চীনা পরিব্রাজকের পরিদর্শনকৃত ভাসুবিহার

আমিনুল ইসলাম হিরু

[ সারিয়াকান্দি (বগুড়া) ]

 

প্রখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েনসাঙয়ের পরিদর্শনকৃত বগুড়ার ভাসুবিহার হতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাসুবিহার নির্জন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় দেশের অন্যান্য পর্যটন স্পটের মতো এর পরিচিতি নেই।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে গতবছর এখানে ২ দিনব্যাপী দেশের  বৃহত্ ‘প্রত্ননাটক’ মঞ্চস্থ হয়। ওই অনুষ্ঠানে সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা ছাড়াও দেশবরেণ্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। মিডিয়ার মাধ্যমে প্রত্ননাটক দেশ-বিদেশে প্রচার পাওয়ায় ভাসুবিহার অনেকটা পরিচিতি পায়।

অবহেলিত ভাসুবিহারে অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা হলে দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে উঠবে বলে অনেকে মনে করেন। ৩৭ একর আয়তনের ভাসুবিহার বর্তমানে অরক্ষিত রয়েছে। এর চারপাশে বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, বিদুত্ ও পানির ব্যাবস্থা, হোটেল, সৌন্দর্য বর্ধন, পিকনিক সেড, রেস্ট হাউজ, চৌশাগার নির্মাণ ও পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হলে এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন বেড়ে যাবে। সেইসঙ্গে টিকেট সিস্টেম চালু করা হলে  সরকারের রাজস্ব আহরণের সুযোগও সৃষ্টি হবে বলে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

এদিকে ভাসুবিহারের ১ মাইল পশ্চিমে রয়েছে শ্রংসান দিঘী। ৩শ’ বিঘা আয়তনের বৃক্ষ শোভিত, ছায়াঘেরা এই দিঘীর দৃশ্যও অপরূপ। এলাকাবাসীর দাবি ভাসুবিহারের সঙ্গে এই দিঘীর সংযোগ সড়ক তৈরি করা হলে ভাসুবিহার ঘুরতে আসা পর্যটকরা সহজেই দিঘীর পাড়ও ঘুরতে পারবেন। ফলে পর্যটন স্পট হিসেবে ভাসুবিহারের গুরুত্ব আরো বেড়ে যাবে।       

মহাস্থানগড় থেকে ৪ মাইল উত্তর পশ্চিমে এবং বিহার বৌদ্ধ স্তুপ থেকে ১ মাইল উত্তরে ভাসুবিহার বা বিশ্ববিহার অবস্থিত। ভাসুবিহার স্থানীয়দের কাছে নরপতির ধাপ নামেও পরিচিত। সম্রাট হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে ৬৩৮ সালে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েনসাঙ এই বিহার পরিদর্শনে আসেন। তিনি এই বিহারে ৩ মাস অবস্থান করেন বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। ভাসুবিহার একটি সুউচ্চ দ্বিতল, ত্রিতল অথবা চারতল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। এখানে ৭ শতাধিক বৌদ্ধ পণ্ডিত আবাসিক হোস্টেলে অবস্থান করে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৭৯-৮০ সালে  ভাসুবিহার পরিদর্শন করেন। তিনি এই বিহারকে হিউয়েনসাঙ বর্ণিত স্থান হিসেবে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করেন।

এগারো শতকে শৈবধর্মীদের উত্থানের ফলে বৌদ্ধদের প্রতি তাদের ঘৃণা, অবজ্ঞা ও শত্রুতায় বৌদ্ধরা ধর্মহীন সমাজে পরিণত হয়। ফলে ভাসুবিহারের চারতলা প্রাসাদটি পরিত্যক্ত হয়। দুর্বল পাল রাজাদের অনেকে রাজত্ব ছেড়ে শেষজীবনে এখানে সেবক হিসেবে বসবাস করতে থাকেন। সে জন্য এই বিহারের নাম হয় নরপতির ধাপ। সময়ের করাল গ্রাসে পাল বংশ বিনাশপ্রাপ্ত হলে পতিত অবস্থায় বিহারটি ধীরে ধীরে ধবংসপ্রাপ্ত হয়। ১৯৭৩-৭৪ সালে এই ধ্বংসপ্রাপ্ত বিহারটি প্রথমবারের মতো খনন করা হয়। খননের পর এখানে দশ শতকের দুটি আয়তাকার প্রাসাদ দেবালয়ের ভিত্তিমূল ও দুটি মন্দিরের ভিত্তিমূল আবিস্কৃত হয়। বিভিন্ন সময়ে ভাসুবিহার ধাপ খনন করে এখানে ৭ শতাধিক প্রত্ন নিদর্শন পাওয়া যায়।

এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার ইউনিয়ন পরিষদের চেযারম্যান মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভাসুবিহার খুবই অবহেলিত। পর্যটনের জন্য অপার সম্ভাবনাময় ভাসুবিহারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে এটি দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে উঠবে।’

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা বলেন, ‘বাউন্ডারি ওয়ালসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে আমাদের বাজেট সীমিত। তাই পর্যায়ক্রমে উন্নয়ন করা হবে।’

বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ বলেন, ‘পর্যটন অঞ্চলের উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ভাসুবিহারের উন্নয়ন হবে।’