ফেব্রুয়ারি মানেই ভাষার মাস। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মাস। এ মাসের ২১ তারিখেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার ও শফিউর শহিদ হন। এ মাসেই বাঙালিরা মেতে ওঠে অক্ষরের উত্সবে। মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বসে বইয়ের হাট। নতুন বইয়ের গন্ধে মন মাতাতে চাইলে অবশ্যই আসতে হবে এই অপরূপ বইয়ের মেলায়।
অমর একুশে গ্রন্থমেলার শুরুর গল্পটি খুবই মজার। তখনো দেশ স্বাধীন হয়নি। ওই সময় বাংলা একাডেমির পরিচালক ছিলেন সরদার জয়েনউদদীন। ‘বইমেলা’ বা ‘বুক ফেয়ার’ শব্দটির সঙ্গে তখনো এদেশের মানুষের পরিচয় হয়নি। একদিন সরদার জয়েনউদদীন ভাবলেন, কত কিছুরই তো মেলা হয়, বইয়ের মেলা করলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। তিনি একটি শিশু গ্রন্থমেলার আয়োজন করলেন তখনকার কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির নিচতলায়। এখন যেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরেরি, তখন সেটিই ছিল কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি। এটা ১৯৬৫ সালের কথা।
পাঁচ বছর পর অর্থাত্ ১৯৭০ সালে নারায়নগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় আরো বড়ো পরিসরে বইমেলার আয়োজন করেন সরদার জয়েনউদদীন। সেখানে তিনি একটা মজার কাণ্ড করেন। মেলার এক কোণে একটি গরু বেঁধে তার গলায় ‘আমি বই পড়ি না’ লেখা প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে দেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, গরু-গর্দভরা বই পড়ে না। এতে করে মেলায় আসা লোকজন বইয়ের প্রতি আরো বেশি উত্সাহ বোধ করে।
১৯৭২ সালে ইউনেস্কো ওই বছরকে ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ ঘোষণা করে। এই সুযোগে সরদার জয়েনউদদীন ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন করেন। আজকের বাংলা একাডেমি বইমেলার শুরু এখান থেকেই। এ বছর থেকেই দেশসেরা কয়েকজন প্রকাশক বাংলা একাডেমির একুশের অনুষ্ঠানে একাডেমি প্রাঙ্গণে বইয়ের পসার সাজিয়ে বসার প্রচলন শুরু করেন। তাদের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমিন নিজামী, মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা এবং বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলামের নাম উল্লেখযোগ্য।
১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে একটি বিশাল জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। সেখানেও ওই প্রকাশকরা বইয়ের পসার সাজিয়ে অনানুষ্ঠানিক বই বিক্রির হাট বসান। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির পরিচালক হন। তিনিই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন করেন। ১৯৮৪ সাল থেকে প্রতি বছর বইমেলায় পাঠক, লেখক, প্রকাশক এবং বইয়ের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। অবস্থা এমন ঠেকেছে যে, একসময় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিল ধারণের ঠাঁই হতো না। তখন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে বইমেলা বসবে। আজকের বৃহত্ পরিসরের বইমেলার আয়োজন শুরু হয়েছে ২০১৪ সাল থেকে। বইয়ের হাট আরো বিস্তৃত হোক, অমর একুশে গ্রন্থমেলা আরো সমৃদ্ধ হোক—এই আমাদের প্রত্যাশা।