জিসান মাহমুদ
[ কুয়েত থেকে ]
মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশ কুয়েত। কর্মসংস্থানের জন্য প্রায় ৪ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশির বসবাস এখানে। কর্মব্যস্ততার মাঝেও একটু সময় পেলে প্রবাসীরা ছুটে যায় মেরিনা বিচ, সবজি বাগান খ্যাত ওফরা কিংবা শেখ জাবের আল কসওয়ে সেতুতে। সৌদি আরব ও ইরাকের মধ্যবর্তী ছোট্ট এই দেশে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সেতু শেখ জাবের আল কসওয়ে। দীর্ঘতম এই সেতুটি কুয়েত সিটি থেকে আরব সাগরের ওপর দিয়ে যুক্ত হয়েছে বুবিয়ান ও সুবিয়া দ্বীপের সঙ্গে।
সেতুটির দৈর্ঘ্য ৪৮.৫৩ কি. মি। গতবছর ১ মে এর উদ্বোধন করা হয়। এটি কিনডাওয়ে হাইওয়ান ব্রিজ থেকে ৭ কি. মি দীর্ঘ। এই সেতুটি দেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। কিন্তু সময় সুযোগের কারণে যাওয়া হয়নি। তাই দেরি না করে আমরাও একদিন ছুটে চললাম সেতুটি দেখার জন্য। সবার মন খুব উত্ফুল্ল। কারণ এই প্রথম বিশ্বের কোনো বৃহত্তম সেতু দেখতে যাচ্ছে। বাসা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আমরা নিজস্ব গাড়িতে বিকেল ৪টায় সেখানে পৌঁছালাম। সেতুটি রাতে অন্যরকম এক দৃশ্য ধারণ করে। আমাদের মূল উদ্দেশ্যে রাতের সৌন্দর্য অবলোকন করা। গাড়ি থেকে নেমে আমরা দেখতে পেলাম অনেক পর্যটকদের আনাগোনা এখানে। প্রতিদিন কুয়েতের নাগরিকদের পাশাপাশি দেশটিতে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের নাগরিকরাও তাদের পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব মিলে সেতুটি এক নজর দেখতে আসেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও কর্মব্যস্ততার মাঝে মনকে প্রফুল্ল রাখতে আরব সাগরের ওপর নির্মিত এই সেতুতে ঘুরতে আসে।
আমরা প্রথমে কয়েকটি সেলফিতে নিজেদের আবদ্ধ করলাম। এবার আমাদের যাত্রা বুবিয়ান দ্বীপে। যতদূর চোখ যায় সাগরের প্রতিটি ঢেউ আমাদের মন কেড়ে নেয়। জলরাশির খেলা হিমেল ঠাণ্ডা হাওয়া ধেয়ে আসে দু-পাশ থেকে। মত্স ছানারা ছোটাছুটি করে আনমনা হয়ে। ক্ষুধা নিবারণে শতশত গাংচিল উড়ে বেড়ায় সাগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ছোট ছোট জাহাজগুলো দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। ব্রিজ থেকে কুয়েত সিটি দেখলে মনে হয় আরব সাগরে ছোট দ্বীপের মাঝে কুয়েত সিটি। দিনের আলো সৌন্দর্য এক রকম ও সন্ধ্যার পর আলোকসজ্জায় ব্রিজের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। বুবিয়ান দ্বীপে প্রবেশ করতে যাব এমন সময় দেখি রাস্তা বন্ধ। সেতু দেখতে আসছি, কিন্তু বুবিয়ান দ্বীপে যাব না তা কী করে হয়! কিন্তু কোনোভাবে সম্ভব না। বুবিয়ান দ্বীপে প্রবেশপথে বেশকিছু দোকান দেখতে পেলাম। দোকানে গিয়ে সবার জন্য কিছু খাবার নিয়ে নিলাম। এরপর আবার আমরা সেতুর দিকে রওনা হলাম। সেতুর মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে দেখলাম সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সেইসঙ্গে ব্রিজের সৌন্দর্য অন্যরকম রূপ ধারণ করেছে। সবাই সেতুর ওপর থেকে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত উপভোগ করলাম। রাতের সমুদ্র যেন আলাদা। ঢেউগুলো যেন আরো কাছে এসে আঁছড়ে পড়ছে। না দেখলে বুঝতে পারতাম না পৃথিবীটা এত সুন্দর। দু-পাশে সমুদ্রের গর্জন মাঝখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সেতুর দু-পাশে বন্দর, প্রশাসনিক ভবন, পর্যটন কেন্দ্র সব মিলিয়ে ১৫ লাখ বর্গমিটার জায়গার ওপর এটি নির্মিত। সেতুর মাঝখানে প্রতি ৪টি পিলার পরপর দুটি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কিছুদূর পরপর ইংরেজি ও আরবিতে লেখা দিক-নির্দেশনা বোর্ড আছে। যাতে সবাই সহজে বুঝতে পারে। এছাড়া এখানে গাড়ির গতি ৮০ থেকে ১০০ রাখার নির্দেশিকা রয়েছে। সেতুর ওপর গাড়ি পার্কিং নিষেধ থাকলেও পর্যটকরা চলার পথে গাড়ি থামিয়ে স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখতে ছবি ও সেলফি তুলে ব্যস্ত থাকে কেউ বা আবার ভিডিও কল ও ফেসবুকে লাইভ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। যেহেতু শীতকাল সেহেতু ঠাণ্ডার জন্য বেশিক্ষণ দাঁড়ানো সম্ভব ছিল না। সবাই গ্রুপ ছবি তুলে অবশেষে আমরা ফিরে এলাম বাসার দিকে।
খুবই সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন একটি জায়গা এটি। সমুদ্রের মাঝে দ্বীপ, বিশাল মরুভূমি, সমুদ্রের মাঝখানে কৃত্তিম উপায়ে তৈরি করা বিভিন্ন প্রজেক্ট, বলতে গেলে সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ। কুয়েতের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পর্যটকদের নজরকাড়ার মতো। প্রবাসীদের পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে না পারলেও স্বদেশে আছে এমন আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘোরাও কম কী সে!