায়! আজব ক্যারেকটার! ’

‘যা হোক, চীনে যাচ্ছ তুমি। এই তোমার মেডিকেল পরীক্ষার রিপোর্ট। এক সপ্তাহ পরের ডেটে করা। তুমি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত।’ একটা ফাইল রানার সামনে ঠেলে দিলেন বুড়ো।

‘মা... মা... নে? ’ঢোঁক গিলল রানা।

‘মাসুদ রানা নয়, চীনে তুমি যাবে বিজনেস ম্যাগনেট আশরাফ চৌধুরী হিসেবে। সেখানে যেয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবে। এরপরই তুমি অনেক টাকা দিয়ে অ্যান্টিভাইরাস কেনার জন্য মোটা অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করবে। আর তুমি আন্ডারওয়ার্ল্ডে খোঁজ নিয়ে জানতে পারবে, কেসি নামক কোনো একটা সংগঠন বা ব্যক্তি অ্যান্টিভাইরাস বিক্রি করছে। তুমি যেভাবে হোক সেখানে পৌঁছাবে এবং অ্যান্টি ভাইরাস হাসিল করবে, বুঝেছ?’

ফাইলে মুখ ডোবালেন বুড়ো। ভাবখানা এমন, তুমি এখন আসতে পার।

 

দুই.

‘এসো আশরাফ, এসো। আমি তোমারই প্রতীক্ষা করছি।’ পেছন ফিরে থাকা অবস্থায় রানাকে সম্বোধন করল লোকটি।

ধক করে উঠল রানার ভেতরটা। কোনো সন্দেহ নেই। বেঁচে আছে কবির চৌধুরী। আদি ও অকৃত্রিম কবির চৌধুরী। ঘুরল সে। চোখে কালো চশমা। আরো ইয়াং হয়েছে সে। চোখে মনে হয় দেখতে পাচ্ছে না। তাকিয়ে আছে আরেক দিকে।

‘জানো আশরাফ, তোমার আসার কথা শুনে ভেবেছিলাম আমার চিরশত্রু মাসুদ রানাই বোধহয় আসছে।’

‘মাসুদ রানা? কে সে?’ খসখসে গলায় বলল রানা। কবির চৌধুরী যেন চিনে না ফেলে।

একমুহূর্ত চুপ থাকল কবির।

‘তাকে তুমি চিনবে না। আমার জীবনের এক নম্বর শত্রু।’

‘বুঝেছি।’

‘কী বুঝেছ?’

‘তাকে পেলে তুমি মেরে ফেলবে। কারণ সে তোমার শত্রু। কিন্তু আমাকে বাঁচাও অ্যান্টিভাইরাস দাও। ’

‘টাকা এনেছ? ’

হাতে ধরে থাকা সুটকেস দেখাল রানা। পঞ্চাশ লক্ষ ডলার। সব জাল। সূক্ষ্মভাবে জাল করা। মেশিনে ধরা পড়বে না সহজে।

‘ই-ট্রানজেকশন করেও তো ডলারগুলো তো নিতে পারতেন?’

‘সেটা ঠিক হতো না। অনেক সময় ডলার বা টাকার পেমেন্ট সামান্য কারণেই আটকে যেতে পারে। তাছাড়া আমি অন্ধকার জগতের মানুষ। ব্যাংকে লেনদেন আমার জন্য ঠিক না।’

‘অ্যান্টিভাইরাস দিন।’ হাত পাতল রানা।

‘উঁহু! এভাবে না।’

ইশারা করল কবির চৌধুরী। অমনি কয়েকজন সাঙ্গপাঙ্গ রানাকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। জোর করে শুইয়ে দিল স্ট্রেচারে।

‘যতই ছদ্মবেশ নাও আর আমি চোখে না দেখি, তোমার গায়ের গন্ধ তুমি লুকোতে পারবে না রানা। আমি তোমাকে ঠিকই গন্ধ শুঁকে চিনে নিয়েছি।’

ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ঠিক করতে করতে বলল কবির চৌধুরী। অন্ধ হয়েও কীভাবে ইনজেকশন ঠিক করছে ব্যাটা! ভাবল রানা।

‘কহোনা পেয়ার হ্যায়...’ শিস দিতে দিতে গাইল কবির চৌধুরী।

একটু পর রানার বাহুতে সিরিঞ্জ ছোঁয়াল সে।

‘বুঝলে রানা, কোনো অ্যান্টিভাইরাসই আমি আবিষ্কার করিনি। করতে চাইছি। সেজন্য দরকার ছিল স্যাম্পল বডি। সে তো তোমাকে পেলামই। এই তোমার শরীরে দিলাম করোনার ভাইরাস। দেখি তুমি কতক্ষণ বাঁচো। আর হ্যাঁ, গবেষণার জন্য দরকার অনেক টাকা। সেটা তুমি এনে দিলে। এই নাহলে প্রিয় শত্রু। ’

হো-হো করে হেসে উঠল কবির চৌধুরী।   g