জানা-অজানা

ছাগলনাইয়া

আরাফাত হোসেন ভূঁইয়া

 

ছাগলনাইয়া, ফেনী জেলার একটি উপজেলার নাম। এখানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয়, মুসলিম ও বাঙালি উপাচার্য স্যার এ এফ রহমানের পৈত্রিক নিবাস। তাছাড়া রয়েছে ৪০০ বছরের পুরোনো চাঁদগাজী ভূঁইয়া মসজিদ, শিলুয়ার শীল পাথর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত শুভপুর সেতুসহ নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। উপজেলাটির নামকরণ নিয়েও শোনা যায় নানা কল্পগল্প। তারই একটি গান্ধীর ছাগল চুরির ঘটনা। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দ। অবিভক্ত ভারতের নোয়াখালী জুড়ে শুরু হয় ভয়ঙ্কর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা। এই খবর মহাত্মা গান্ধীর কাছে পৌঁছালে দাঙ্গা নিরসনে তিনি তত্ক্ষণাত্ নোয়াখালী আসার সিদ্ধান্ত নেন। ৭ নভেম্বর ১৯৪৬-এ তিনি নোয়াখালীর চৌমুহনী রেলস্টেশনে এসে পৌঁছেন। তিনি ছাগলের দুধ পান করতেন বলে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন নিজের ছাগলটিও। কিন্তু নোয়াখালীতে আসার পর আকস্মিকভাবে তাঁর ছাগল চুরি হয়ে যায়। কেউ কেউ মহাত্মা গান্ধীর এই ছাগল চুরির ঘটনা থেকেই ছাগলনাইয়া নামের উত্পত্তি বলে মনে করে থাকেন।

কিন্তু উপজেলাটির নামের প্রকৃত ইতিহাস ভিন্ন। বর্তমান ছাগলনাইয়া কোনো এক সময়ে প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার অন্তর্গত ছিল। পরে উত্তরের পাহাড়ি স্রোতে, প্রাকৃতিক কারণে বা নদী ভাঙনে সাগরে বিলীন হয়ে আবার ধীরে ধীরে ভূমি খণ্ড খণ্ড রূপে জেগে ওঠে।

কয়েক শ বছর আগে পুরান রানির হাট থেকে পশ্চিম ছাগলনাইয়া পর্যন্ত ১৪/১৫ মাইলব্যাপী প্রশস্ত নদী ছিল বলে জানা যায়। এ অংশে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল খেয়া নৌকা। ছাগলনাইয়ার কিছু অংশ অনেক আগেই জেগে উঠে বনজঙ্গলে ভরে যায়। পাহাড়ের নিকট খণ্ড স্থান বলে তখন এলাকার নাম হয় খণ্ডল। ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে ছাগলনাইয়া নামকরণ হয়। তবে এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। স্থানীয়দের মতে, ছাগলনাইয়ার আদি নাম ছিল সাগর নাইয়া। কাজীরবাগের উচ্চভূমি থেকে পূর্বদিকে পার্বত্য ভূমির মধ্যভাগে ছিল এক সময় এক বিরাট সাগর। কেউ কেউ ওটাকে ‘সুখ সাগর’ নামে অভিহিত করেন। কেউ কেউ আবার এ সাগরকে ‘বিল্লাহ সাগর’ বলে থাকেন। এই সাগর পারাপারের জন্য ছিল নাইয়া বা নৌকার মাঝি। সাগর ও নাইয়া শব্দ দুটি যুক্ত হয়ে ‘সাগর নাইয়া’ নামের উদ্ভব।  ইংরেজ আমলের শুরুতে সাগর শব্দটি ভুলক্রমে ‘সাগল’ নামে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। এভাবেই কালের বিবর্তনে ছাগলনাইয়া শব্দে পরিণত হয়েছে বলে প্রচলিত।

সুতরাং গান্ধীর ছাগল চুরির ঘটনার সঙ্গে এই অঞ্চলের নামকরণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালী এসেছিলেন ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে, আর ছাগলনাইয়া নামকরণ হয়েছে ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গৃহীত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় একমাত্র বাঙালি মুসলিম শিক্ষার্থী হিসেবে ফার্স্ট ডিভিশন অর্জনকারী এ উপজেলার সন্তান, মাস্টার ওয়াহিদুর রহমান ভূঁইয়ার ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের একটি প্রত্যয়নপত্রে ‘ছাগল নাইয়া’ (পৃথকভাবে) লিখিত রয়েছে।