লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মোটরসাইকেল চুরি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সংঘবদ্ধ চোরদের দৌরাত্ম্যে অসহায় হয়ে পড়েছেন মোটরসাইকেলের মালিকেরা। উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌর শহরসহ আশপাশের এলাকায় একাধিক চক্র এ কাজে জড়িত। মোটরসাইকেল মালিকরা বিভিন্ন যান্ত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেও চুরি ঠেকাতে পারছে না।
শুধু গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার হায়দরগঞ্জ ফাঁড়ি থানার প্রায় ৩০ ফুট পিছনে আজিজ মুন্সী ভবনের ব্র্যাক এনজিও অফিসের গ্যারেজের তালা ভাঙচুর করে ১১টি মোটরসাইকেলের মধ্যে ৫টি মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে সংঘবদ্ধ চোরের দল। এসময় অফিসে থাকা সিটি টিভির ফুটেজে দেখা যায়, সংঘবদ্ধ চোরেরা মাত্র ৪৭ মিনিটে এ ঘটনাটি ঘটায়। এতে প্রায় গড়ে প্রতি ৯ মিনিটে একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়।
এছাড়া গত এক মাসে জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও এনজিও কর্মকর্তাসহ অন্তত ২০টি মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে এ সিন্ডিকেট। এতে মোটরসাইকেলে মালিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আতঙ্কে অনেকেই এখন নিজ শোয়ার ঘরে মোটরসাইকেল রেখে এক সাথে ঘুমায়। এসব মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় থানায় পৃথকভাবে সাধারণ ডায়েরি ও মামলা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: অফিসে ঢুকে প্রকৌশলীকে পেটালো ছাত্রলীগের সভাপতি
স্থানীয় ও জেলা দু’টি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, রায়পুরে গত তিন মাসে শতাধিক মোটরসাইকেল চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া অর্ধশতাধিক চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। বিক্রি হওয়া এসব চোরাই মোটরসাইকেল অবাধে উপজেলা শহর ও আশপাশের উপজেলায় চলাচল করছে। একাধিক সংঘবদ্ধ চোর চক্র নকল চাবির সাহায্যে যেকোনো মোটরসাইকেলের তালা খুলে চুরি করে নিয়ে যায়।
সূত্র আরও জানায়, শহরের হল রোড় সড়কের বাঁধের উপর সড়কে, নতুন বাজার এলাকা, পৌর কার্যালয়ের সামনের সড়কের পাশে, বাস টার্মিনাল এলাকা, ফায়ার সার্ভিস অফিস সংলগ্ন এলাকা, বাসা বাড়ী বাজার এলাকা, লেংড়া বাজার এলাকা, বর্ডার বাজার এলাকা, মিতালী বাজার এলাকা, হায়দরগঞ্জ জনতা বাজার এলাকা, কেরোয়া জোড়পুল এলাকা, সোলাখালী ব্রিজ এলাকাসহ ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় সংঘবদ্ধ বেশ কয়েকটি চোর চক্র রয়েছে। এসব চক্রের সদস্যরা মোটরসাইকেল চুরি করে কখনো ধরা পড়লেও কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায়। চোরাই মোটরসাইকেল তারা দালাল চক্রের মাধ্যমে কম দামে লোকজনের কাছে বিক্রি করে দেয়। আর যথাযথ কাগজপত্র ছাড়াই গ্রামগঞ্জে, এমনকি শহরেও নির্বিষে এসব মোটরসাইকেল চলাচল করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দিনদুপুরে উপজেলার ব্যস্ততম বিভিন্ন এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ চোর চক্র সুকৌশলে তালা ভেঙে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে মোটরসাইকেল। অথচ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই করতে পারছে না। এমনটি চললে চোর চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়তে হবে সাধারণ মানুষকে। তাঁরা জানান, গত এক সপ্তাহে পৌর শহরের বেপারী বাড়ী থেকে রোমান ও তছলিমের দু’টি মোটরসাইকেল চুরি হয়। গত ৩১ জানুয়ারি শুক্রবার ভোর রাতে চর মোহনা ইউনিয়নের ইউনিয়ন সদস্য আনোয়ার হোসেন ঘরের দরজা ভেঙ্গে তাঁর ব্যবহারীতি মোটরসাইকেল নিয়ে যায়। ৩০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে খাসেরহাট বাজার থেকে আওলাদ হাওলাদার এক যুবলীগ নেতার একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়।
আরও পড়ুন: পরীক্ষা নিয়ে গুজব ছড়ালে কঠোর ব্যবস্থা: শিক্ষামন্ত্রী
গত ২৩ জানুয়ারি রাতে হায়দরগঞ্জ আজিজ মুন্সী ভবনের ব্র্যাক এনজিও অফিসের গ্যারেজ থেকে কর্মকর্তাদের ৫টি মোটরসাইকেল চুরি। এর আগে রাখালিয়ায় বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) দুই কর্মকর্তার দুটি ও বাবুরহাটে এক ব্যক্তির একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। তবে এনজিও পৃথক দু’টি ঘটনায় থানা মামলা হয়েছে এবং দু’টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
রায়পুর উপজেলার ট্রাফিক পরিদর্শক জিল্লুর রহমান জানান, পৌর শহর ও আশপাশের এলাকায় প্রতিদিন দুই সহস্রাধিক মোটরসাইকেল চলাচল করে। এর মধ্যে প্রায় ৩ থেকে ৪’শটির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। কাগজপত্রবিহীন এসব মোটরসাইকেলের বেশির ভাগই চোরাই। অবৈধ মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তদবিরের কারণে টেকা কঠিন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা নিলে মোটরসাইকেল চুরি অনেক কমে আসবে বলে তিনি দাবি করেন।
রায়পুর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মামুনুর রশিদ বলেন, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় মোটরসাইকেল চুরি ও চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় কমিটির কয়েকজন সদস্য উপজেলাবাসী উদ্বিগ্ন, উল্লেখ করে কমিটির সদস্যরা এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। একর পর এক চুরির ঘটনায় আমরাও উদ্বিগ্ন। মোটরসাইকেল চুরির এ সিন্ডিকেট থেকে জনপ্রতিনিধিরাও বাদ পড়ছে না।
রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তোতা মিয়া বলেন, মোটরসাইকেল চুরির ঘটনায় থানায় একাধিক মামলা ও সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে চুরি হওয়া মোটরসাইকেলও উদ্ধার করা হয়। সংঘবদ্ধ চোর চক্রদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইত্তেফাক/বিএএফ