বিক্রয়কর্মী পদে চাকরি করতে চাইলে

সেলসম্যান মানেই কিন্তু ভ্যাপসা গরমে দরদর করে ঘামতে ঘামতে টাই-এর নট ঠিক করে কলিংবেল বাজানো নয়। এখন সেলস মানেই কিন্তু সেই একঘেয়েমি এবং বিরক্তিও নয় অথবা কেবল বেচুবাবু হয়ে অপ্রিয় হয়ে ওঠাও নয়। বর্তমানে লোভনীয় অংকের স্যালারি, ইনসেনটিভ, কমিশন ইত্যাদি মিলিয়ে সেলস অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস জব হয়ে উঠতে চলেছে। যারা আগামী দিনে এই পেশায় আসতে চান, তাদের জন্য পরামর্শ নিয়ে এই লেখাটি।

 

সেলস বলতে ব্যাপক অর্থে বোঝায় বিক্রয়কে। তা সে দ্রব্যই হোক বা পরিসেবা। যে জিনিসের চাহিদা আছে আধুনিক অর্থনীতিবিদগণ তারই জোগান দেওয়াকে সেলস বলেছেন। ইনফরমেশন সেক্টর এর দাপটে বিক্রয় বা সেলস এক বিশ্বজনীন প্রতিযোগিতার বাজারে এসে পড়েছে। তাই সুনাম অক্ষুন্ন রেখে কোন জিনিসকে কীভাবে ‘বাজারি’ করে তোলা যায়, তা দেখাই সেলস এর সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সেলসম্যানশিপ বলতে যা বোঝায়

সাধারণভাবে আমরা বুঝি, ব্যক্তি বিশেষকে কোন একটি পণ্য ক্রয় করতে রাজি করানোর কলাকৌশলই হলো সেলসম্যানশিপ। শুনতে সোজা মনে হলেও বাস্তবে কিন্তু তা নয়। এই জটিল প্রক্রিয়াকে যারা বাস্তবে রূপ দিচ্ছে তারাই সেলসম্যান বা বিক্রয় কর্মী।

এই পেশায় আসার আগে

যারা সেলসম্যানকেই পেশা হিসেবে নিতে চান তাদের আগাম কয়েকটি ব্যাপার জেনে রাখা দরকার। কারণ সেলস মানেই শুধু জিনিস বা পরিসেবা বিক্রি করা নয়। রয়েছে বিক্রয় সম্প্রসারণ- যা করার জন্য আপনাকে জানতে হবে ফ্রি স্যাম্পলিং কী, ফ্রি গিফট কোথায় দেওয়া হয়, ডিসকাউন্ট কখন দেবেন, এক্সিবিশন ও ফেস্ট এর সাহায্যে কিভাবে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করবেন, এই জাতীয় নানা পদ্ধতি যা আপনার বিক্রি বাড়াতে সাহায্য করবে।

সফল সেলসম্যান হতে হলে যা প্রয়োজনীয়

যে বাজারেই আপনি কাজ করতে চান না কেন আপনার বিশেষ কিছু গুণাবলী থাকা চাই-

মানসিক গুণাবলী :বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, মনোযোগ শ্রোতা, বাকনৈপূণ্য, পরিশালিত বডি ল্যাঙ্গুয়েজ।

সামাজিক গুণাবলী :মিশুকে স্বভাব, সততা, সহানুভূতিশীলতা।

ভুল কিছু ধারণা  

সেলসম্যান হতে হলে অত্যন্ত সুন্দর বা আকর্ষণীয় দেখতে হতে হবে। সেলসম্যান হতে গেলে ইংরেজিতে তুবড়ি ছোটাতে হবে। সেলসম্যান হতে গেলে প্রচুর মিথ্যা বলতে হয়। ভাল সেলসম্যান মানেই সুবক্তা, মনোযোগী শ্রোতা নয়।

মেয়েরা ভাল সেলসম্যান হতে পারে না। মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কেবল কর্মাস ব্যাকগ্রাউন্ড হলে তবেই সেলসম্যান হওয়া যায়। অভিজ্ঞতা ছাড়া সেলস-এর কাজে আসা যায় না।

কাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র

প্রতিনিয়ত বাজারে নানা ক্ষেত্রে সেলস-এর সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন- ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর (ব্যাংকিং, ইন্সিওরেন্স, মিউচুয়াল ফান্ড, শেয়ার বেচাকেনা ইত্যাদি)। কনসেপ্ট সেলিং (কলসালটেন্সি, ম্যারেজ, ব্যুরো, জমি কেনা-বেচা, এডুকেশন কনসালটেন্সি, কেরিয়ার গাইডেন্স প্রভৃতি), ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস বা এফএমসিজি (জাতীয় বা বহুজাতিক সংস্থাগুলোর উত্পাদন যেমন- সাবান, পেস্ট, ডিটারজেন্ট, কসমেটিক জাতীয় দ্রব্য)। ম্যানুফেকচারিং (বড় কলকারখানার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র)।

মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ (যারা বড় বড় কোম্পানিগুলোর ওষুধ, ইনজেকশন, স্যালাইন প্রভৃতি বিক্রি করে)। সফটওয়্যার সেক্টর (বিভিন্ন প্রোগ্রাম, কম্পিউটারের নানা অংশ বা পার্টস, চিপস ইত্যাদি)।

কি ধরনের পদে চাকরি

রিটেল ম্যানেজার, পারচেজিং ম্যানেজার, স্টোর ম্যানেজার, কাস্টমার সার্ভিস রিপ্রেজেন্টেটিভ, ডেটা প্রসেসিং, এক্সিকিউটিভ, ফ্লোর সুপারভাইজার, রিটেল সেল পার্সন জাতীয় পদে চাকরির সুযোগ রয়েছে।

যে সবক্ষেত্র থেকে আসা যায়

সরাসরি সেলস এ আসার জন্য নির্দিষ্ট করে কোনও কোর্স বা ট্রেনিং দেয়া হয় না। বেশ কিছু সংস্থা আছে যারা ম্যানেজমেন্টে ডিগ্রি/ ডিপ্লোমা দিয়ে থাকে। সেলস ও মার্কেটিং এর উপর বেশ কিছু ইনস্টিটিউটে বিবিএ/এমবিএ পড়ানো হয়। যেমন দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ।

সেলস এর ধাপ

ট্রেনি সেলসম্যান থেকে টেরিটরি সেলসম্যান, সিনিয়র টেরিটরি সেলসম্যান, সেলস অফিসার, এরিয়া সেলস ম্যানেজার, সেলস ম্যানেজার, রিজিওনাল সেলস মানেজার থেকে কোম্পানির সিইও পর্যন্ত হওয়া যায়। প্রসঙ্গত বলে রাখা যায় পৃথিবীর বেশির ভাগ কোম্পানির সর্বোচ্চ পদে সেলস থেকেই নির্বাচিত হয়েছে।

হকার কি ভাল সেলসম্যান হতে পারে

প্রতিদিনই চলার পথে বিশেষত ট্রেনে বা বাসে এক শ্রেণীর মানুষকে আমরা জিনিস বিক্রি করতে দেখি। কেউ বলে ‘আইটেম’ কেউ বলে ‘প্রোডাক্ট’। একটা কিনলে তিনটে ফ্রি জাতীয় চটকদার উপস্থাপনে কখনও কখনও চরম বিরক্তির উদ্রেক করে তারা। এদের মধ্যে অনেকে আবার নেগেটিভ অ্যাপ্রোচ করে। সবার বলার ভঙ্গি এক নয়। অনেকে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে গান শোনান। এদের কিন্তু কারও এমবিএ বা বিবিএ ডিগ্রি নেই। প্রচার বা বিজ্ঞাপনের নিত্যনতুন কায়দা কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে এরাই নিয়ে আসে। অথচ চুড়ান্ত পেশাগত জগতে এদের অধিকাংশই ব্যর্থ হয়। কেননা উপস্থাপনের পার্থক্য। গান গাইতে গাইতে আপনার সামনে এসে গায়ে হাত দিয়ে ডেকে আপনার কাছে সাহায্য চাইছে। সে তো একজন সেলসম্যান। সে নিজের গলা বিক্রি করছে। তবে গায়ে হাত দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা মোটেও ইতিবাচক নয়। একটু সরে জায়গা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এদের যাত্রীদের (যারা তার কাস্টমার) প্রতি বক্রোক্তি বা হেয় করার মানসিকতা তাদের ভাল সেলম্যান হতে দেয় না। সুতরাং উপস্থাপনা সর্বদা বিনীত, শালীন এবং সহিঞ্চুতাপ্রবণ হওয়া উচিত।

টার্গেট

অনেকেরই ধারণা সেলস মানেই টার্গেট পুরণ করা। হ্যাঁ টার্গেট থাকবেই এবং অবশ্যই সেটা বছর বছর বাড়তেই থাকবে। বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে টার্গেট ওঠানামা করে। কিন্তু একে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। যে কোন সেলসম্যানের কাছে এটি একটি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ কে গ্রহণ করার জন্য আপনার টার্গেটকে বছরের বিভিন্ন সময়ে করে নিতে পারেন ভাগ। এভাবে দিনের টার্গেট, সপ্তাহের টার্গেট, মাসের টার্গেট। এখানেই কিন্তু একজন সেলসম্যানের সাফল্য লুকিয়ে থাকে।

বেতন যেমন হয়

শুরুতে ৩,৫০০-১০,০০০ টাকা পর্যন্ত হলেও আস্তে আস্তে অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে বাড়বে স্যালারি। আপনার অভিজ্ঞতা আর কোম্পানির প্রোফাইল এই স্যালারিকেই বছর দুই-চার এর মধ্যে পৌঁছে দেবে ১৫,০০০-৩০,০০০ অথবা আরো বেশি। এক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট পড়ে আসারা একটু এগিয়ে। অভিজ্ঞতার মূল্য থাকলেও ফ্রেশারদেরও হতাশ হওয়া উচিত নয়। অনেক বড় বড় কোম্পানিতে সেলস এর কাজে নতুন প্রার্থী নেয়া হয়।