ছেলের মৃত্যুশোক ভুলতে যিনি হাজারো লাশ দাফন ও দাহ করেছেন

‘একদিন এক পুলিশ অফিসারকে নদীতে একটি লাশ ছুঁড়ে ফেলতে দেখলাম। আমি দেখে বিচলিত হয়ে পড়লাম। সেদিন আমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করলাম, আজ থেকে আমিই হবো বেওয়ারিশ লাশের অভিভাবক। আমি বেওয়ারিশ লাশের সৎকার করবো।’ 

এই কথাগুলো বিবিসিকে বলছিলেন মোহাম্মদ শরিফ। অযোধ্যার দাঙ্গায় নিহত হয়েছিলেন তার ছেলে। ছেলের লাশ কোনদিন তিনি খুঁজে পাননি। তারপর থেকে গত ২৮ বছর ধরে সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে চলেছেন মোহাম্মদ শরিফ। 

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর ভারতের অযোধ্যা শহরে বৃদ্ধ মোহাম্মদ শরিফকে সবাই ডাকেন শরিফ চাচা বলে। এ পর্যন্ত তিনি ঠিক কত বেওয়ারিশ লাশ তিনি দাফন করেছেন, কত শবদেহ চিতায় পুড়িয়েছেন, তার হিসাব নেই। শুধু তাই নয়, হাজার হাজার বেওয়ারিশ লাশের জানাজা পড়েছেন তিনি। 

কেউ হয়তো সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। কেউ রেল দুর্ঘটনায়। কেউ নিজের বাড়ি থেকে দূরের কোন জায়গায় মারা গেছেন। তীর্থযাত্রী, অভিবাসী, সন্তান পরিত্যক্ত বৃদ্ধ- এরকম নানা মানুষের লাশ। হাসপাতালে মারা যাওয়া দরিদ্র মানুষ, যাদের লাশ সৎকার করার কেউ নেই। তাদের লাশই সৎকার করেন মোহাম্মদ শরিফ।


ছেলের ছবি হাতে স্ত্রীর সঙ্গে মোহাম্মদ শরিফ। ছবি: বিবিসি

অযোধ্যা ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের প্রধান অনুজ কুমার ঝা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা কত বেওয়ারিশ লাশ মোহাম্মদ শরিফের হাতে তুলে দিয়েছেন, সেই তথ্য তাদের কাছেও নেই। 

তিনি বলেন, ‘আমাদের অনুমান হচ্ছে প্রায় আড়াই হাজারের মতো লাশ হয়তো আমরা তার হাতে তুলে দিয়েছি।’

মোহাম্মদ শরিফের পরিবারের ধারণা, তিনি হয়তো প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বেওয়ারিশ লাশের সৎকার করেছেন। কিন্তু ভারতীয় গণমাধ্যমে এই সংখ্যা ২৫ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে বলা হচ্ছে।

মোহাম্মদ শরিফের এই অসাধারণ কাজের কথা প্রথম জানা যায় ভারতে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ দেওয়ার পর। তবে এই সম্মান তিনি এমন সময় পান যখন তার জীবন শেষপ্রান্তে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপির নেতৃত্বে হিন্দু মৌলবাদীরা ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে অযোধ্যায় ষোড়শ শতকে নির্মিত বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলে। এরপর শুরু হয় দাঙ্গা। সেই  দাঙ্গায় নিহত হন মোহাম্মদ শরিফের ছেলে মোহাম্মদ রইস।


ভারতের রাষ্ট্রীয় সন্মাননা পদ্মশ্রী পাওয়ার পর মোহাম্মদ শরিফকে অভিনন্দন জানান সরকারি কর্মকর্তারা। ছবি: বিবিসি

এই বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে যখন নিখোঁজ হয়ে গেল, তখন আমি তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। একমাস ধরে খুঁজেছি পাগলের মতো। পুলিশ আমাকে বলেছিল, তার লাশ পচে গিয়েছিল। আমরা ওর লাশ দেখিনি। আমরা শুধু তার কাপড় পেয়েছিলাম।’

এদিকে মোহাম্মদ শরিফের স্ত্রী মারা যান। স্ত্রী-ছেলে হারানোর শোক তিনি আজ পর্যন্ত সামলে উঠতে পারেননি।

মোহাম্মদ শরিফ বলেন, ‘আমার মনে হয়, অন্যদের লাশ যেভাবে নদীতে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, আমার ছেলের লাশও হয়তো সেভাবে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আমি ঠিক করেছিলাম নিজের জেলায় কোন বেওয়ারিশ লাশ আমি নদীতে ছুঁড়ে ফেলতে দেব না।’

হিন্দুদের দেহ তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাহ করেন মোহাম্মদ শরিফ। আবার মুসলমানদের লাশ দাফন করেন। তিনি বলেন, ‘যখনই পুলিশ আমাকে বেওয়ারিশ লাশ নেওয়ার জন্য খবর দেয়, আমি সব কাজ ফেলে ছুটে যাই।’

মোহাম্মদ শরিফ বলেন, ‘হিন্দু-মুসলিম, সবাই আমাকে সাহায্য করে। মানুষ আমাকে খাবার দেয়। সম্প্রতি আমার চোখের অপারেশন হয়েছিল। এক অপরিচিত মানুষ এসে আমাকে ২০ হাজার রুপি দিয়ে গেছে।’

হিন্দুদের লাশ তাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাহ করেন মোহাম্মদ শরিফ। ছবি: বিবিসি
 

ইত্তেফাক/জেডএইচ