সচিব সাহেব

আমার বয়স তখন পনের।

জিজ্ঞেস করি শ্রাবন্তীর সাথে আমি অভিনয় করব, মানে পারব? শ্রাবন্তী সাড়ে পাঁচ ফুটের কম হবে না।

অফকোর্স পারবেন। অভিনয়ের চেয়ে সহজ কাজ পৃথিবীতে কিছু নেই। এই যে আমি আপনি আমরা তো সারাটা দিনই অভিনয় করি। অনেক সময় ঘুমটাও অভিনয়। তাছাড়া শ্রাবন্তী পাকা অভিনেত্রী, কলকাতায় অভিনয় করে একেবারে ফাটিয়ে ফেলেছে। পাকা মেয়েগুলো ভালো, কাঁচাগুলো ন্যাকামি করে। আমি ন্যাকামি একদম সহ্য করতে পারি না।

আপনি যে আমাকে এমন একটা ব্রেক দেবেন এর জন্য আপনাকে কি আমার কিছু দেতে হবে? মানে টাকা পয়সা কিংবা অন্য কিছু?

আরে টাকা পয়সা তো হাতের ময়লা। আমিই আপনাকে দেব, টাকার চেয়েও বেশি। আমার শ্বশুর বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটাকে শুধু একবার দেখেন। মাথা ঘুরে যাবে।

মানে?

নুরুনের একটা ছোট বোন আছে, শিরন নাম— এক্কেবারে অপু বিশ্বাসের মত, চৌদ্দতে পড়েছে।

অপু বিশ্বাস!

ছবি দেখেননি? দারুণ একজন নায়িকা। একবারে নাম্বার ওয়ান। শালিটাকে আমার ভাই আবদুল মান্নাফের জন্য ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু ভাইটা আমার সাথে বেইমানি করেছে। আমার স্ত্রীর সাথে ফাতরামি শুরু করেছিল।

ফাতরামি!

আরে চান্স পেলেই নুরুনের গায়ে হাত দেয়। আমি ফাতরামি একদম পছন্দ করি না। এজন্য মত বদল করেছি। চলেন  ছোটভাই একদিন আমার বাসায়, শিরনকে একবার দেখার পর আপনি আর একা বাড়িতে ফিরতে চাইবেন না। মন চাইবে শিরনকেও সাথে নিয়ে যাই।

আবদুর রাজ্জাকের কথায় আমি যথেষ্ট উত্সাহিত হই। আমি তাহলে দিলদার মুভিজের হয়ে শ্রাবন্তী, শুভশ্রী, পপি, অপু, মাহি, জয়া এবং এমন আরো অনেক নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করে যাবো। বামন আবদুর রজ্জাক ঠিকই বলেছেন, ডোয়ার্ফ হওয়াটা তাহলে ব্লেসিং ।

আমি এর মধ্যে একটি সিনেমা দেখলাম। দ্য টিন ড্রাম। অস্কার নামের এক বামন টিন পেটাচ্ছে আর তার চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখছে। ছবিটা এমন করে কাছে টানে যে অস্কারের চোখই হয়ে উঠে সবার চোখ। দারুণ ব্যাপার।

দিলদার মুভিজের নতুন আবিষ্কার বামন অভিনেতা, বামন নায়ক। কিন্তু আমার চাই ভিন্ন নায়িকা। সম্পূর্ণ নতুন নায়িকা। তার নাম হতে হবে শিরন। বামন আবদুর রাজ্জাক সাহেবের শ্যালিকা।

চাইনিজ রেস্তোরার দরজায় অভ্যর্থনা জানাবার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা বামনদের শরীর সুগঠিত এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সমানুপাতিক।

আমারও তাই ছিল। কিন্তু গত এক বছরে কোমরের নিচের অংশ ক্রমেই শুকোতে ও সংকুচিত হতে থাকে। আমি আর দু’পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। কেনো আমার এ অবস্থা হচ্ছে কারণ জানতে নিজেই একটার পর একটা ই-বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছি।

 আমার আব্বুর মতো একজন সচিব টাইপের মানুষের সন্তান না হলে এ অবস্থায় আমি বড্ড বিপদে পড়তাম।

একজন বিদেশি ডাক্তার (দেশের ব্যয়বহুল হাসপাতালগুলোতে বিদেশি দু’চারজন ডাক্তার তো থাকছেনই) বললেন, কোনোভাবেই দাঁড়ানো যাবে না, তাহলে শরীরের ভারে পায়ের হাড় ভেঙে যাবে।

আমাকে আঠারো ঘণ্টা বসে থাকতে হবে হুইল চেয়ারে, ছ’ঘণ্টা বিছানায়। বিছানায় চিত্ হওয়া যাবে, কাত্ কিংবা উপুড় নয়। হুইল চেয়ারে থাকার সময় বুক বরাবর ভারী বেল্টের বেষ্টনি থাকবে যেন সামনে ঝুঁকে হুমড়ি খেয়ে ফ্লোরে পড়ে না যাই।

আমার জন্য বিদেশি হইল চেয়ার আনা হয়েছে। চেয়ারে স্টিয়ারিং আছে, হ্যান্ডব্রেক আছে। বামপাশের হাতলের কালো বাটনে উপরের দিকে চাপ দিলে চেয়ারের ব্যাকরেস্ট ৯০ ডিগ্রি থেকে ১৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত চলে আসে। ওদিকে সমানুপাতিক হারে পা উপরের দিকে উঠতে থাকে। তখন গা এলিয়ে বেশ একটা ঘুম দেওয়া যায়।

 

       

  ম্যাট্রিক পাশ করেননি বলে রবীন্দ্রনাথকে অশিক্ষিত মনে করাটা ভুল

আব্বু বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারও এতো আরামদায়ক নয়। তা ছাড়া একজন প্রধানমন্ত্রী না প্রেসিডেন্ট কার যেনো পাইলস ছিল, আরাম চেয়ারেও বসতে পারতেন না। তার লাগতো ডোনাট পিলো। ডোনাটের মতো বালিশ, মাঝখানটাতে ফাঁকা।

সময়মতো শরীরের গিটঠু আলগা হয়ে যাবে, আমি দেখতে দেখতে পাঁচ ফুট ছ’ইঞ্চি ছাড়িয়ে যাব এটাই ছিল প্রত্যাশা। আমার আব্বু কিংবা আম্মুর দিকের চেনাজানা কোনো পুরুষ আত্মীয়ই সাড়ে পাঁচ ফুটের কম নয়। আমার চাচারা এত লম্বা যে তাদের শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাদের লক্ষ করে বলেন- লম্বা যতো আহাম্মক ততো।

বয়স যখন নয় কি দশ বছর তখন থেকেই আমাকে বন্ধুদের সম্বোধন এই লিলিপুট। আব্বে লিলিপুট।

আমি গালিভারের সফরনামা পড়েছি। লিলিপুটের দেশে ডাক্তার লেমুয়েল গালিভার। আমি আরো একটি লেখা পড়েছি সেখানে গালিভারের সফরনামার কিছু দুর্বল দিক তুলে ধরা হয়েছে। যেমন  লেখক একথাটা বলতে লেখা ভুলে গেছেন যে একজন লিলিপুটিয়ান একজন স্ট্যান্ডার্ড  ইংরেজের ১/১২ ভাগ, তার শক্তি ইংরেজের ১/১৪৪ ভাগ এবং তার ওজন ১/১৭২৮ ভাগ। স্ট্যান্ডার্ড  বাংলা প্রমিতমান, সেটা আমার কাছে আরো কঠিন শব্দ মনে হয়।  ললিপুটদের বাড়িতে কোনো সিঁড়ি থাকে না কারণ এক লাফে একতলা থেকে দু’তলা, দু’তলা থেকে তিনতলা লাফিয়ে লাফিয়ে উঠতে পারে, নামতেও পারে।

এদিক দিয়ে আমার অবস্থান ভালো না মন্দ বুঝতে পারছি না। আমি তিন ফুট সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি, ছয় ফুট দশ ইঞ্চি কোনো বাঙালির দেখা পাবার সম্ভাবনা নেই। লাফিয়ে একতলা থেকে দুতলা বাদ যাক, আমি সিঁড়ির দু’টো ধাপই পেরোতে পারব না।

গালিভারের সফরনামায় একটা মজার দৃশ্য আছে। লিলিপুটিয়ানদের রাজপ্রাসাদে যখন আগুন লাগল গালিভারকে আগুন নেভানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো। গালিভার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন এবং ট্রাউজারের বোতাম খুলে যখন রাজপ্রাসাদের উপর বর্ষণ করতে শুরু করলেন তার একান্ত ব্যক্তিগত হোসপাইপটির আকার এবং পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা দেখে রাজপরিবারের নারীদের চক্ষু কপালে উঠল।

সবাই বলর, ওহ্ মাই গড!

আমি কিছুদিন স্কুলে গিয়েছি। কিন্তু যখন গায়ের উপর শরীরের ভারটাকে বেশি মনে হতে শুরু করল, ডাক্তার বললেন, ফ্র্যাকচার এড়াতে হবে। হাঁটা যাবে না। তখন থেকেই আমার জন্য চাকাওয়ালা চেয়ার।

আমার এসএসসি পাশ করা হয়নি, রবীন্দ্রনাথেরও অধরা রয়ে যায় ম্যাট্রিকুলেশন।

ম্যাট্রিক পাশ করেননি বলে রবীন্দ্রনাথকে অশিক্ষিত মনে করাটা যেমন ভুল, আমার বেলাতেও আমি শিক্ষিত নই মনে করাটা বোকামি।

আমি কার্টুন দেখতে দেখতে ইংরেজি শিখেছি, অ্যানিমেল প্লানেট দেখে জেনেছি কেমন করে গণ্ডারের বাচ্চা হয়, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে দেখেছি আফ্রিকায় কেমন করে মেয়েদেরও খত্না করানো হয়। আমি হিন্দি চ্যানেল দেখি না, অন্ততঃ তিনটি চ্যানেলে ইংরেজি সিনেমা দেখি।

স্নুকার, গলফ— এসব খেলাও বুঝি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা মুখ দেখাদেখি না করলেও ক্যান্টনমেন্টে দাওয়াত পেলে কেনো যায় আমি সেটাও জানি। আমার রুমের দেয়ালে একটি ফ্ল্যাটস্ক্রিন এলইডি টিভি আছে, আইবিএম কম্পিউটার আছে। আমার বিছানা বরাবর টেবিলে কাজুবাদাম, চানাচুর, পটেটো চিপস আছে, ইচ্ছে হলে খাই।সচিব সাহেব

আন্দালিব রাশদী

প্রচ্ছদ :আল নোমান

প্রকাশক : নাগরী

দাম :২১০ টাকা