কখনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি আমাকে

ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ভীষণ আগ্রহী ছিলেন ডা. লায়লা আর্জুমান্দ বানু। সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসে পড়তেন তিনি। স্কুল ছিল তার প্রথম পছন্দের জায়গা। সর্বদায় ভালো রেজাল্ট করতেন তিনি। শুধু পড়াশোনায় না, নিজের কাজকেও ভীষণ ভালোবাসেন তিনি। নিজের সবটুকু দিয়েই এক জন রোগীর সেবায় নিয়োজিত থাকেন তিনি। মায়ের গর্ভ থেকে সন্তানকে পৃথিবীর আলো ফুটানোর মধ্যে দিয়েই নিজের কাজের তৃপ্তি খুঁজে বেড়ান সর্বদা। সদায় চেষ্টা করেন এক জন ভালো ডাক্তার হওয়ার, পাশাপাশি এক জন ভালো মানুষ হওয়ার—এক জন সার্জারি ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তা পূরণ করতে পারেননি বানু। পরিবারের বড়ো মেয়ে হওয়াতে নানান প্রতিকূল অবস্থায় থামতে হলেও হার মানেননি তিনি। পড়াশোনায় ছিলেন দুরন্ত, স্বপ্নের পথে হার না মেনে এক জন ডাক্তার হয়ে মানুষের পাশে থাকার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পেরেছিলেন অধ্যাপক মেজর (অব) ডা. লায়লা আর্জুমান্দ বানু।

১৯৬০ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বরিশালে আসেন পরিবারের সঙ্গে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়ো আর তাই পরিবারের সব দায়িত্বও নিতে হয়েছে তাকে। কিশোরী বয়সের আর পাঁচটা মেয়ের মতো পড়াশোনার প্রতি অনীহা কখনই ছিল না তার বরং পড়াশোনা আর স্কুলই ছিল তার প্রথম পছন্দ। যখনই সুযোগ পেতেন বই নিয়ে বসে যেতেন বলে জানান তিনি। ভর্তি হয়ে যান বরিশাল গার্লস স্কুলে। স্বপ্নের যাত্রা যেন ওখান থেকেই শুরু। পরবর্তীতে, বিএম কলেজ এবং বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে ৬ মাস ইন্টার্নশিপ করেন ঢাকা মেডিক্যাল থেকে। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৭৭ সালে আর্মিতে জয়েন করেন। পরবর্তীতে পিজিতে ডিচিওপ ও ডিপ্লোমা এফসিপিএস পাশ করে জয়েন করেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। ১৯৮৯ সালে স্বইচ্ছায় তিনি চাকরি ছেড়ে পুনরায় ১৯৯৪ সালে বারডেম হাসপাতালে জয়েন করেন বলে জানান তিনি। পড়াশোনার পরেই কর্মজীবন, তার ফাঁকেই বিয়ে। কর্মব্যস্ততায় পরিবারকে সেভাবে সময় দিতে পারেননি তিনি, বিশেষ করে নিজের সন্তানকে। তা নিয়ে প্রায় অভিযোগ করেন তার পরিবার বলে জানান তিনি। 

বাংলাদেশে প্রথম জরায়ু ক্যান্সার অপারেশন তিনিই করান। বর্তমানে তিনি ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগের চিফ কনসালটেন্ট। নিজের পেশাকে ভীষণ উপভোগ করেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, একজন নারী হয়ে আমাকে কখনো বাধায় পড়তে হয়নি বরং আমার চাচা আমাকে ভীষণ উত্সাহ দিতেন আমার কাজে। আমি মনে করি, ইচ্ছা থাকলে সবকিছু হয় তবে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকা ভালো নয়। যে যেটাকে ভালোবাসে তাকে সেটায় করতে দেওয়া উচিত। আমরা ছোটোবেলায় অনেক খেলাধুলা করেছি, সবসময় একটা নিয়মের মধ্যে বড়ো হয়েছি। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা এ সব কিছুই পরিবার থেকে পেয়েছি। কাজেই পরিবারের শিক্ষাটা এক জন মানুষকে সফল করে অনেক সাহায্য করে। আর সব থেকে বড়ো কথা হচ্ছে এক জন ভালো মানুষ হতে হবে।  

তিনি আরো বলেন, নারী পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য আমি বুঝি না, আমি যখন আর্মিতে কাজ করেছি সেখানে আমাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য ছিল না। সবাই একসঙ্গে কাজ করেছি।

বাবার স্বপ্নকে সত্যি করতে বাবার দেওয়া জমিতে হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন তিনি। সেখানে বিনামূলে চিকিত্সাসেবা দিয়ে থাকেন। জীবনে যেটুকু শিখেছেন সবটুকু ভালোভাবে প্রয়োগ করাই যেন তার একমাত্র উদ্দেশ্য।

শুধু যে পড়াশোনা করেন তা কিন্তু নয়, বাড়িকে সবুজায়ন করাও তার একটি শখ। এছাড়া অবসরে বই পড়া, গান শোনা, বাগান করতে পছন্দ করেন বলে জানান তিনি। প্রিয় রং সবুজ, ভালোবাসেন গীটার বাজাতে ও বই পড়তে।