বইমেলার অর্থনীতি

রেজাউল করিম খোকন

 

গত ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় রেকর্ড পরিমাণ বই বিক্রি হয়েছিল, যার মূল্য ৮০ কোটি টাকা। তার আগের বছর ২০১৮ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বই বিক্রি হয়েছিল ৭০ কোটি টাকার। ২০১৭ সালে ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। একটি ব্যাপার সহজেই লক্ষণীয় যে প্রতি বছর বইমেলায় বই বিক্রির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। এখন চলছে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বলা চলে, দারুণ জমে উঠেছে মধ্যভাগে এসে আমাদের প্রাণের এই গ্রন্থমেলা। কয়েক বছর আগেও খুবই সীমিত পরিসরে বাংলা একাডেমি চত্বরে অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হতো। তখন গ্রন্থমেলায় আগত দর্শনার্থী বইপ্রেমিকদের ভিড়ের চাপে সবার পক্ষে স্টলে স্টলে ঘুরে বই দেখা, বই কেনা বেশ কঠিন হয়ে পড়ত। তবে কয়েক বছর আগেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছেড়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে শুধু ঢাকায় বাংলা একাডেমি কর্তৃক গ্রন্থমেলার বিশাল আয়োজনের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বড়ো বড়ো শহরেও গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্টল দিয়ে বইয়ের পসরা সাজিয়ে তুলছেন প্রকাশক ও বইয়ের ব্যবসায়ীরা। ঢাকার বাইরের গ্রন্থমেলাগুলোতেও বেশ দর্শনার্থী, বইপ্রেমি পাঠকের ভিড় রয়েছে। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি এলেই নতুন বই প্রকাশের উত্সব শুরু হয়ে যায় এখন। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা বইমেলা সামনে রেখে জনপ্রিয় বিখ্যাত লেখকদের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত নতুন, অল্প পরিচিত লেখকদেরও বই প্রকাশ করে। একুশের বইমেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাপাখানা, অর্থাত্ প্রেসে রমরমা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে কয়েক মাস আগে থেকেই। এখন এটা তুঙ্গে পৌঁছেছে। বই ছাপা-সংক্রান্ত নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে বই বিপণনের উত্সব চলে প্রতি বছরই। কারণ এই মেলা পাঠক-লেখক-প্রকাশকের চমত্কার এক মিলনমেলা। প্রকাশকেরা পাঠকদের হাতে প্রিয় বইটি তুলে দিতে সর্বত্মকভাবে চেষ্টা চালান। সেই আয়োজনের প্রস্তুতিতেই যেন ঘুম হারাম ছাপাখানার লক্ষ শ্রমিক, কারিগর, বাঁধাইকারীদের। কোনোভাবেই ফুরসত নেই প্রকাশক, প্রচ্ছদশিল্পীদের। প্রতিটি বইকে দৃষ্টিনন্দন, আকর্ষণীয়, অপূর্ব সুন্দর করে তুলতে অক্লান্তভাবে কাজ করছেন তারা সবাই। বইমেলা এলে বইয়ের মলাট তৈরি ও বাঁধাইকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রীতিমতো সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করতে হয় প্রকাশকদের। বইমেলা শুরুর অন্তত দুই-তিন মাস আগে থেকে বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাদের চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার দেয় ছাপাখানাগুলোতে। প্রতি বছরই অমর একুশে গ্রন্থমেলায় নতুন নতুন অনেক লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে, একইভাবে নতুন প্রকাশক বই বিপণন ব্যবসায় নেমে পড়েন। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন এক মাত্রার সংযোজন ঘটে তা বলাই বাহুল্য। বইমেলার সুবাদে ছাপাখানা, বাঁধাইকারী প্রতিষ্ঠান ও মেলার স্টলগুলোতে সৃষ্টি হয় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। আর এভাবেই অর্থনীতির চাকা বেশ গতিশীল হয়। বই জ্ঞানের পরিধি বাড়ায়, মননশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। এটাও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলা যায় অনায়সেই। আমাদের প্রকাশনাশিল্পে নিয়োজিত রয়েছেন অগণিত মানুষ। আর এই শিল্পকে চাঙ্গা রাখতে অমর একুশে গ্রন্থমেলা শক্তিশালী ভূমিকা রেখে চলেছে প্রতি বছর। অমর একুশে বইমেলার অর্থনীতি নানাভাবে, বিভিন্ন দিকে বিস্তৃত। বইমেলা এলে বই বিপণনের জন্য প্রকাশক, লেখক বিভিন্ন পত্রিকায় ও অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। এভাবেই প্রায় কোটি টাকা খরচ হয়।

আজকাল বইমেলার স্টলের পাশাপাশি অনলাইনেও নতুন প্রকাশিত বই বিক্রির চমত্কার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনলাইনে বই বিক্রির কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হয়েছেন। এই ব্যবসায় তারা বেশ লাভবান হচ্ছেন। পাশাপাশি পাঠক ঝামেলাবিহীনভাবে ঘরে বসেই তার কাঙ্ক্ষিত প্রিয় বইটি খুব সহজেই হাতে পেয়ে যাচ্ছেন। আজকাল জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠিত লেখকদের একাধিক নতুন বই অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে বেস্ট সেলার বইগুলো লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যবসা করে। এর মাধ্যমে লেখক সম্মানী হিসেবে ভালো অঙ্কের অর্থ পান। প্রকাশকও সেই বেস্ট সেলার বই বিপণনের মাধ্যমে বেশ ভালো মুনাফা করেন। বই প্রকাশনার ক্ষেত্রে শুধু লেখক-প্রকাশকই নন, এর সঙ্গে যুক্ত পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতকারী, কম্পিউটার কর্মী, প্রচ্ছদশিল্পী, সম্পাদনা কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, প্রেসের কর্মী, ডিজাইনার, বাঁধাইকারী, ডেলিভারিম্যান প্রমুখ নানাভাবে সম্পৃক্ত হন। ফলে অমর একুশে গ্রন্থমেলার বই প্রকাশ ও বিপণন অর্থনীতিতে মোটামুটি ভালো প্রভাব ফেলছে বলা চলে। এই সময়ে বই প্রকাশনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী-প্রকাশকেরা সারা বছরের উপার্জন করার চেষ্টা করেন। অনেক নতুন লেখক প্রকাশকের মাধ্যমে তার বইটি প্রকাশের জন্য নিজে থেকেই পুঁজি বিনিয়োগ করে থাকেন। এভাবেও প্রকাশনাশিল্পে বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাড়তি আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে। আশা করা যায়, ২০২০ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অতীতের চেয়ে বই বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হবে। এবারের গ্রন্থ মেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানকে ১৭৯টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৫৬০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৭৩টি ইউনিট এবং ৩৪টি প্রকাশনীকে প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। 

ছবি: ইন্টারনেট