নিজাম উদ্দিন লাভলু
[ রামগড় প্রতিনিধি ]
হালদা নদী দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন ক্ষেত্র এবং বাংলাদেশের একটি মাছের খনি। খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা বেলছড়ির হাসুকপাড়া পাহাড় থেকে জন্ম নেওয়া অপার জীববৈচিত্রময় ও মত্স্য সম্পদে ভরপুর এ নদীটি দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে আসছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। অথচ এটি এখনো অবহেলিত। প্রাকৃতিক এ সম্পদ রক্ষায় হালদা নদী রক্ষা কমিটি ১৫ বছর যাবত্ নানা আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। সু-সংবাদ হচ্ছে, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সরকার হালদা নদীকে ‘বঙ্গবন্ধু মত্স্য হেরিটেজ’ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর অনুমোদনও দিয়েছেন। আগামী ১৭ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেওয়া হবে। সরকারের এ উদ্যোগে আনন্দ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে হালদাপাড়ের মানুষের মাঝে। স্বস্তি প্রকাশ করেছেন হালদা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. মনজুরুল কিবরীয়া। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন তিনি।
রামগড়ের পাহাড় থেকে উত্পত্তি হয়ে হালদা মানিকছড়ি, ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারি উপজেলার বুক চিরে চলে গেছে কর্ণফুলী নদীতে। রুই জাতীয় মাছের (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) পোনার জন্য এ নদীর আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকলেও এটি যোগাযোগ, কৃষি ও পানি সম্পদেরও একটি বড় উত্স। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ যে ক’টি প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশে রয়েছে তার মধ্যে হালদা অন্যতম। বর্তমানে এ নদী যথাযথ পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, মা মাছ শিকার, অপরিকল্পিত সুইস গেট নির্মাণ এবং বাঁক কেটে দেওয়াসহ মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে হুমকির সম্মুখীন। এর ফলে প্রতিবছর মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। এতে হালদা পাড়ের ডিম সংগ্রহকারী ও জেলেদের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি ও যুগ যুগ ধরে তাদের পূর্বসুরিদের ঐতিহ্যবাহী পেশা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অজানা আশঙ্কায় দিনযাপন করছে। হালদা নদীর প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সরকারের মত্স্য অধিদপ্তর ২০০৭ সালের জুলাই থেকে হালদা নদীর প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন ক্ষেত্র পুনরুদ্ধার প্রকল্প নামে একটি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করে। ৫ মেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় ২০১২ সালে। কিন্তু প্রকল্পটির সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ। হালদা নদীর সম্পদ, ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনা করলে এ নদী বাংলাদেশের জাতীয় নদীর স্বীকৃতি পাওয়ার উপযুক্ত। তেমনি বেশকিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য এটি আমাদের দেশের জাতীয় মত্স্য প্রজনন ঐতিহ্যের দাবিদার। অথচ গুণগত গবেষণা, সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও প্রচারের অভাবে এখনো হালদা নদীর জাতীয় ঐতিহ্য সম্পর্কিত পরিচয় সবার দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে গেছে। অপার জীববৈচিত্র্য ও মত্স্য সম্পদে সমৃদ্ধ এ নদী একদিকে যেমন মত্স্য খাতে অবদান রাখছে তেমনই অবদান রেখে চলেছে জাতীয় অর্থনীতিতে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, এ নদী থেকে ২০১০ সালে মাত্র দু-সপ্তাহেই আয় হয় ৯০০ কোট টাকা। গত ১০ বছরে এ নদী থেকে রেনু প্রাপ্তির হার প্রতিবছর ৬০৪.৬৪ কেজি। শুধু এ নদীকে অবলম্বন করে বেঁচে আছে ৩ হাজার জেলে আর এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২০ হাজার মানুষের জীবন। দেশের মোট মত্স্য উত্পাদনের ৬ শতাংশ আসে হালদা থেকে। হালদা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম, যার মধ্যে মত্স্য বিষয়ক গুরুত্ব সর্বাধিক। যেমন হালদা নদী বাংলাদেশের রুই জাতীয় মাছের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। এটিই বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী যেখান থেকে সরাসরি রুই জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। হালদা নদী থেকে ডিম আহরণ, আহরিত ডিম থেকে রেণু উত্পাদন এবং পরিচর্যার প্রযুক্তি স্থানীয়দের সম্পূর্ণ নিজস্ব। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিবছর হালদার অবদান ৮০০ কোটি টাকা, যা এখানে প্রাপ্ত ডিম, উত্পাদিত রেণু এবং মাছ থেকে আসে। এছাড়াও রয়েছে কৃষিজ উত্পাদন, যোগাযোগ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হালদার অবদানকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথিতে বজ্রসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত, উজানের পাহাড়ি ঢল, জোয়ার-ভাটার ক্রিয়া, তীব্র স্রোত, ফেনিল ঘোলা পানিসহ নদীর ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সমন্বিত ক্রিয়ায় হালদা নদীতে রুই জাতীয় মাছের প্রজননের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে মাছকে ডিম ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে, যা বাংলাদেশের অন্যান্য নদ-নদী থেকে একে আলাদা করেছে। হালদা নদী বাংলাদেশের রুই জাতীয় মাছের প্রধান প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক। হালদা নদী বন্দর নগরী চট্টগ্রাম শহরের সুপেয় পানির প্রধান উত্স। এসব গুরুত্ব বিবেচনায় স্থানীদের হালদা নদীকে জাতীয় ঐতিহ্য, এমনকি বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণার দাবি দীঘদিনের।