ট্রাম্প নির্দোষ

তালেব রানা

যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বড়ো জয় উপহার দিয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কংগ্রেসের বিচারকাজে বাধা দেওয়ার দুটি অভিশংসন অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়েছে। দোষী সাব্যস্ত না হওয়ায় তাকে এখন ক্ষমতা হারাতে হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত বুধবার সিনেটে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক ঐ ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত ডিসেম্বরে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হন ট্রাম্প। তার আগে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও অ্যান্ড্রু জনসনও প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটের বিচারে তারা দোষী সাব্যস্ত না হওয়ায় কেউই ক্ষমতা হারাননি।

প্রেসিডেন্টকে সিনেটের বিচারে অভিযুক্ত করে অপসারিত করতে ৬৭ সিনেটরের সমর্থন প্রয়োজন হয়। বর্তমানে ১০০ সিনেটরের মধ্যে ৫৩ জনই রিপাবলিকান, যে কারণে সহজেই অব্যাহতি পেয়েছেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বাকি সিনেটরের মধ্যে ৪৫ জন ডেমোক্র্যাট এবং দুজন হলেন স্বতন্ত্র।

ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিশংসন অভিযোগে তার পদচ্যুতির বিষয়ে ৫২-৪৮ ভোটে জিতেছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে কংগ্রেসের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে প্রেসিডেন্টের পদ হারানোর সম্ভাবনা খারিজ হয়েছে     ৫৩-৪৭ ভোটে। ভোটাভুটিতে দলীয় বিভাজন ছিল স্পষ্ট। তবে উটাহর সিনেটর মিট রমনি ছিলেন একমাত্র রিপাবলিকান, যিনি দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। তবে ডেমোক্রাটদের নিরাশ করেছেন অন্য দুজন মধ্যপন্থি রিপাবলিকান সিনেটর মেইনের সুসান কলিনস এবং আলাস্কার লিসা মারকাওস্কি। প্রতিশ্রুতি দিয়েও তারা নিজের পক্ষ ত্যাগ করেননি। কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর সাম্প্র্রতিক সময়ে ট্রাম্পের আচরণের সমালোচনা করলেও তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই আচরণ ইমপিচ করার পর্যায়ে যায়নি।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে ইউক্রেনকে চাপ প্রয়োগ, সামরিক সহায়তাকে ঘুষ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে অভিশংসন প্রক্রিয়ার মুখে পড়েন ট্রাম্প। যদিও তিনি বারবার তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সিনেটের ভোটাভুটির পর তার নির্বাচনী প্রচারণা টিম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুরোপুরি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের নিজ কাজে মন দেওয়ার সময় হয়েছে। অকর্মণ্য ডেমোক্র্যাটরা জানে তারা ট্রাম্পকে হারাতে পারবে না, সেজন্য তারা তাকে ইমপিচ করেছিল।  অভিশংসন প্রক্রিয়া ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণার একটি কৌশলমাত্র। এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে ‘ধাপ্পাবাজি’র একটি।

তবে ডেমোক্র্যাট দলীয় সদস্যরা বলেছেন, অব্যাহতির ফলে ট্রাম্প আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবেন। হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য সব সময় একটি ‘হুমকি’ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং রিপাবলিকান সিনেটররা আইন না থাকার ব্যাপারটিকে সাধারণ ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছেন। সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতা চাক শুমার বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এ যাত্রা রেহাই পেলেও তার ত্রুটিসমূহ সবাই জানেন।

অব্যাহতি পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার বিজয় উদ্যাপন করেছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এবং নিজের আইনজীবীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা কোনো অন্যায় করিনি। শেষ পর্যন্ত যা ফল হয়েছে সেটাই আসল ঘটনা।’ সে সময় তিনি বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপক সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাজে আর খারাপ লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি।’ এর এক দিন পরই অভিশংসন বিচারে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন ট্রাম্প। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) মার্কিন রাষ্ট্রদূত গর্ডন সোন্ডল্যান্ড এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ইউক্রেন-বিষয়ক শীর্ষ বিশেষজ্ঞ লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলেক্সান্ডার ভিন্ডম্যানকে সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। এছাড়া ভিন্ডম্যানের ভাই লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়েভগেনি ভিন্ডম্যানকে হোয়াইট হাউজ থেকে সেনা দপ্তরে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো কিছু কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে ট্রাম্প হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট প্রার্থী, যিনি অভিশংসিত হয়েছেন। আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য তিনি ইতিমধ্যে জোর প্রচারণা শুরু করেছেন। কিন্তু অনেকের মনে প্রশ্ন, অব্যাহতি পাওয়ার পর ট্রাম্পের আচরণে পরিবর্তন আসবে কি? ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ইলিনয়সের পল সিমন পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক জন জ্যাকসন আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমার মনে হয় না তিনি যা করছেন তাতে কোনো নিয়ন্ত্রণ আসবে।’ বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেভাবে অভিশংসনের বিচার হয়েছে, তাতে ডেমোক্র্যাটরা বলার সুযোগ পাবে যে এই অব্যাহতি ট্রাম্পের জন্য বড়ো জয় নয়, বরং দেশের জন্য এক বড়ো ক্ষতি। তাই আগামী নির্বাচনে এই অভিশংসন বিচার দুই দলের জন্যই একটি বড়ো অস্ত্র হতে পারে। কে বেশি সুবিধা পাবেন, সেটা এখনই বলা কঠিন।