ফুল চাষের পথিকৃত্

দেশের মোট ফুলের চাহিদার প্রায় ৭৫ভাগ উত্পাদন করে যশোরের গদখালী অঞ্চল পেয়েছে ফুলের রাজধানীর সুখ্যাতি। ৩৭ বছর আগে ফুলকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ভাবেন একজন নার্সারি ব্যবসায়ীর ছেলে শের আলী সরদার। তিনিই দেশের বাণিজ্যিক ফুলচাষের পথিকৃত। কীভাবে পেলেন তিনি সেই পথের দিশা? সেই গল্পই লিখেছেন

আহমেদ সাঈদ বুলবুল

আবহমান গ্রামবাংলার চিরায়ত দৃশ্য দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের সমাহার। কিন্তু মাঠের পর মাঠ সবুজের বুকে ভিন্ন এক রঙের খেলা। তবে কী সবুজের বুকে ছিটিয়ে দিয়েছে কেউ রঙের ছিটা? নাকি শিল্পীর তুলিতে ফুটে উঠেছে একেকটি বাহারি ফুল? যশোর-বেনাপোল সড়কের গদখালী বাজার থেকে ছোট পিচঢালা রাস্তা ধরে গ্রামের পথে এগোলে দেখা যাবে দু-ধারে সাতরঙা হরেক ফুলের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। যতদূর চোখ যায় শুধু ফুল আর ফুল। যেন ফুলের স্বপ্নীল রাজ্য। সেখানে আবিরের রঙ গায়ে মেখে ফুটে রয়েছে জারবেরা। পাঁপড়ি মেলে রয়েছে শতশত গোলাপকলি। এমনই মনোরম ছবির অনবদ্যতা যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী এলাকায়। দেশে উত্পাদিত ফুলের ৭৫ভাগের জোগান দিয়ে গদখালী হয়ে উঠেছে ‘বাংলার ফুলের রাজধানী’। বর্তমানে এই এলাকার ২০টি গ্রামে দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হচ্ছে। ৫ হাজার কৃষক রঙ-বেরঙের ফুল উত্পাদন করে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রাখছেন। আর তা থেকে বছরে আয় হচ্ছে ৪শ’ থেকে ৫শ’ কোটি টাকা। ফুলচাষ ও কেনাবেচার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন এই এলাকার ৫০ হাজার মানুষ। যশোরের এই ফুলকে কেন্দ্র করে সারাদেশের ১০ লাখ লোক ফুল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে জীবিকানির্বাহ করছেন। যশোরের উত্পাদিত ফুল বিক্রি হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের ৫৫টি জেলায়। কিছু ফুল বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। প্রতিবছর ফুলচাষের জমির পরিমাণ বাড়ছে। চাষিরা নতুন নতুন ফুলের চাষ করছেন। গ্রিনহাউস নির্মাণ করে রক্ত ঘামে ফোটাচ্ছেন ইংল্যান্ড, ইউরোপের মতো জারবেরা। আর এই ফুলচাষ করে এলাকার কৃষকরা দূর করছেন দারিদ্রের অভিশাপ। ফুলকে ঘিরে এত সব রাশি রাশি সোনা ঝরা খবরের প্রথম নায়ক শের আলী সরদার। তার দেখানো পথে হেঁটেই সাফল্যের দেখা পেয়েছেন গদখালী তথা সারা বাংলার ফুলচাষিরা।

শের আলী সরদারের বাবা আব্দুর রহমান সরদারের নার্সারি ব্যবসা ছিল। ঝিকরগাছা এলাকার সবচেয়ে বড় নার্সারি পানিসারা গ্রামের ‘সর্দার নার্সারি’র মালিক তিনি। দীর্ঘ ৩ যুগ নার্সারি ব্যবসায় যুক্ত থেকে ফলজ ও বনজ বৃক্ষের চারা উত্পাদন করে তিনি সুনাম কুড়ান। এই নার্সারির একটি শাখা করা হয় যশোর-বেনাপোল সড়কের পাশে গদখালীতে। সেই নার্সারিতেই বসে ছিলেন শের আলী। ১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাসে এরশাদ সরকারের শাসনামলের সেই দিনটিতে হরতাল ছিল। কড়া হরতাল। রাস্তাঘাটে গাড়ির বালাই নেই। ভারত থেকে বেনাপোল সীমান্ত হয়ে দেশে ফেরেন এক ভদ্রলোক। রিকশায় করে যশোরের পথে যাচ্ছিলেন তিনি। প্রায় নিস্তব্ধ গদখালীর সর্দার নার্সারির সামনে দাঁড় করালেন রিকশা। ভদ্রলোকের কোলে অত্যন্ত যত্ন করে গামছা দিয়ে মোড়ানো রজনীগন্ধার ২-৩শ’ স্টিক। নেমে এসে পানি খেতে চাইলেন শের আলীর কাছে। কথায় কথায় বললেন, ‘আপনি তো নার্সারি ব্যবসা করেন। এই দেখেন কত সুন্দর ফুল। নার্সারির পাশাপাশি চাষ করেন না এই ফুলের!’ নতুন নেশার ঘোর পেয়ে বসলো শের আলীকে। তিনি জানলেন, আগন্তুকের বাড়ি যশোর শহরে। নাম নূর ইসলাম। তাকেই অনুরোধ করলেন ভারত থেকে রজনীগন্ধার বীজ এনে দেওয়ার। ভারতেও ফুলের এই জাতটি তেমন পুরোনো না। দক্ষিণ আফ্রিকার কেনিয়া থেকে এসেছে লিলি গোত্রের এই ভ্যারাইটি। নূর ইসলাম ২-৩ হাজার টাকায় আড়াই মণ ওজনের এক বস্তা বীজ এনে দেন শের আলীকে। শের আলী লাগিয়ে ফেলেন রজনীগন্ধার চারা। কিন্তু প্রথমেই বিপত্তি। এটা যে শীতে লাগাতে নেই! লাগাতে হয় গরমে। হতাশ না হয়ে এবার সময়মতো লাগালেন। ৬ মাস পর হেসে উঠল ফুলের ক্ষেত। হাসি শের আলীর মুখেও। ফুল নিয়ে ছুটলেন ঢাকায়। হাইকোর্ট মাজারের বটতলায় বিক্রি হলো ২শ’ টাকার ফুল।

তখনকার ঢাকার ফুলের বাজার কেমন ছিল? সেই উত্তরও মেলে শের আলীর কাছে। হাইকোর্ট মাজারের বটতলায় বিক্রি হতো কিছু জংলি ফুল। সেসময় চাঁপা, রঙ্গন, কাঠগোলাপের মতো কিছু জংলি ফুল দিয়ে হাইকোর্ট এলাকার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন কেউ কেউ। এ সময় শের আলীর ফুল দিয়ে শাহবাগে শিশুপার্কের কাছে প্রথম ফুলের দোকান ‘মালঞ্চ’ উদ্বোধন করেন সামরিক শাসক এরশাদ। রুমি সাহেবের মালিকানাধীন দোকানটি মজনু সাহেব ভাড়া নিয়ে প্রথম বাণিজ্যিক এই ফুলের দোকানটি গড়ে তোলেন।

প্রথম ফুলচাষের নায়ক পানিসারা গ্রামের শের আলী সরদার রজনীগন্ধার সিঙ্গেল স্টিক এনেই থেমে যাননি। এরপর একে একে তিনি ফুল সাম্রাজ্যের বাসিন্দা করেছেন ডাবল স্টিকের রজনীগন্ধা, গোলাপ, গ্লাডিউলাস, জারবেরা, গাঁদা ও লিলিয়াম। আবার ফুল এনেই বসে থাকেননি। ফুলচাষের কনসালট্যান্সির কাজেও ঘুরে বেড়ান দেশে দেশে। তিনি এখন স্বপ্ন দেখছেন অর্কিডের টিস্যু কালচারের চারার। স্বপ্নের চোখটা তার চকচকে—‘জমিতে হবে মাছ চাষ। ওপরে মাচায় অর্কিড। সেই অকির্ডের যে মোহনীয়তা হবে তা বাংলাদেশে সামান্য পরিমাণে পাওয়া যাওয়া অর্কিডের চেয়ে ‘অনেক বেশি আকর্ষণীয় হবে।’ শের আলীর উদাসী চোখটা তখন দূর দিগন্তে। চোখে মুখে কী এক খুশির নাকি রহস্যের হাসি, পড়তে পারলাম না!