আমার জীবন আমার সংগীত

পাঠশালা গ্রামের এঁটেল মাটি

পর্ব ৫

 

শৈশবকালের কথা আমার এখনো উজ্জ্বলভাবে মনে পড়ে। যখন থেকে অ আ ক খ পড়তে শিখেছি, ১ ২ ৩ ৪ গুনতে শিখেছি, নামতা শিখেছি, গান গাইতে শিখেছি, নাচতে শিখেছি। তখন আমাদের স্কুলের শিক্ষক মুরারী মোহন গোস্বামী আমাকে বাসাতেও পড়াতেন, আবার তাঁর বাসাতেও কখনো কখনো গিয়ে পড়তাম। এখনো চোখ বন্ধ করলে তাঁর চেহারা আমার চোখের সামনে ভাসে। বেঁটেখাটো শীর্ণ ফরসা চেহারা, খালি গায়ে ঝুলত একটি পৈতে। মাথার পিছন দিকে বিশাল এক টিকি, পরনে ছোটো একটি ধুতি। কখনো কখনো গায়ে একটি গামছা। এই তাঁর বেশভূষা। তিনি নীতিবান কড়া শিক্ষক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। ছাত্রছাত্রীরা কোনো অন্যায় করলে তিনি রেগে যেতেন। হাত পাততে বলতেন, বাঁশের কঞ্চির ছড়ি দিয়ে সে হাতে পিটনি দিতেন।

শিক্ষার্থীরা ভীতসস্ত্রস্ত থাকত। আমি অত্যন্ত সুবোধ বালক হয়ে তাঁর আদেশ-নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে সচেষ্ট থাকতাম। স্কুলে কিংবা বাসার লেখাপড়ার যাতে ব্যত্যয় না ঘটে সে বিষয়ে আমার বাবা সাবধান করে দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী আমি চলতাম। সে সময়ে শিশুদের কাছে আর একজন ভীতিকর ব্যক্তি ছিলেন। সাইকেলে চড়ে খাকি রঙের প্যান্ট-শার্ট পরে বছরে এক-দুইবার স্কুলে আসতেন, শিক্ষার্থীরা তাঁকে দেখতে পেলে বা তাঁর আসার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে যেদিকে পারত ছুটে পালানোর চেষ্টা করত। একবার এই ভীতিকর ব্যক্তি আসছেন জানতে পেরে আমরা কয়েকজন শিশু শিক্ষার্থী মাটির স্কুলঘরের একটি কক্ষে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম। দরজা দিয়ে রেরিয়ে পালানোর কোনো উপায় ছিল না। শিশুরা সবাই মিলে জানালা ভেঙে দৌড়ে অন্য একটি দোকানে ঢুকে লুকাতে চেষ্টা করেছিলাম। শিক্ষকরা খবর পেয়ে আমাদের ধরিয়ে আনেন এবং যথারীতি শিক্ষক মুরারী মোহন গোস্বামীর কঞ্চির ছড়িতে পিটনি খেয়েছিলাম। পরে আমাদের ধরে নিয়ে সেই ভয়ার্ত ব্যক্তির কাছে এনে কলেরার ইনজেকশন এবং বসন্তের টিকা দেওয়া হয়েছিল।

ছড়ির আঘাত এবং টিকা-ইনজেকশনের জন্য আমার শিশু-মন যেমন আহত হয়েছিল, তেমন ক্রুদ্ধও হয়েছিলাম। আমি একমাত্র মুলসমান ছাত্র; তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু বন্ধুদের পরামর্শ অনুযায়ী একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আর তাদের সবার পক্ষ থেকে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। পরিকল্পনা মোতাবেক বাড়িতে মায়ের কাছে এসে একটি কাচি সংগ্রহ করি। উদ্দেশ্য ছিল—আমাকে বাসায় পড়াতে পড়াতে নিষ্ঠুর শিক্ষক মুরারি মোহন গোস্বামী যখন একটু তন্দ্রাকাতর হবেন, তখন সেই সুযোগে আমি তাঁর টিকিটা ক্যাচ করে কেটে নেব।

এই পাষণ্ড শিক্ষকের প্রতি যথাযথ প্রতিশোধ স্পৃহা ও তা বাস্তবায়নের কথা চিন্তা করতে করতে খাওয়াদাওয়া ছেড়ে টিকা-ইনজেকশনের ব্যথায় জ্বরের ঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তারপর যখন ঘুম ভাঙল তখন আমার উঠে বসার ক্ষমতা ছিল না। প্রচণ্ড জ্বরে বেশ কয়েক দিন আধো ঘুমে আধো জাগরণে আমাকে বিছানায় কাটাতে হয়েছে। ইতিমধ্যে এই অসুস্থতার মাঝে মুরারী বাবুর টিকি কাটার পরিকল্পনার কথাটি বলে ফেলেছিলাম। মা সবকিছু জেনে আমাকে সান্ত্বনা দিলেন, আদর করলেন এবং বোঝাতে চেষ্টা করলেন। বসন্তের টিকা ও কলেরার ইনজেকশন আমার ভালোর জন্যই দেওয়া হয়েছে। আমার অসুস্থতার কথা শুনে মুরারী মোহন বাবু আমাকে দেখে গেছেন এবং তিনি কাঁচা কলা ও ছোটো মাগুর মাছ যা তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন, আমাকে ঝোল খাওয়ানোর জন্য দিয়ে গেছেন বলে মা জানালেন। অসুস্থ অবস্থায় আরো অনেকে দেখতেও এলেন আমাকে। তাদের কাছে শুনলাম কোনো ছেলে টিকা না নেওয়ার জন্য গুটি বসন্তের কারণে চোখ অন্ধ হয়ে গেছে, কলেরায় কেউ কেউ মারা গেছে। এসব জানার পরে আমার রাগ ধীরে ধীরে হালকা হতে থাকল। পরবর্তী সময়ে আমার অতি প্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠলেন পিতৃতুল্য মুরারী মোহন গোস্বামী।

সেই সময় ছড়া লেখা, গান শেখা, কবিতা লেখা শুরু হয়েছিল একটি অসাধারণ বিশেষ ঘটনা থেকে। মুরারী মোহন গোস্বামী বাবুর বাসায় যখন আমি পড়তে যেতাম, বাসার সামনে দাওয়ায় বসে থাকতেন মুরারী বাবুর বাবা; দেখতে মোটা লম্বা চওড়া শরীর, মাথায় বড়ো টিকি, খালি গায়ে পৈতে। তাঁর মুখোমুখি হলে উনি নাম জিজ্ঞেস করতেন। নামের বানানের প্রতিটি অক্ষর দিয়ে মিলিয়ে মিলিয়ে ছড়া বানাতে বলতেন। শিশুরা না পারলে উনি সঙ্গে সঙ্গে ছড়া বানিয়ে দিতেন। প্রথম প্রথম একটু অস্বস্তিতে পড়লেও বিষয়টি আমার কাছে আকর্ষণীয় এবং মজার বলে মতে হতো। আমার নাম বড়ো হওয়ার জন্য ও ছড়া লেখা সহজ করার উদ্দেশ্যে আমার দুই অক্ষরের ডাকনাম ‘রাজা’ বলতেন। তাতে দু’লাইনেই ছড়া শেষ হয়ে যেত। পরবর্তী সময়ে অভ্যস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বড়ো নাম দিয়ে ছড়া লেখা শুরু হয়ে গেল। এভাবেই ছড়া, কবিতা এবং গান লেখার কলাকৌশল আমার শৈশবকালেই তিনি আমাকে রপ্ত করিয়ে দিয়েছিলেন। তখনকার এই পরিবেশের সঙ্গে এখানকার শিক্ষার পরিবেশের অনেক পার্থক্য এসে গেছে। অনেক সাজ পোশাক জাঁকজমক আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে আজ শিক্ষা লুকিয়েছে! আমার প্রাণ আমার শৈশবের পরিবেশের জন্য আকুল হয়ে ওঠে। আমি পাঠশালায় পড়েছি, শক্তি পণ্ডিতের ব্যক্তিগত পাঠশালা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে যা পরিচালিত ছিল, সে রকমই একটি পাঠশালা যা চালাতেন শক্তি ভট্টাচার্য বাবু, একটি মাটির ঘরে রাস্তার পাশে উঁচু বারান্দায় ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে। শক্তি বাবুর বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর, স্বাস্থ্যবান, খালি গায়ে কাঁধে পৈতে ঝুলছে, ধুতি পরিহিত, হাতে যথারীতি ছড়ি।

আমাদের গ্রাম থেকে মাইল দুয়েক দূরে ছিল এই পাঠশালা। পাঠশালা যে গ্রামে, সে গ্রামের মাটি ছিল এঁটেল মাটি। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে গ্রামের রাস্তাঘাট কাদায় আঠার মতো চেটচেটে হয়ে থাকত। রাস্তায় পা পড়লেই আঠার মতো কাদায় পা আটকে যেত। তাতে চলাচলে খুব বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হতো। এছাড়াও আমাদের গ্রাম থেকে ঐ পাঠশালায় যেতে দু মাইল হেঁটে যাওয়ার পথে একটি ক্যানেল পড়ত। যা ছোটো নদীর মতো, পানিতে ভরা থাকত। আমাদের সেই ক্যানেল পার হতে গেলে জামা-কাপড় ভিজে একাকার হতো। আবার মাইলখানেক দূরের ব্রিজ দিয়ে পেরুতে হলে যাওয়া-আসায় আরো দুই মাইল হাঁটতে হতো। তাই এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখতাম কাছাকাছি মানুষজন আছে কি না এবং সুযোগমতো জামা-প্যান্ট খুলে মাথায় নিয়ে অতিদ্রুত নদী পেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হতো। একদিন এমন করে নদী পেরিয়ে যাওয়ার পর আমার এক ক্লাশ উপরের এক ছাত্র ধানখেত থেকে বের হয়ে এসে মজা করে বলল, তোমার সব দেখে ফেলেছি। তখন আমি ভীষণ লজ্জা পেয়ে মুখ নামালাম, তার পরপরই হেসে বললাম, তোমাকে এভাবেই নদী পেরুতে দেখেই আমি এভাবে নদী পেরুতে শিখেছি। সে লজ্জিত হলো। পাঠশালায় যাওয়ার পথে বর্ষার সময় রাস্তাঘাটে বিষধর সাপের উপদ্রব ছিল। এখনো দুঃখজনক একটি ঘটনা মনকে ভারাক্রান্ত করে, আমার সহপাঠী এক ছাত্রকে সাপের দংশনে প্রাণ দিতে হয়েছিল। সেই সুদর্শন ছেলেটি ছিল আমাদের পাশের গ্রামের এক অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান। আমার সঙ্গে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ ছিল।

সেই সময়ে মাঠের জমিজমা সংক্রান্ত একটি বিষয় খুব মনে পড়ে। বেশকিছু জমিতে কোনো চাষবাস করা হতো না। সে বিশাল জমিকে বলা হতো ‘পড়া’। পুকুরের বড়ো বড়ো পাড় কিংবা চাষের জমির পাশেই এরকম বিশাল আয়তনের জমি ঘাসে ভরা থাকত। এখানে গরু, মহিষ, ছাগল ঘুরে ঘুরে ঘাস খেত। এক কথায় যা ছিল গবাদিপশুর চারণভূমি। সারা দিন রাখালের তত্ত্বাবধানে গবাদিপশুগুলোকে এই পড়া জমিতে ছেড়ে রাখা হতো। গরু মহিষ ঘুরত ফিরত, ঘাস খেত এবং পুকুর থেকে তৃষ্ণার জল পান করত।

আমি প্রায়ই আমার মা-বাবা-গুরুজনদের জিজ্ঞেস করতাম, এ জমিতে ধান চাষ কেন করা হয় না? আমার মা আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন, ও কথা খবরদার মুখে এনো না, যদি ঐ পড়া ভেঙে ঐ জমি অন্য চাষে ব্যবহার করা হয় তাহলে গরু-মহিষ-ছাগলের অভিশাপে সে মরে যাবে। এই কথায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমাজের সব ধরনের মানুষের জন্য যেমন মানুষের উত্কণ্ঠা দয়া-মায়া ছিল, গবাদিপশুর আহার এবং স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও ছিল তা। কেউ মনে করতে পারেন এটা কুসংস্কার, তবে যে কুসংস্কারে জীব জগতের মঙ্গল হয় তা আমার মতে সুসংস্কার। আজ গবাদিপশুর চারণ ভূমি ‘পড়া’ মানুষ গ্রাস করেছে, এমনকি শিশু-তরুণদের খেলার মাঠগুলো ব্যক্তিগত লোভ-লালসায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

জ্ঞান হওয়া থেকেই দেখেছি আমাদের বৈঠকখানায় সন্ধ্যাবেলায় গ্রামের লোকজন এসে বসতেন আর আমার বৃদ্ধ নানা জিউ-জান শেখ পুঁথিপাঠ করে শোনাতেন। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বাণী, নীতিশিক্ষা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ নিয়ে আলোচনা করতেন। ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মের সকল ভালোত্ব নিয়ে তিনি অনর্গল যুক্তিগ্রাহ্য ও আকর্ষণীয় ভাবে বলে যেতেন। ন্যায়নীতি, কর্ম এবং দায়িত্বের প্রতি মানুষকে সজাগ করার চেষ্টায় সদা ব্যস্ত এমন ব্যক্তি আর কাউকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তিনি মাঝে মাঝেই ৩০/৪০ মাইল দূরবর্তী তাঁর গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামে আসতেন এবং এসব নিয়ে মানুষকে একাত্ম করে রাখতেন। তিনি যখন চলে যেতেন, আমার আব্বা পুঁথি পাঠ করতেন এবং একইভাবে আলোচনা করতেন। কোনো সময়ই আলোচনা শুধু ইসলাম ধর্মে সীমাবদ্ধ থাকত না। সকল ধর্মের ভালোত্ব নিয়ে বলতেন। এই বৈঠকের নিয়মিত শ্রোতা হিসেবে আমি দায়বদ্ধতা, কর্মস্পৃহা এবং নীতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠি।

সাধারণত ছাত্রজীবন বলতে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পর্কিত বিষয়কেই বোঝায়। কিন্তু আমার দেখা গ্রামগঞ্জের এই লোকাচার, পুঁথিপাঠ, ধর্ম আলোচনা প্রভৃতি জ্ঞানবিদ্যা প্রচারে সাধারণ জনগণকে যেভাবে প্রভাবিত করত, তা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পূরণ হওয়ার নয়। তাই এই শিক্ষা আমার ধ্যানে-জ্ঞানে আজো জেগে আছে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়ায় মনোযোগী হলেও দুরন্তপনা ত্যাগ করিনি। সঙ্গী-সাথি দের নিয়ে ফুটবল খেলা, বাঁশ মাটিতে পুঁতে কিংবা গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে সার্কাস খেলা, মাছ ধরা, লাঙ্গল চালানো, মাটি কাটা, ঘোড়ায় চড়া সকল বিষয়েই প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। শৈশবে এই সমস্ত ঘটনা থেকেই আমি শিক্ষা নিতে বেশি অভ্যস্ত হয়েছিলাম। লেখাপড়ার অগ্রগতি হতে থাকল। আমি অতি শৈশব থেকেই মুখে মুখে জটিল বড়ো অঙ্ক করতে পারতাম। তাতে শিক্ষকরা আমার অনেক প্রশংসা করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার পাশাপাশি নানান বিষয়ের ওপর পড়াশোনার আগ্রহ ছিল। আমার চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সের মধ্যেই বঙ্কিমচন্দ্র, মধুসূদন, শরত্চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল রচনার প্রায় সবকিছুই পড়ে ফেলেছিলাম। তাঁদের রচনা আমি বারবার পড়তাম, এখনো পড়ছি। সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক, সংগীত, সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন বিষয়ে লেখা প্রবন্ধের প্রতি বরাবরই আমার বিশেষ আগ্রহ। ক্লাশ থ্রি-ফোর থেকেই বাংলা সাহিত্য এমনকি বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বেশকিছু বই আমার পড়া হয়ে যায়। আমি যে মেসে থাকতাম সেখানে আমার সঙ্গে থাকতেন জয়নাল আবেদিন নামে এক ছাত্র, যিনি ভাষা সাহিত্যের ওপর সে সময় এমএ পড়ছিলেন। তার বইগুলি মাঝে মাঝে উলটেপালটে দেখতে দেখতেই আমার পড়ার আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে।

মফিজ নামে আরেক বন্ধুর বড়ো ভাইয়ের বর্ধমানের উদয় চাঁদ গ্রন্থগারের সদস্য কার্ড নিয়ে প্রায়ই আমি বই সংগ্রহ করতাম। তখন বইপড়া আমার একটি নেশার মতো পেয়ে বসেছিল। রাম কানাই দা নামে আমাকে যিনি প্রাইভেট পড়াতেন, তাঁর আগ্রহে উত্সাহে আমি নানান বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করি। বিশেষ করে গান লেখা, কবিতা লেখা, গান সুর করা প্রভৃতি বিষয়ে তিনি আমার অতি প্রশংসা করতেন। মুখে মুখে ছড়া কাটতাম, কবিয়ালদের অনুষ্ঠান আগ্রহ ভরে শুনতাম এবং দেখতাম, তার প্রভাবে নানান বিষয় নিয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়ে মুখে মুখে গান বানানোর প্রবণতাও আমার মধ্যে তৈরি হয়। এর সবকিছুই আমার শিক্ষাজীবন, মনোজগত্ এবং নৈতিকতাবোধ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে।

একই সময় থেকে নিয়মমাফিক পদ্ধতিগতভাবে সংগীত শিক্ষার সুযোগ আমার জীবনে আসে। সংগীত সংসদের আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ রাগরাগিণীর শুদ্ধতা, আঙ্গিকের বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে আমাদের শেখাতেন এবং তা রপ্ত করাসহ যথাযথ উপস্থাপন উপযোগী, আয়ত্ত করার লক্ষ্যে প্রতি মুহূর্তেই লেগে থাকতেন। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় তবলা-পাখোয়াজ সহযোগে সংগীত অভ্যাস করাতেন।

রাগরাগিণীর আলাপ, বিস্তার, বন্দেশ, তান, সারগামের সাধনা চলত তাল-ছন্দের সঙ্গে। ধ্রুপদ, ধামার, বিলম্বিত খেয়াল, দ্রুত খেয়াল, তারানা, চতুরঙ্গ, ত্রিবট প্রভৃতি গানের চর্চা চলত। সংগীত ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকত না। তবে সংগীত সাধনার সঙ্গে সঙ্গে গরম তেলে ভাজা আলুর চপ, বেগুনিসহ মুড়ি কিংবা গরম পুরি-জিলাপি সহযোগে নাস্তা করার ব্যবস্থা হতো। আমি তবলা, পাখোয়াজ বাদনের অভ্যাস করতাম। আমি অতি দ্রুত সবকিছু আয়ত্ত করতে পারতাম। সে কারণে শিক্ষকদের প্রশংসা এবং বিভিন্ন বিষয়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব আমি পেতাম। যেমন আমি যখন দ্বিতীয় বছরের শিক্ষার্থী, তখন কোনো শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে আমি তৃতীয় ও চতুর্থ বছরের শিক্ষার্থীদের ক্লাশ নিতাম। আমি যখন তৃতীয় বছরের ছাত্র তখন পঞ্চম বছরের এবং বিশেষ শিক্ষাক্রমের ছাত্রদের  শেখাতাম অর্থাত্ শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে তাদের ক্লাশ নিতাম আমি।