দায়ভাগ

আদমসুরতের জন্ম নিবন্ধন যাতে করা হয় আদালতে সে আবেদন করা হলে আদালত ভবানিপুরের চেয়ারম্যানকে কেন আদম সুরতের জন্ম সনদ দিতে আদেশ দেয়া হবে না এ মর্মে কারণ দর্শাতে আদেশ দিয়েছেন। এই আদেশের উপর ধার্য তারিখে আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

কারণ দর্শানোর জবাবে ইব্রাহিম উকিল তার বক্তব্য উপস্থাপন করছেন, ‘মাননীয় আদালত, সমাজ বা ধর্ম কোনো অবৈধ সম্পর্ক যেমন মেনে নেয় না। তাই একটা বেজন্মা শিশুর জন্ম সমাজ দেয়াকে মেনে নেয় না। অবৈধ কাজের ফলাফলও অবৈধ। অবৈধ সম্পর্কের দ্বারা জন্ম নেয়া জারজ সন্তানকেও বৈধতা দেয়া যায় না। তাই এই শিশুর জন্ম সনদ দিলে সেটা সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে।’

রসিদ উকিল উপস্থাপন করলেন, ‘মাননীয় আদালত, একটা শিশু কীভাবে জন্ম হয় আমরা সবাই জানি। আমরা জানলেও জন্মের আগে কেউ জানতে পারে না কার ঔরসে কোন মায়ের গর্ভজাত হয়ে সে পৃথিবীতে আসবে। তাই একটা শিশুর জন্মের জন্য সে কোনোভাবে দায়ী নয়। বিবাহ একটা ধর্মীয় এবং সাম্প্রতিককালে আইনস্বীকৃত সম্পর্ক। এ সম্পর্কের মাধ্যমে নরনারী একসঙ্গে সংসার করে সন্তানাদি জন্ম দেয়, লালনপালন করে। মাননীয় আদালত জানেন, বৈবাহিক সম্পর্কের সূচনা খুব বেশি দিন আগে নয়। আদিম সমাজে বিবাহের প্রচলন ছিল না। তখনো সন্তানাদি জন্ম নিত। সন্তান না জন্মালে পৃথিবীতে মানবগোষ্ঠীর অস্তিত্ব থাকত না। সমাজ তার প্রয়োজনে নানারকম প্রথা আইন বিধি তৈরি করেছে। সে সবই বড়দের জন্য। শিশুর জন্য নয়। বরং শিশুর সুরক্ষার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্র আইন আর বিধি প্রণয়ন করেছে। আবার ধর্মের বিধান পর্যালোচনা করলেও সাক্ষ্য মেলে যে, সকল ধর্মই শিশুর জীবন সুরক্ষার পক্ষে, সে শিশুর জন্ম যেভাবেই আর যে কারণেই হোক। জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো এ নীতি সমাজ ও রাষ্ট্র সবকালেই সমর্থন করেছে। মাননীয় আদালত, ‘ব্যভিচার শিশু করে না। করে এই তথাকথিত সভ্য সমাজের নাগরিকই। আমরা তার বিচার করতে পারি, কিন্তু তার অপরাধে একটা নিরপরাধ শিশুকে শাস্তি দিতে পারি না। তাই আদম সুরতের জীবন চলার পথ সুগম করার জন্য ওর জন্মসনদ পাওয়ার অধিকার আছে। আদমসুরতকে একজন শিক্ষক মানুষ করবার দায়িত্ব নিয়েছেন। সে নিশ্চয় মানুষ হবে, রাষ্ট্রের সুনাগরিক হবে। শিশুর মা বাবার পাপের জন্য কোনো ধর্মই শিশুকে দায়ী করে না। শিশুর বাঁচার অধিকার সকল ধর্মেই স্বীকৃত। বিষয়টি শিশুর মানবাধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই আমাদের দেশে সম্প্রতি প্রণীত জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনেও পিতৃপরিচয়হীন শিশুর জন্ম নিবন্ধনের বিধান রাখা হয়েছে। আদম সুরত নামের যে শিশুর জন্ম নিবন্ধন ও জন্ম সনদের জন্য আবেদন করা হয়েছে তাই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কতৃক অগ্রাহ্য করা আইনসঙ্গত হয়নি। সে জন্ম নিবন্ধন ও জন্ম সনদ পাওয়ার হকদার। আমি সেই আদেশ চাইছি।’

‘মাননীয় আদালত, আমার প্রতিপক্ষের কথা মেনে নিলে তো আদিম সমাজে ফিরে যেতে হবে। সভ্য সমাজে আর আমাদের স্থান হবে না। এ সমাজ সভ্য, এখানে অসভ্যতার কোনো স্থান নেই। সমাজ যেখানে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, পিতৃপরিচয় নিশ্চিত করার জন্য বিবাহপ্রথা প্রচলন করেছে, ধর্ম যেখানে বিবাহবহির্ভুত সম্পর্ক নিষিদ্ধ করেছে আর রাষ্ট্র যেখানে সমাজ থেকে অসভ্যতা দূর করার জন্য আইন প্রণয়ন করেছে, সেখানে বিজ্ঞ উকিল তার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে অসভ্যতার পক্ষে কথা বলছেন। অবৈধ কোনো শিশুর জন্ম সনদ দিলে তাতে সমাজে অনাচার বাড়বে, ব্যভিচার বৃদ্ধি পাবে।’

বিজ্ঞ আদালত উভয় পক্ষের উপস্থাপন শুনে আদেশ দিলেন। অনতিবিলম্বে পিতার নামের জায়গায় ‘অজ্ঞাত’ লিখে আদমসুরতের জন্ম নিবন্ধন ও জন্ম সনদ ইস্যু করা করবার জন্য ভবানিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে আদেশ দিলেন।

দায়ভাগ

নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর

প্রচ্ছদ  :মোস্তাফিজ কারিগর

প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রকাশক :অন্য প্রকাশ