ডক্টরেট প্রকাশক

/ বিশ্বজিত্ দাস

 

‘আগে কখনো বইয়ের দোকানে কাজ করেছ?’ কান খোঁচাতে খোঁচাতে জিজ্ঞেস করল হিকমতউল্লাহ। তিনি ‘জ্ঞানই শক্তি’ প্রকাশনীর কর্ণধার।

প্রশ্ন শুনে মুখ শুকিয়ে গেল পারভেজের। এবারও চাকরিটা বোধহয় হবে না।

জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভেজালো সে। সকাল থেকে না খেয়ে আছে। এখন প্রায় দুপুর।

‘প্রকাশনীতে কাজ না করলেও লাইব্রেরিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।’

কান খোঁচানো বন্ধ করলেন হিকমত।

‘কোন লাইব্রেরি? কী কাজ করতা?’

একমুহূর্ত ভাবল পারভেজ। সত্যিটা কি বলবে? সে তো আসলে যেত রিয়া আপুকে একনজর দেখতে। পাড়ার সুন্দরী বড় আপু।

‘আমাদের বাসার পাশেই ছিল একটা পাবলিক লাইব্রেরি। সেখানে পার্ট-টাইম লাইব্রেরি সহকারীর কাজ করতাম।’ অবলীলায় মিথ্যা বলল পারভেজ।

‘তাহলে তো অনেক বই-টই পড়েছ?’

‘হ্যা হ্যা।’ চাপাস্বরে বলল সে।

‘কী কী বই পড়েছ?’

‘ছোটবেলায় পড়েছি তো। বেশি নাম মনে নেই। তবু আপনি যখন জানতে চাইছেন তখন বলি—ডেল কার্নেগির বই, শরত্চন্দ্রের শেষের কবিতা, নজরুলের নৌকাডুবি, রকিব হাসানের মাসুদরানা... (স্টেশনের বুকস্টলে দেখা বইগুলোর নাম স্মৃতি খুঁড়ে  খুঁড়ে বের করে আনল ও)।

‘প্রকাশনা কিন্তু কম কথা না। এটা হলো বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। এখানে অনেক কাজ। বই লেখা, প্রচ্ছদ আঁকা, প্রুফ দেখা, বাইন্ডিং করা, বিক্রি করা ইত্যাদি নানা কাজ। তুমি পারবা?’

মুখ শুকিয়ে গেল পারভেজের। ‘আজ্ঞে আপনি শিখিয়ে দিলে পারব।’

‘তুমি তাহলে আমার পাবলিকেশনে লেখকের কাজ করবা, বুজছ?’

‘আ...মি তো জীবনেও বই লিখি নাই।’

‘এখন লিখবা। আমি তোমার শিখায়ে দেবো।’

‘ক... কী বই?’

‘কম্পিউটার আর আইটির উপর বই।’

‘আমি তো কম্পিউটারের ক-ও জানি না।’

আরেকটু হলেই চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল পারভেজ।

‘দুর মিয়া! চাকরি করতে আইছো, না অন্য কিছু। শোনো, কম্পিউটারের উপর বই লেখার জন্য কম্পিউটার জানা লাগে না।’

‘তাহলে?’

‘সব কথা প্রথম দিনই শুনতে হবে!’ বিরক্তির সাথে বললেন হিকমতউল্লাহ।

‘সরি স্যার, আমি তো শেখার জন্য বলছিলাম।’

‘শোনো, ইন্ডিয়া থেকে আমি কম্পিউটার আর আইটি বিষয়ক বইগুলি কিনে আনি। যেই বইগুলি কম পরিচিত লেখকরা লিখেছে, সেই বইগুলিই আমরা ছাপব। নতুন নামে। এদেশের লেখকের নাম দিয়ে। আমাদের কম্পিউটার অপারেটররা সেসব বই কম্পোজ করতেছে। তুমি শুধু পইড়া পইড়া লাইন মিলায় দিবা। দেখবা পড়তে পড়তে তুমি নিজেই এক্সপার্ট হইয়া গ্যাছো গা। বুঝছ?’

 

দুই.

‘কিছুই তো বুঝছি না স্যার?’ হেলাল বলল। সে একজন কর্মচারী। তার সামনে বসে আছে বিগ প্রজেক্ট প্রকাশনীর কর্ণধার।

‘কী হয়েছে?’ জানতে চাইলেন তিনি।

‘স্যার, কালকেই ভার্সিটির মজিদ স্যারের সাথে কথা হয়েছিল। তিনি বইটিতে নিজের নাম দিতে রাজি হয়েছিলেন। আর আজ বলছেন, যে বই তিনি লিখেন নাই সেই বই তাঁর নামে প্রকাশ করতে চাইলে তাকে না-কি দুই লাখ টাকা দিতে হবে! আর বইয়ের পাণ্ডুলিপিও না কি আগে তিনি পড়ে দেখবেন! এখন কী করব স্যার?

‘সমস্যা কী?’ পান চিবুতে চিবুতে বললেন মালিক।

‘স্যার উনাকে পড়তে দিলে বই তো মাসখানেকের মধ্যেও প্রকাশিত হবে না।’

‘যুগ পাল্টেছে রে। লেখকরা এখন বইতে নাম দেবার জন্যই লাখ লাখ টাকা চাইছে। অথচ এককালে এরা খুব নিরীহ জাতি ছিল। সবাই চালাক হয়ে গেছে। আমার বস হিকমতউল্লাহ বলতেন, আমরাই লেখক জন্ম দেই, আমরাই ওদের লালন পালন করি, আমরাই ওদের দাফন করি।’

‘কী করব স্যার? বইয়ের কাজ কি স্টপ করে দেবো?’

‘মোটেও না। বইয়ের কভারে লেখকের নাম দাও ড. মুহম্মদ পারভেজ রানা।’

‘স্যার, নামটা তো আপনার সাথে মিলে যাচ্ছে। আপনার নামটাই দিচ্ছেন না কি?’

‘দিতেই পারি। আমার একটা প্রকাশনা সংস্থা আছে আর আমি একটা বই লিখতে পারব না!’

‘নিশ্চয়ই পারবেন স্যার। কিন্তু ড. টাইটেল দেওয়া কি ঠিক হবে?’

‘একশবার হবে। পরমাণু বিজ্ঞানের উপর লেখা বইয়ের লেখক যদি ডক্টর না হয় তাহলে তো পাঠক খাবে না। পরমাণু ক্ষুদ্র হলেও এর বইয়ের লেখকের ডক্টরেট ডিগ্রি থাকতেই হবে, না হলে তো বইটি ভারিই হবে না। বুঝেছ?’

‘মা...নে স্যার, কেউ যদি হঠাত্ জানতে চায় তোমার স্যার ডক্টরেট ডিগ্রি পেল কোথায়?’

‘জানতে চাইবে না। ডক্টর টাইটেল দেখলে আর কেউ কিছু দেখতে চায় না। আর যদি কেউ তোমাকে বলেই ফেলে, তুমি তাকে ধমক দিয়ে বলবে আমার স্যারের বাবা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ছিলেন। ডাক্তারের পোলা ডাক্তার হইব না তো কি পান দোকানদারের পোলা ডাক্তার অইব!

বলতে বলতে নিজেই নতুন ফন্দি আবিষ্কারের আনন্দে হেসে উঠলেন সদ্য ডক্টরেট ডিগ্রিপ্রাপ্ত বিগ প্রজেক্ট পাবলিকেশন্সের কর্ণধার ডক্টর (!) পারভেজ রানা।   g