মহাকাশে জয় বাংলা

বাংলাদেশের একটি নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকতে পারে এই ভাবনার সূচনা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। তিনি ১৯৭৫ সালের জুন মাসে বেতবুনিয়ায় ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের সময় মহাকাশে দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট উেক্ষপণের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁরই সুযোগ্য কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট উেক্ষপণের লক্ষ্য স্থির করেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের মে মাসে বিটিআরসি’র কমিশনার (এসএম)-কে আহ্বায়ক করে গঠিত ‘স্যাটেলাইট কমিটি’ কর্তৃক ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ নামকরণের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়। উল্লেখ্য যে, জাতীয় আইসিটি পলিসি ২০০৯ অনুযায়ী ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি মহাকাশে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট উেক্ষপণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। ২০১৮ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ সফলভাবে উেক্ষপণ এবং সেটির সফল পরিচালনা করাটাই অন্যতম বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কাজটি সুসম্পন্ন করা ছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের নামকরণ তাঁরই দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়-এর নামে করতে পেরেছি। আরও স্বস্তির বিষয় যে আমরা সফলতার সাথে কেবল উেক্ষপণের কাজটিই সম্পন্ন করিনি, এটি আমাদের স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন কোম্পানির আওতায় এসেছে, এটির চমত্কার ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং পুরো জাতির জন্য এটি গৌরবের সবচেয়ে বড় প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণের সর্বশেষ উদ্যোগের বাইরেও কিছু অতীত কথা আছে। আমার মনে আছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন তখন ’৯৭ সালে ‘কেমন করে বাংলাদেশ থেকে সফটওয়্যার রপ্তানি করা যায়’ তার উপায় উদ্ভাবন করার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করেন। সেই টাস্কফোর্সের প্রধান ছিলেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। আমিও সেই টাস্কফোর্সের সদস্য ছিলাম। টাস্কফোর্স মোট ৪৫টি সুপারিশ প্রদান করেছিল। কমিটির কাছে আমি বাংলাদেশের একটি নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকার সুপারিশ করতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু টাস্কফোর্স ‘সময় হয়নি’ এই বিবেচনায় প্রস্তাবটি সুপারিশ আকারে পেশ করেনি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বসে থাকেননি। তাঁর সরকার বাংলাদেশের একটি স্যাটেলাইট পাবার প্রকল্প গ্রহণ করে। জাপান সরকার সেই প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে সম্মতিও প্রদান করে। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকার সেই প্রকল্পটি বাতিল করে। তারই ফলে স্যাটেলাইট নিয়ে আমাদের ভাবতে হয় ২০০৯ সালে। এরপর ১২ সালে ৮৬.৮১ কোটি টাকার একটি প্রস্তুতি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীসময়ে প্রকল্পটির ব্যয় ১৪৬.৪১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।

এ প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্দেশ্যে ‘স্যাটেলাইট কমিটি’ বিস্তারিত বিবরণসহ টেন্ডার দলিল প্রস্তুত করে। এ প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে ৩২টি পরামর্শক সংস্থা প্রস্তাব দাখিল করে। মূল্যায়নের পর বাছাইকৃত ৭টি সংস্থার কাছে দরপ্রস্তাব চাওয়া হয় এবং প্রাপ্ত দরপ্রস্তাব মূল্যায়ন করে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কর্তৃক অনুমোদনের পর ‘এসপিআই’ নামক মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাথে গত ২৯ মার্চ ২০১২ তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

অরবিটাল স্লট : স্যাটেলাইট উেক্ষপণের জন্য অরবিটাল স্লট একটি প্রধান ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে বাংলাদেশের ফাইলিংকৃত ৭৪ ডিগ্রি, ১৩৩ ডিগ্রি, ৬৯ ডিগ্রি এবং ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অরবিটাল স্লট-সহ অন্যান্য অরবিটাল স্লট নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব ফাইলিংকৃত উপরোক্ত অরবিটাল স্লট গুলোর কো-অর্ডিনেশন জটিলতা এবং তরঙ্গ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে বিকল্প অরবিটাল স্লট অনুসন্ধান করা হয়। এই অনুসন্ধানকালে ৪৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা হতে ১৩৫ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত আর্ক-এর মধ্যে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিক-এর ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রঘিমা অরবিটাল স্লট লিজ/ক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ পাওয়া যায় এবং সার্বিক দিক বিবেচনায়, প্রকল্পের কারিগরি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসপিআই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণের জন্য ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ অরবিটাল স্লটটি উপযোগী হিসেবে সুপারিশ করে। অতঃপর ইন্টার স্পুটনিকের সাথে প্রথমে একটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয় এবং পরে মোট ২৮ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর স্যাটেলাইট উেক্ষপণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে একটি ব্যবসা পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ প্রকল্প অনুমোদন : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণ সংক্রান্ত কার্যাদি সম্পন্ন করার জন্য পরামর্শকের  সহায়তায় প্রস্তুতকৃত ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ’ শীর্ষক প্রকল্পের ‘ডিপিপি’ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনে দীর্ঘ পর্যালোচনার পর গত ১৬/০৯/২০১৪ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ‘একনেক’ সভায় মোট ২৯৬৭.৯৫৭৭ কোটি টাকায় (জিওবি ১৩১৫.৫১৩৫ কোটি টাকা ও প্রকল্প সাহায্য ১৬৫২.৪৪৪২ কোটি টাকা) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের সংশোধিত মূল্য মোট ২৭৬৫.৬৬২৫ কোটি টাকা (জিওবি ১৪০৬.৯০৫৩ কোটি টাকা ও প্র. সা. ১৩৫৮.৭৫৭২ কোটি টাকা)। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ’ প্রকল্পের প্রধান অঙ্গসমূহ হলো—স্যাটেলাইট নির্মাণ, কক্ষপথে উেক্ষপণ, দুটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন স্থাপন ও ফ্যাসিলিটি নির্মাণ, স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি গঠন, প্রয়োজনীয় বীমা সংগ্রহ, অরবিটাল স্লট লিজ/ক্রয় এবং প্রকল্পব্যবস্থাপনা।

স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয় : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বৈদেশিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় কারিগরি বিনির্দেশ ও দরপত্র প্রণয়ন করা হয়। প্রণীত টেন্ডার দলিলের ভিত্তিতে মার্চ ২০১৫-তে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হলে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডা ও চীন-এর মোট ৪টি স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। মূল্যায়ন কমিটির বিচার-বিশ্লেষণের পর ফ্রান্সের থ্যালাস এলেনিয়া কোম্পানি একমাত্র সফল দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয় প্রস্তাবটির অনুমোদন দেওয়ার পর ১১ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে মাননীয় ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীসহ সংসদীয় কমিটির মাননীয় সদস্যবৃন্দ, কূটনীতিক ও দেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের উপস্থিতিতে থ্যালাস-এর সাথে মোট ১৯৫১,৭৫,৩৪,৪৮২/- টাকা মূল্যে স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয়ের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় (সংশোধিত চুক্তিমূল্য কমে গিয়ে মোট  ১৯০৮৭৫ কোটি টাকা)।

কাভারেজের আওতা : কারিগরি বিনির্দেশ ও চূড়ান্ত ডিজাইন অনুযায়ী ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ ১১৯.১ ডিগ্রি পূ. দ্রা. অরবিটাল লোকেশনে সফল তরঙ্গ সমন্বয়সাপেক্ষে সমগ্র বাংলাদেশ, সার্কভুক্ত দেশসমূহ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ আরো বেশক’টি দেশের অংশবিশেষ কাভারেজের আওতায় আসবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর কমিউনিকেশন মডিউল ও সার্ভিস মডিউল : ২০১৭ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর প্রধান দুটি মডিউল (কমিউনিকেশন মডিউল ও সার্ভিস মডিউল) তৈরি ও একীভূতকরণের কাজ এবং সোলার প্যানেল, এন্টেনা তৈরির কাজ শেষ হয়। প্রকল্পের বৈদেশিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ২ জন অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে থ্যালাসের উক্ত ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাসিলিটিতে বর্ণিত কার্যাদি সম্পন্ন হয়।

বস্তুত ২০১৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর নির্মাণকাজ চলতে থাকে। নির্মাণকাজ শেষে গত ১৭-২১ নভেম্বর ২০১৭ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর প্রি শিপমেন্ট সম্পন্ন করার আগে প্রায় ৬ মাস ধরে মোট ৪টি ধাপে থ্যালাস কর্তৃক সকল প্রকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর সফল উেক্ষপণ : স্যাটেলাইটটি মহাকাশে উেক্ষপণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস এক্সকে দায়িত্ব দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ প্রকল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকলের নিরলস পরিশ্রমশেষে বহুল প্রতীক্ষিত বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’, উেক্ষপণের জন্য চূড়ান্তকৃত দিনক্ষণ অনুযায়ী গত ১১ মে ২০১৮ যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকাল ৪:১৪ মিনিট অর্থাত্ ১২ মে ২০১৮ বাংলাদেশ সময় ভোর রাত ২:১৪ মিনিট-এ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেইপ ক্যানাভেরাল-এ অবস্থিত লঞ্চপ্যাড থেকে লঞ্চ ভেহিকেল ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে সফলভাবে উেক্ষপণ করা হয়। সেই সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়-এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল উেক্ষপণকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন। ৩১ জুলাই ১৮ বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে আমরা বাংলাদেশেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ জাতীয়ভাবে উদ্যাপন করি।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোন কাজে লাগবে : সংক্ষেপে জানা যেতে পারে যে, এই স্যাটেলাইট আমাদের কোন কোন কাজে লাগছে।

১. বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উন্নত টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক ডিজিটাল সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদেরকে সরাসরি শহরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে না যেয়েও রোগীর টেস্ট রিপোর্ট এক্সরে-ইমেজ ইত্যাদি তথ্য ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শেয়ার করে চিকিত্সাসেবা নেওয়ার জন্য যে টেলি-মেডিসিন প্রযুক্তি আছে তাও সম্ভব হবে এ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কভারেজ দেশের সর্বত্র বিদ্যমান তাই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, চরাঞ্চল ও দ্বীপেও এসকল সেবা প্রদান করা যাবে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দূরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না যেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত প্রফেসরের ক্লাস ই-লার্নিং বা ই-এডুকেশন পদ্ধতিতে ঘরে বসে সম্পন্ন করা যাবে। দেশে ব্যাপকভাবে ডিজিটাল কানেক্টিভিটির প্রসার ঘটার পরও দুর্গম এলাকার জন্য স্যাটেলাইটের সহায়তা খুবই প্রয়োজনীয় হবে। একইসঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য বিপর্যয়ের সময় স্যাটেলাইট খুবই প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।

২. কোনোরূপ ক্যাবল সংযোগ ছাড়াই ঘরে রিসিভার যন্ত্র স্থাপন করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ডিটিএইচ (ডাইরেক্ট টু হোম) প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্যাটেলাইট টিভির বিভিন্ন চ্যানেল দেখা যাবে। ডিজিটাল এ পদ্ধতিতে টিভি চ্যানেলের গুণগতমান ক্যাবল টিভির চেয়ে অনেক উন্নত। ডিটিএইচ-সহ স্যাটেলাইট-ভিত্তিক নতুন সেবার মাধ্যমে নতুন আয়ের সুযোগ হবে এবং এসব বিভিন্ন সেবায় লাইসেন্স ফি ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।

৩. যে-সব স্থানে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপন করা সম্ভব নয় অথবা রেডিও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক নেই, সে-সব জল ও স্থলসীমায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা প্রদান করা যাবে।

৪. প্রাকৃতিক দুর্যোগ অর্থাত্ ঝড়, বন্যা বা ভূমিকম্পে টেলিযোগাযোগের জন্য ব্যবহূত অপিটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক বা ট্রান্সমিশন টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ-ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হবে।

৫. বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার-এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং ২০টি দেশের বাইরের জন্য ব্যবহার করা যাবে। এ ২০টি ট্রান্সপন্ডার লিজ বা ভাড়া প্রদান করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে। অর্থাত্ বর্তমানে যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে, তার পরিবর্তে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে সক্ষম হবো।

৬. বর্তমানে বিটিভি ওয়ার্ল্ডসহ দেশের সব কয়টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল অনুষ্ঠানসূচি সম্প্রচারের জন্য বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণের ফলে বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীলতা আর থাকবে না এবং বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়াবাবদ প্রদেয় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।

৭. স্যাটেলাইট টেকনোলজি ও সেবার প্রসারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দেশের বেকারত্ব কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

সর্বোপরি স্পেস টেকনোলজির জ্ঞানসমৃদ্ধ একটি মর্যাদাশীল জাতি গঠনে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট অনবদ্য ভূমিকা রাখবে ।

‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ সফল উেক্ষপণের মাধ্যমে স্যাটেলাইট ক্ষমতাধর ৫৭তম দেশ হিসেবে গৌরব অর্জন করায় বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জলতর হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশে মহাকাশ প্রযুক্তি ব্যবহারের পথ উম্মুক্ত হয়েছে। এর ফলে সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ভূমিকা হবে সুদূরপ্রসারী।

হেনরি কিসিঞ্জারের তলাহীন দেশটি আজ তার স্যাটেলাইটটির গায়ে ‘জয় বাংলা’ লিখে মহকাশে উড্ডীন করতে পেরেছে; সেটি পুরো জাতির জন্য এক মহা গৌরবের। আমার নিজের কাছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে তিনটি বিশেষ অহংকারের বিষয় আছে। প্রথমত, এই প্রকল্পটি আমরা নির্ধারিত বাজেটের কমে সম্পন্ন করতে পেরেছি। দ্বিতীয়ত, এটি সর্বোচ্চ ১৫ বছর চলমান থাকার কথা থাকলেও এখনকার মূল্যায়ন অনুসারে এর আয়ু ১৮ বছর হবে। তৃতীয়ত, এই স্যাটেলাইটটি পরিচালনা করছে আমাদের সন্তানেরা। এবার আমরা স্বপ্ন দেখতেই পারি যে শেখ হাসিনার হাত ধরে আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ মহাকাশে প্রেরণ করব। আমাদের বড় সুবিধা হচ্ছে, আমাদের সন্তানেরা পরের স্যাটেলাইট যেমন চালাতে পারবে তেমনি আমাদের নতুন করে ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে না এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সামগ্রিক বিবেচনায় মহাকাশ বিজ্ঞানচর্চার জন্য দেশের প্রথম অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়টির আইনও পাস করেছেন।

 

লেখক :তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সম্পাদক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক