আণবিক শক্তি বিধ্বংসী আনবিক বোমা তৈরি যদি করতে পারে, তবে তার অপরিমেয় শক্তি ব্যবহার করে আধুনিক বা সাম্প্রতিক সময়ের অপরিহার্য শক্তি ‘বিদ্যুত্শক্তি’ নিশ্চয়ই সৃষ্টি হতে পারে
একসময়ের প্রমত্তা নদী পদ্মার ধারে পাবনার পাকশি পেপার মিলের কাছে রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট (পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র) স্থাপন করার জন্য রাশিয়ান স্টেট নিউক্লিয়ার এনার্জি কর্পোরেশন (রোসাটম)-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মধ্যে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর চূড়ান্ত চুক্তি সই হয়। এটি থ্রি প্লাস প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ মডেলের দুটি রি-অ্যাক্টর নিয়ে বাস্তবায়িত হবে, যেটি ২০১১ সালের ২ নভেম্বরে একবার ঠিক করা হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এই অগ্রযাত্রা এখন দৃশ্যমান হতে চলেছে। এইরকম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট বর্তমানে সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিদ্যুত্শক্তি উত্পাদনের অন্যতম কার্যকরী উত্স ও মাধ্যম হিসেবে সফলতা দেখাচ্ছে।
রাশিয়ার স্টেট নিউক্লিয়ার এনার্জি কর্পোরেশন বা রোসাটম বিশ্বে নিউক্লিয়ার রি-অ্যাক্টর স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যতম একটি বৃহত্ প্রতিষ্ঠান, যারা অতি বিশ্বস্ততা ও দক্ষতার সঙ্গে তাদের সফলতার প্রমাণ দিচ্ছে। তুরস্ক, বেলারুশ, ইরান, ভারত (কুদানকুলাম), ভিয়েতনাম (নিন তুয়ান), হাঙ্গেরি, তাইওয়ান, চীন, ফিনল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ ১৯টি রি-অ্যাক্টর স্থাপনার চুক্তি রোসাটম ওইসব দেশে চূড়ান্ত করে এগিয়ে যাচ্ছে। পারমাণবিক শক্তি বিদ্যুত্শক্তি উত্পাদনে খুবই কার্যকরী—এই বিষয়টি সর্বজনের কাছে জানা। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে এর স্থাপনা করতে হবে, তা না হলে সমূহ বিপদ। জাপানের ফুকুশিমা দাইচিতে যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে গেল, তার জের এখনো চলছে। পারমাণবিক চুল্লির তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে বর্জ্য নির্গমনের কারণে যে স্পেন্ট ফুয়েল তা নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তার দ্বারা কোনো মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ শস্যফসল, ফুল-ফলাদি বা জলবায়ু কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে না পারে। সারাবিশ্বের নানান দেশে বিদ্যুতের ব্যবহারই আগামী ভবিষ্যত্ নির্মাণের প্রধান উপাদান ও মাধ্যম বলে পরিচিত। ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৬ আগস্ট হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমা ‘লিটলবয়’-এর তিন দিন পরে ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে সেই লিটলবয় ফ্যাটম্যান হয়ে আর এক আণবিক বোমায় সব নিয়ে তাত্ক্ষণিক প্রায় তিন লাখ এবং বহুসংখ্যক নির্দোষ মানুষ পঙ্গু ও আহত হয়।
এই যুদ্ধ-উন্মাদনার কুফলে আণবিক শক্তির বিধ্বংসী রূপকে মানবিক শক্তিরূপে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সবিশেষ গুরুত্ব বহন করে এবং সেই কারণে আণবিক শক্তি বিদ্যুত্শক্তি হিসেবে উত্পাদন করার দিকে বিজ্ঞানীরা মনোনিবেশ করেন। তার মধ্যে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করে বিদ্যুত্ উত্পাদন প্রধান, কার্যকর ও জনহিতকর একটি শিল্প বলে পরিচিতি পায়। এই কার্যপদ্ধতি দিন দিন বিভিন্ন উন্নত বিজ্ঞান প্রযুক্তির কলাকৌশলে নতুন নতুন প্রয়োজনীয় ও ব্যবহারিক শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে।
আণবিক শক্তি বিধ্বংসী আনবিক বোমা তৈরি যদি করতে পারে, তবে তার অপরিমেয় শক্তি ব্যবহার করে আধুনিক বা সাম্প্রতিক সময়ের অপরিহার্য শক্তি ‘বিদ্যুত্শক্তি’ নিশ্চয়ই সৃষ্টি হতে পারে। এই ভাবনা থেকেই নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক বিদ্যুত্শক্তি উত্পাদন আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে। ১৩৭০ কোটি বছর আগে বিগব্যাঙের পরে জানা যায় ৪৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবী ও চাঁদের সৃষ্টি হওয়ার পর মানুষের আবির্ভাব হয় প্রকৃতির রহস্যময় প্রাকৃতিকতার নিয়মে ৩৫ লক্ষ বছর আগে এবং মানুষের দ্বারা প্রথম আকস্মিক আবিষ্কার, যা কালজয়ী সেই আগুন সৃষ্টি ১০ হাজার বছর আগে। এরপর দ্বিতীয় অসাধারণ যুগান্তকারী আবিষ্কার গোলাকার চাকা বা চক্র খ্রিস্টপূর্ব ৫ হাজার অব্দের আগে এবং তারপর বিদ্যুত্ ১৮৭৩ সালে, বাষ্পচালিত যন্ত্র ১৭৭২ সালে—এইসব সেই পরস্পরায় বৈপ্লবিক পারমাণবিক শক্তি ১৮৯৫ সালে এবং অধুনা ১৯২৪ সালে কোয়ান্টাম শক্তির ব্যবহারিকতা ও প্রয়োজনীয়তার আবিষ্কার মানবহিতৈষী কর্মকাণ্ডে গুণগত পরিবর্তনে উত্তরোত্তর অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
আগুন, চাকা, বিদ্যুত্ বাষ্পযন্ত্র—এই আবিষ্কারগুলো হয়তো হঠাত্, কিন্তু এসব দ্বারা মানুষের চিন্তার জগত্, জীবনযাপন, পদ্ধতি, সমাজ, পরিবেশ, মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কসমূহ একদিকে বিপুলভাবে ইতিবাচক, অন্যদিকে ধ্বংসকারী নেতিবাচক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং এখনো তা চলমান। তবে দেখা যায়, হাজার বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড মানুষ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে পরিচালিত হলেও তা শেষ পর্যন্ত মানুষের শান্তি, সুখ ও কল্যাণের পথেই এগিয়ে যায়। এখানেই মনুষের জন্য মনুষের দৃঢ় বিশ্বাস ও গভীর আশা। তা না হলে আলফ্রেড নোবেল সেই বিধ্বংসী ডিনামাইট আবিষ্কারের পর বিপুল বিত্ত-বৈভবের অধিকারী হয়ে হঠাত্ করে ল্যাবরেটরিতে তাঁর ছোট ভাই নিহত হলেও খবরের কাগজে সকালে মার্চেন্টও ডেথ বলে ভুল করে নিজের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে তিনি এক মানবিকবোধে উদ্বুদ্ধ ও পরিবর্তিত হয়ে ১৯০১ সাল থেকে কেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের কারণে বিশিষ্ট মানুষের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করতে যাবেন।
দেখা যায়, বর্তমানে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, ভারত, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়াসহ সেই সব দেশে সর্বমোট ১০,২৭৫টি পারমাণবিক বোমা আছে, যা দিয়ে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীকে কয়েকবার সহজেই ধ্বংস করা যায়। এখন যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ সবচেয়ে ব্যবসাসফল ও লাভজনক বাণিজ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, বিদ্যমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায়। তাই প্রথম শ্রেণির ধনাঢ্য দেশ আমেরিকা ও ইউরোপীয়রা সব সময় দুর্বল, ধর্মান্ধ ও সেনাশাসিত একনায়কতান্ত্রিক দেশে দেশে তাদের স্বার্থে যুদ্ধটাকে সবসময় কু-কূটনৈতিক অপরাজনীতির কূটকৌশলে জিইয়ে রাখতে চায়। যাতে তাদের প্রিয় ও লাভজনক যুদ্ধশিল্পের মাধ্যমে ওদের কাছে বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র বিক্রয়ের বিনিময়ে প্রভূতভাবে লাভবান হতে পারে। যেমনটি এখন চলছে। এবং দুঃখজনকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোই তাদের হাতে অসহায় ক্রীড়নক হয়ে উঠেছে। কিন্তু এরকম তো সবসময় চলতে পারে না, অবশ্যই এই ভয়াবহ খেলা একদিন থেমে যাবে এবং মানুষ তার স্বাভাবিক মানবিক কল্যাণকর পথে চলতে শুরু করবে।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাণিজ্যিকভাবে যে পারমাণবিক চুল্লি পরিচালিত হচ্ছে তার জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়। ফিশন প্রক্রিয়াতে এই ইউরেনিয়ামের আইসোটোপে নির্দিষ্ট মাত্রায় অবিরত শৃঙ্খল বিক্রিয়া ঘটানো হয় এবং এইভাবে প্রচুর শক্তি তৈরির মাধ্যমে বিদ্যুত্ উত্পাদিত হতে থাকে এবং এর ক্রমাগতমানতায় স্থায়িত্ব ৪-৫ বছর মাত্র। পরে সেগুলো পরিত্যক্ত হয় এবং এগুলোকে স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল বলে। পরিত্যক্ত এই জ্বালানিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ থাকার কারণে ক্ষতিকর তাপও বিকিরণ ও নির্গত হতে থাকে। যা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে মানুষ ও পরিবেশের জন্য খুব ক্ষতিকর হয়ে পড়ে। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি অনুযায়ী এই ফুয়েল তারা ফেরত নিয়ে যাবে—এটা নিশ্চিত, তাই বিপদমুক্ত পরিবেশ স্বাভাবিকভাবে বজায় থাকবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের এই বছর অর্থাত্ ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে মূল নির্মাণকাজ শুরু হবে। নিঃসন্দেহে এটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড। প্রাগুক্ত, জাপানের ফুকুশিমা দাইচিতে এত সাবধানতা নেয়া সত্ত্বেও ২০১১ সালে দুর্ঘটনা ঘটে গেল, জাপানের মতো উন্নত দেশে এই যদি হয়, তাহলে আমাদের মতো দেশে তা হওয়া কিন্তু বিচিত্র নয়—এরকম মনে করছেন অনেক দেশপ্রেমিক সমালোচকরা। যা খুবই স্বাভাবিক দুর্ভাবনা। কারণ মূল সমস্যা হচ্ছে স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েলের সঠিক সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ। সেভাবে চিন্তা করলে আমরা এই যে ঘরে ঘরে কারখানা-মিলে বিদ্যুত্ এবং গ্যাস ব্যবহার করছি বছরের পর বছর, সেটাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে অতি বিপজ্জক হয়ে পড়বে। কিন্তু তা হচ্ছে কি! বিদ্যুিবভ্রাট যদি ঘরে ঘরে ঘটে কিংবা গাড়ি ও ঘরের মধ্যে গ্যাস-বিভ্রাট হয়, তাহলে নিমিষেই সেই জন্যে দাউ দাউ করে শহরে-উপশহরে, গাড়িতে গ্যাস-বোমা বিস্ফোরিত হয়ে আগুন লেগে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে হবে। সেই রকম পানির পাইপ ফেটেও জ্বলমগ্ন হতে পারে শহর, নগর সব। তাই বলে কি আমরা বিদ্যুত্ আর গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করব। না তা আমরা করি নাই এবং করবও না, কেউ করে না, যেহেতু সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া আছে এবং সে রকম করা হচ্ছে। ঠিক তদ্রূপ সারা পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে পরীক্ষিত, প্রমাণিত কার্যক্রম, প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত উপায়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন পারমাণবিক শক্তি দিয়ে বাস্তবে রূপ পাচ্ছে, রূপপুর পাওয়ার প্লান্ট সেই দৃষ্টিতে আমাদের দেশে প্রথমবারের মতো হতে চলেছে যাবতীয় পুঙ্খনাপুঙ্খ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাসহ পশ্চাত্ভূমি ও প্রেক্ষাপট সংরক্ষণে যার সাহায্যে কার্যকর ও যথাযথ সময়োচিত ইতিবাচক ভূমিকা নিশ্চিত করবে। এভাবেই বাংলাদেশ খুব অগ্রসর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই সময়ে সাম্প্রতিক পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করে গর্বের সঙ্গে এর অংশীদার হবে। এর ফলে নতুন দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি হবে, যারা পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ হয়ে দেশ ও বিদেশে এই বিষয়ে কার্যকর, উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান ও ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। অন্যান্য দেশের সহযোগী সদস্য হয়ে এমন করে তাদের সাহায্যে বাংলাদেশ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার মাধ্যমে মানবিক, কল্যাণকর, সুদূরপ্রসারী জ্ঞানসমৃদ্ধ, উদার, অসাম্প্রদায়িক শক্তির শান্তি ও সমৃদ্ধযুক্ত পথের এক চিরঞ্জীব পথিক হয়ে অগ্রযাত্রার দিকে নিরন্তর চলতে থাকবে, সেই সুদূঢ় আশা আমরা সবাই করতে পারি এই একবিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ডিজিটাল যুগে।
লেখক: স্থপতি ও কবি