দুই’শ বছরের পুরাতন মন্দিরে

l সুমন্ত গুপ্ত

 

নানা কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়ে মানুষের মন। আর তাই মানুষের মনের ক্লান্তি দূর করতে ভ্রমণের বিকল্প নেই। গত তিন সপ্তাহ হলো কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। অফিসে কাজের খুব চাপ। তবুও কোথাও ছুট দিতে মন চাইছিল বলে ঠিক করলাম উপমহাদেশের বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রী চৈতন্য দেবের পৈতৃক নিবাস সিলেটের ঢাকা দক্ষিণ এলাকায় ঘুরে আসব। অনেক নাম শুনেছি, কিন্তু কখন যাওয়া হয়নি। অষ্টাদশ শতকের মন্দির এটি, ঐতিহ্যগত দিক থেকে এই মন্দিরের গুরুত্ব অনেক।

কাঙ্ক্ষিত দিনে আমাদের কুটির থেকে বের হয়ে পড়লাম। ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এসে পৌঁছালাম মহাপ্রভুর পৈতৃক নিবাসে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে পদব্রজে যাত্রা শুরু করলাম। মন্দিরে প্রবেশের সময় হাতের ডান পাশে দেখা পেলাম প্রায় সংস্কারহীন ভগ্নপ্রায় প্রবেশদ্বার। সেখানে একজনের কাছে জানতে চাইলাম— এটাই কি মূল মন্দিরে প্রবেশের পথ। উনি বললেন, না—এটি চৈতন্য মহাপ্রভু দিদিমার বাড়ি। আরেকটু সামনে গেলেই মহাপ্রভুর বাড়ি। সবাই বলল, তাহলে আমরা প্রথমে মহাপ্রভুর মূল মন্দির থেকে ঘুরে আসি; পরে মহাপ্রভু দিদিমার বাড়ি দেখতে যাব।

আমরা নগ্ন পায়ে মন্দিরের দিকে প্রবেশ করলাম। বেশ কারুকার্যময় প্রবেশদ্বার দিয়ে মূল মন্দিরে প্রবেশ করলাম। ভক্তের পদচারণায় মুখর মন্দির প্রাঙ্গন। আগরবাতির গন্ধে মোহিত হয়ে আছে চারপাশ। পথিমধ্যে দেখা পেলাম সেখানকার সুমিতা দত্তের সাথে। সুমিতা দত্ত এগিয়ে এসে বললেন, শ্রী চৈতন্য দেবের দাদা শ্রী উপেন্দ্র মিশ্রের বাড়ি ছিল ঢাকা দক্ষিণের মিশ্রপাড়ায়, যেখানে তার পিতা শ্রী জগন্নাথ মিশ্র এবং মাতা শচীদেবী বিবাহ পরবর্তী সময়ে বসবাস করতেন। বিবাহের কিছুদিন পর শচীদেবী গর্ভবতী হলে তার দিদিমা স্বপ্নে দেখেন যে, এই সন্তান হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান! তাই শচীদেবীর সন্তান যেন অন্যত্র ভূমিষ্ঠ হয়। তাই তিনি শ্রী জগন্নাথ মিশ্র এবং শচীদেবীকে নবদ্বীপে পাঠিয়ে দেন এবং বলে দেন যেন তার নাতি তার সাথে দেখা করতে আসেন। ফলে শ্রী চৈতন্য দিদিমার কথা রক্ষার্থে ঢাকা দক্ষিণে এসেছিলেন। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু তার দিদিমার কথা রক্ষার জন্য ঢাকা দক্ষিণে আসেন এবং সেখানে দু’দিন অবস্থান করেন।

যদিও কেউ তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বলতে পারেন না যে তিনি ঠিক কবে এখানে এসেছিলেন; তবে ধারণা করা হয় যে, সেটি চৈত্র মাসের কোনো এক রবিবার ছিল। তাই প্রতি বছর চৈত্র মাসে তার আগমন উপলক্ষে এখানে উত্সবের আয়োজন করা হয়। মাসব্যাপী চলমান এই উত্সবে মেলা, সংকীর্তন, পূজা প্রভৃতির আয়োজন করা হয়। তাছাড়া মহাপ্রভুর ঢাকা দক্ষিণে আগমনের পর হতেই অর্থাত্ ১৫১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই এখানে শ্রীগৌর-সুন্দর ও শ্রীকৃষ্ণের অতি প্রাচীন এক বিরল বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়ে অর্চিত হয়ে আসছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে শ্রীবিগ্রহটি আসামের শিলচরে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭১-১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই মন্দিরে ঐ বিগ্রহের চিত্রপট অর্চিত হয়ে আসছিলেন। বর্তমান বিগ্রহটি ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়ে অর্চিত হয়ে আসছেন। বর্তমানে শ্রীগৌর-সুন্দর ও শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহ মন্দিরের পাশাপাশি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মন্দিরে উপেন্দ্র মিশ্র ও শোভাদেবী, জগন্নাথ মিশ্র ও শচীদেবীর বিগ্রহ ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ এবং পঞ্চতত্ত্ব বিগ্রহ ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আজ পর্যন্ত সাড়ম্বরে সকল বিগ্রহ অর্চিত হয়ে আসছে। সুমিতা মাসি পুরো মন্দির ঘুরেফিরে দেখালেন। এ এক অন্যরকম অনুভূতি। সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের এক মিলন মেলা যেন। আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম। সুমিতা মাসি বলল, এবার চলো তোমাদের শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর দিদিমার বাড়িতে নিয়ে যাই। চৈতন্য দেবের দিদিমার বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। চারপাশে ঘন জঞ্জল, সাথে পুরানো দিনের ভগ্নপ্রায় তোরণ।

আমরা সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে গেলাম। খুব সাবধানে পা বাড়ালাম। কারণ বেশ কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙ্গা। সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে দেখা পেলাম ভগ্নপ্রায় একটি বাড়ির। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, এখানেই শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর দিদিমা থাকতেন। এখন যত্নহীন অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা চারদিক ঘুরে দেখলাম আর ছবি তুললাম। তবে এই ভেবে খারাপ লাগল যে, অযত্ন আর অবহেলায় এক ঐতিহাসিক স্থানকে আমরা হারাতে বসেছি।

 

যেভাবে যাবেন

দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাস/ট্রেন/বিমানযোগে প্রথমে আসতে হবে সিলেটে। খরচ পড়বে ২৫০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা। এরপর সিলেট শহরের কদমতলি বাস টার্মিনাল থেকে যেতে হবে সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের মিশ্রপাড়া গ্রামে। এখানে ভাড়া নেবে ৫০ থেকে ১০০ টাকা।