ভাষা দূষণের কবলে!

ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৬৮ বছর পর সেই বাংলায় কতটা স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কথা বলছে এই প্রজন্মের তরুণরা! ইংরেজি কিংবা হিন্দি’র দাপটে কি বাংলা ভাষা আজ বিকৃতির পথে। ভাষা চর্চায় নতুন প্রজন্ম কতটা মনোযোগী? চলুন জেনে আসি বর্তমান প্রজন্মের কয়েকজন প্রতিনিধির কাছ থেকে।

 

‘বাংলার মাঝে ইংরেজি শব্দ বলা এখন যেন একটা ফ্যাশন’

—ইয়াজ মাহমুদ, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

 

মাতৃভাষা বাংলা আজ নানান বিদেশি ভাষার আগ্রাসনে জর্জরিত। সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে যে ভাষাটি তা হলো ইংরেজি। আন্তর্জাতিক ভাষা হওয়ার সুবাদে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিদেশ গমন সব ক্ষেত্রেই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে  ইংরেজির মুখাপেক্ষী হতে হয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে আকৃষ্ট তরুণ সমাজের কাছে বাংলার চেয়ে ইংরেজি অধিক গ্রহণযোগ্য! কথায় কথায় বাংলার স্থলে ইংরেজি বলা কিংবা বাংলার মাঝে মাঝে ইংরেজি শব্দ বলা এখন যেন অনেকটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সংস্কৃতিতে আসক্ত বাঙালির সংখ্যাও অনেক। ফলস্বরূপ হিন্দি ভাষার নেতিবাচক প্রভাবটাও নগণ্য নয়। সংখ্যায় কম হলেও কিছু কিছু তরুণের মধ্যে আজকাল কোরিয়ান, জাপানিজ এসব ভাষার চর্চাও লক্ষণীয়। সব মিলিয়ে দৈনন্দিন কথাবার্তায় এসব বিভিন্ন ভাষার প্রয়োগে ধীরে ধীরে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বিকৃতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুক, মেসেঞ্জারসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে প্রচুর বিকৃত বাংলার ব্যবহার হয়। যার ফলে বাংলা ভাষা স্থায়ী বিকৃতির শিকার হচ্ছে। একাধিক ভাষার চর্চা করা খারাপ নয়। তবে মনে রাখতে হবে, মাতৃভাষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, এর স্থান সবার উপরে।

 

‘শুদ্ধ ভাষার চর্চা তো দূরের কথা, আমরা যেন বিকৃত বাংলাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে চলেছি’

—প্রিয়শ্রী সানা, শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

 

বাংলা ভাষা আজ অনেক উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। পেয়েছে বিশ্ব আসনে মর্যাদা। অথচ আমরা আমাদের হূদয় আসনে বাংলা ভাষাকে কতটা মর্যাদায় স্থান দিতে পারছি? যখনই কোনো বন্ধুকে বলতে শুনি— বইমেলায় আসার কথা ছিল, বাট একটু প্রবলেম হওয়ায় আসতে পারলাম না। এখানে কিন্তু শব্দের স্থানে ‘বাট’ এবং সমস্যা শব্দের স্থানে ‘প্রবলেম’ শব্দ দুটো বেশ দাপটে শ্রুতিকটুর মুকুট পড়ে ঢুকে পড়ল। অথচ আমরা নতুন প্রজন্ম হিসেবে তাতে কোনো আক্ষেপই করলাম না। এভাবে আমরা ইংরেজিকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছি অজ্ঞানে কিংবা সজ্ঞানে! রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতের রক্তে রঞ্জিত বর্ণমালা এ ধরনের বাক্য চয়নের জন্য আমাদেরকে প্রতিনিয়তই ধিক্কার জানায়—আমরা টের পাই না, অনুভব করতে পারি না। অথচ আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালে চীনে তৃতীয় শান্তি সম্মেলনে এবং ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষার জন্য জীবন দেওয়া শহীদদের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। আর আমরা বঙ্গজননীর সন্তান হয়ে প্রতিদিন শুদ্ধ বাংলায় কথা বলা তো দূরের কথা, বিকৃত বাংলায়, বিদেশি ভাষায় কথা বলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে চলেছি।

 

‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাষা বিকৃত করার প্রতিযোগিতা চলছে’

—মো. আশিকুজ্জামান আশিক, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

বিশ্বের অনেক ভাষার নিজস্বতা যখন বিপন্নতার মুখোমুখি সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয়জয়কার সর্বত্র। বিশ্বমানের সাহিত্যভাণ্ডার রয়েছে আমাদের মাতৃভাষায়। বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি মানুষের ভাষা বাংলা।  ভাষার বৈশিষ্ট্য প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল হলেও নতুন প্রজন্মের কারণে বাংলা ভাষা হচ্ছে বিকৃত। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাষা বিকৃত করার প্রতিযোগিতা চলছে। অনেক জায়গায় প্রয়োজন ছাড়াই বাংলা ভাষার পরিবর্তে বিদেশি ভাষাকে স্থান করে দেওয়া হচ্ছে। একটি জাতির সভ্যতার সমৃদ্ধি অনেকটা নির্ভর করে তার ভাষার ওপর। মাতৃভাষার শক্তি জাতিকে করতে পারে ঐক্যবদ্ধ। এ জায়গায় আমরা কখনো আমাদের মাতৃভাষাকে অবহেলা করে এগিয়ে যেতে পারব না। তাই বাংলা ভাষা ব্যবহারে আমাদেরকে আরো সর্তক হতে হবে। ’৫২ দিয়েছে আমাদের নিজস্ব আবেগ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বাধীনতা। ভাষার মাসে জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা। যাদের ত্যাগে আজও অক্ষুণ্ন আমাদের প্রাণের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা।

 

‘তরুণদের বাংলা ভাষার ব্যবহারটা অনেকটা ‘খিচুড়ি’র মতো’

—সাদিয়া সুলতানা প্রত্যাশা, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ভাষা অনেকটা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট্য আর অনেকটা পরিবেশনির্ভর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বীজ ছিল মূলত ৫২’র ভাষা আন্দোলন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সংবিধানে বলা হলো, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। তখন থেকে নথিপত্র, উচ্চশিক্ষা, নিম্ন আদালত, পাঠ্যপুস্তকে বাংলা ভাষা বিস্তার লাভ করতে লাগল। একসময় দেখা গেলো, ইংরেজির উপর আমাদের দখল কমে আসছে। বাংলাকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে আমরা বহির্বিশ্ব থেকে ছিটকে পড়ছি। কয়েক যুগ আগে যে বাঙালি ভাষাকে রক্ষার জন্য প্রাণ দিতে এসেছিল, তারাই আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিজ সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পাঠাতে লাগল। কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশে বেড়ে গেলো ইংরেজি মাধ্যম স্কুুল। ফলশ্রুতিতে বাংলা ভাষা দিন দিন হচ্ছে কঙ্কালসার। বর্তমান প্রজন্মের বাংলা ভাষার ব্যবহারটা অনেক সময় ‘খিচুড়ি’র সাথে তুলনা করা হয়। বাংলার সাথে ইংরেজি ও অন্যান্য শব্দের সংমিশ্রণে কথা বলা এখন যেন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে! আমাদেরকে অন্য ভাষার উপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে ধীরে ধীরে। মায়ের ভাষাকে রক্ষার আগে ভাষার ইতিহাস জানতে হবে এবং শুদ্ধ বাংলা ও ভাষা প্রসারের জন্য সবাইকে একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।

 

‘শুদ্ধ বাংলা বর্তমান প্রজন্মের কাছে যেন অমাবস্যার চাঁদ’

—মেহেদী আনোয়ার জাওয়াদ, শিক্ষার্থী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

 

বর্তমানে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইংরেজি ভাষা বা বিদেশি ভাষার ব্যবহার বেড়েই চলছে। কেননা ইংরেজি হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক ভাষা এবং বহু স্থানে এর প্রয়োগের উপকারিতাও রয়েছে। ফলে বাংলা ভাষা তার মর্যাদার অসন যেমন হারাচ্ছে, তেমনি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা চর্চাও ক্রমশ কমে যাচ্ছে। শুদ্ধ বাংলা বর্তমান প্রজন্মের কাছে যেন অমাবস্যার চাঁদ। বর্তমান প্রজন্ম শুদ্ধ বাংলায় কথা না বলে বরং বাংলার সাথে ইংরেজি ভাষার সংমিশ্রণে ভাষাকে বিকৃত করছে। শুদ্ধ বাংলা ঠিকমতো না বলার বিশেষ কারণ হচ্ছে বাংলা ভাষার সঠিক চর্চার অভাব। নতুন প্রজন্ম ভাষাটাকে নিজেদের মতো করে একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপ দিয়েছে—যেটা তারা স্বাচ্ছন্দ্যমতো ব্যবহার করতে পারে! কিন্তু এই ব্যঙ্গাত্মক রূপের ফলে আমাদের ভাষা তার নিজের গুরুত্ব হারাচ্ছে। আগামীতে হয়তো বাংলা ভাষা একটি বীভত্স রূপ নিয়ে হাজির হবে এই প্রজন্মের জন্য। তাই আমাদের এখন থেকেই দরকার নতুন প্রজন্মকে বাংলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাভাষার সম্মান রক্ষার্থে সবাইকে শুদ্ধ বাংলা চর্চা করতে হবে।

 

‘বর্তমানে ‘বাংলিশ’ নামক ভাষার এক বিকৃত রূপ প্রচলিত হয়েছে’

—সোহাগী আক্তার, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা ভাষার একটি গৌরবময় ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত নিশ্চিত হয়নি সর্বত্র এর ব্যবহার। এখনো উচ্চশিক্ষা এবং চাকরির ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বাংলা ভাষার অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ দিন দিন বেড়েই চলছে। বাংলা ভাষায় অবাধে বিদেশি ভাষার অনুপ্রবেশে বিকৃতি ঘটছে। প্রচলিত হয়েছে ‘বাংলিশ’ নামক ভাষার এক বিকৃত রূপ। তরুণ প্রজন্মের বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলার অশুভ প্রবণতা আজ সর্বত্র বিরাজমান। আমি মনে করি, যে কোনো ভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তারে গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রেডিও, টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ‘জগাখিচুড়ি’ ভাষা ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে দিনদিন। মাতৃভাষার নিজস্বতা রক্ষার্থে আমাদের প্রত্যেককে তাই আরো অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে, যেন তরুণ প্রজন্ম বাংলা ভাষার ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে।