মো. আমিরুজ্জামান
শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে নীলফামারীর সৈয়দপুরের শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু স্কুল। ইশারা ভাষায় তারা শিখছে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। শিখছে নৈতিক শিক্ষাসহ পাঠ্যসূচির পড়াও। ফলে বাড়ছে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
গত প্রায় ৮ বছর ধরে এই উপজেলায় প্রতিবন্ধী শিশুদের বাতিঘর হয়ে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। একটি বেসরকারি এনজিওর উদ্যোগে ২০১২ সালে এই স্কুলটি চালু হয়। প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে বিপদগ্রস্ত পরিবারগুলো ভরসা স্থল হিসেবে দেখে এ স্কুলকে। ব্যতিক্রমী এ স্কুলে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৩ জন। এর আগে অনেকে বাক প্রতিবন্ধী শিশু এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে। সৈয়দপুর উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকেও আসে প্রতিবন্ধী শিশুরা এখানে শিক্ষা নিতে।
সৈয়দপুর পৌর এলাকার অফিসার্স কলোনী শহীদ ক্যাপ্টেন সামসুল হুদা সড়ক (পাঁচমাথা মোড়) ঘেঁষেই শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু বিকাশ কেন্দ্র নামে প্রতিবন্ধী শিশুদের এই স্কুলের অবস্থান।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের জন্য নির্মিত এক কক্ষ বিশিষ্ট এই শ্রেণিকক্ষের ওয়ালে বিভিন্ন নীতিবাক্য আর রঙ-বেরঙয়ের বর্ণমালা দিয়ে সাজানো হয়েছে। ওয়ালে সাজিয়ে রাখা হয়েছে শিক্ষামূলক সুন্দর প্রসাধনীসহ বিভিন্ন বস্তু। মাদুর বিছিয়ে রেখে শিক্ষার্থীদের পাঠাদান করা হচ্ছে। অধ্যয়নরত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বয়স ৫ থেকে ১২ এর মধ্যে। কেউ বাক, কেউবা বুদ্ধি, আবার কেউবা শারীরিক প্রতিবন্ধী। শিক্ষার্থীরা সবাই সৈয়দপুর উপজেলার সোনাখুলী, ঢেলাপীর, বোতলাগাড়ী শ্বাষকান্দর, ইসলামবাগ, নতুন বাবুপাড়া, কামারপুকুর, কদমতলী, রাবেয়া কুন্দল, মুন্সিপাড়া, হানিফ মোড়, ধলাগাছ, নয়াটোলাসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
স্কুলের শিক্ষক রুমা বেগম জানান, প্রতিদিন সকাল ৯ থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এই শিশুদের পাঠদান করা হয়। মাঝে দেওয়া হয় খাবারের বিরতি। শিশুরা যাতে সহজে সবকিছু শিখতে ও লিখতে পারে এজন্য আমরা একটি কাগজে দোয়েল পাখির ছবি এবং তার বিপরীত পাশে সেই দোয়েলকে চিনতে থাকে ইশারার অঙ্গভঙ্গি। এতে শিশুরা সহজে সব কিছু চিনতে ও বলতে পারে।
আর লেখার জন্য সেই দোয়েল পাখির চিত্রের সঙ্গে দোয়েল লেখার কপি দেয় এতে শিশুরা যেমন দোয়েল পাখি চিনতে পারে ঠিক তেমনি ইশারায় দোয়েল পাখির উচ্চারণ করে এবং লিখতেও পারে। শিশুদের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকদেরও দেখানো হয় এই পদ্ধতি যাতে বাসায় গিয়ে তারা তাদের শিশুদের শিক্ষা দিতে পারেন।
তিনি আরো জানান, প্রশিক্ষণ পেয়ে স্কুলের শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে শুরু করেছে। তারা ইশারায় ভালো গান গাইতে পারে। বর্ষা ও নিশা দুই প্রতিবন্ধী ভালো নাচতেও পারে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশুদের পাঠদানের জন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো প্রজেক্টর ও কম্পিউটারও নেই। তাছাড়া স্কুলের শিক্ষার্থীদের বেঞ্চ, টেবিল, ক্রীড়া সামগ্রী, গান-বাজনার সরঞ্জাম, স্কুল ভ্যানসহ প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্রের সঙ্কট রয়েছে। তারপরও সঙ্কট ও সম্ভাবনা নিয়ে আমরা এই স্কুলটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ-সুবিধা পেলে আমরা এই স্কুলটিকে দেশের মডেল স্কুলে পরিণত করতে পারবো এবং প্রতিবন্ধী এই শিশুদের সমাজের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারবো।’
ইশারায় ইশারায় কথা হয় সেই শিশুদের সঙ্গে। স্কুলের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী দিপু চন্দ্র রায় জানায় পড়ালখা করে ডাক্তার হতে চায় সে। এভাবে কেউ ডাক্তার, কেউ শিক্ষক আবার কেউ বিমান চালক হতে চায় বলে ইশারায় ইশারা জানান দেয় তারা।
প্রতিবন্ধী এই স্কুলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকা শার্পের এনজিও কর্মকর্তা ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু বিকাশ কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশি ছাত্রছাত্রী রাখার ব্যবস্থা নেই। মূলত এটি সৈয়দপুর বধির কল্যাণ সংস্থার অফিস ঘর। যেটি মাসিক ভাড়া নিয়ে কোনোমতে আমরা এই শিশুদের জন্য শিক্ষাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। মাদুর বিছিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। এখন আন্তর্জাতিক সংস্থা সেন্টার ফর ডিজাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট ও ডিফ চাইল্ড ওয়ার্ল্ডওয়াই-এর সহযোগিতায় শ্রেণিকক্ষ ভাড়া, শিক্ষকের মাসিক সম্মানীসহ ক্লাস বর্ধনে যতটুকু কাজ করা যায় তা হচ্ছে।’
প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা ও সুবিধা প্রদানের বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. নাসিম আহমেদ বলেন, ‘শহরের এই প্রতিবন্ধী স্কুলটি সম্পর্কে জেনেছি। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই প্রতিবন্ধী এসব শিক্ষার্থীর কল্যাণে সৈয়দপুর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে যা করার দরকার আমরা করবো।’