‘লোকসানের সম্মুখীন হয়েছি, তবুও হাল ছাড়িনি’

>> সাইফুল ইসলাম

 

স্কুল-কলেজের গণ্ডি পার হলেই একজন শিক্ষার্থীর গন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর। ঠিক সেখান থেকেই সে নিজের ভবিষ্যতকে খুব কাছ থেকে দেখতে শুরু করে। পেশাগত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকেই এ সময় পড়াশোনার পাশাপাশি খুঁজে নেন অর্থ-উপার্জনের ছোট ছোট পথ। শুরুটা খুবই সামান্য কিছু দিয়ে হলেও এটিই বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর কর্মজীবন শুরুর প্রথম ধাপ। তেমনি উদ্যোগ বা কিছু করার ভাবনা থেকে  বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই বন্ধু মিলে প্রতিষ্ঠাকরেন অনলাইনভিত্তিক জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘পরী’। পরীতে রয়েছে ছেলে-মেয়েদের পোশাক ও মেয়েদের জুয়েলারি। পরীর প্রতিষ্ঠাতা শারমিন আক্তার। তার সঙ্গে রয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা ইঞ্জিনিয়ার মো. ইমতিয়াজ আহমেদ।

দুই বন্ধু মিলে কিছু করার ইচ্ছা থেকেই পরীর পথচলা শুরু। অনলাইনে একটি-দুটি করে পোশাক বিক্রি, সেই লাভের টাকা দিয়ে আরো নতুন পোশাকের সংগ্রহ বাড়ানো—এভাবেই একটু একটু করে বেড়ে ওঠা পরীর। এখন পরীর পোশাক তৈরি করা হয় তাদের নিজেদের কারখানাতেই। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কারচুপির ড্রেস, অ্যামব্রয়ডারি ড্রেস, সুতি থ্রি-পিস, পার্টি ড্রেস, গাউন, পাকিস্তানি-ইন্ডিয়ান ফোর-পিস, মেয়েদের জুয়েলারি আইটেম, ছেলেদের শার্ট, পাঞ্জাবি, মেয়েদের ব্যাগ ও পার্স। আর এগুলো তৈরি করতে সেই কারখানাতে কাজ করছেন প্রায় ৩০ জন কারিগর। এছাড়া ভারত ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পণ্যও বিক্রি করে পরী। প্রতিটি পোশাকের মূল্য সাধারণত পাঁচশ’ থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ সাত হাজার টাকা পর্যন্ত হয় থাকে।

কেন এই পেশায় এসেছেন জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠাতা শারমিন আক্তার বলেন, ‘টিউশনি করাতে গিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছিল আর সেই সঙ্গে এনার্জিও। আবার টিউশনির সামান্য উপার্জিত অর্থ দিয়ে এই ব্যয়বহুল শহরে তেমন কিছু করাও যাচ্ছে না। তখনই চিন্তা করতে লাগলাম, এমন কিছু করতে হবে যেন সময় বাঁচবে এবং পড়ালেখারও কোনো ক্ষতি হবে না। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৫ সালে অনলাইন ব্যবসায় আসা। শুরুটা ছিল খুবই অল্প পুঁজি দিয়ে। তবে এখন অনলাইন এবং অফলাইন—দু’ভাবেই ব্যবসা চালু আছে।

পরীকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখেন জানতে চাইলে ইমতিয়াজ বলেন, ‘স্বপ্ন দেখি দেশের একটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডে পরিণত হবে ‘পরী’। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় পরীর শো-রুম থাকবে। আর সেখান থেকে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা যেন তাদের বাজেটের মধ্যে পছন্দের প্রডাক্টগুলো সহজেই নিতে পারে—এটা নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ। ইমতিয়াজ জানান, কাজ করতে গেলে বাধা-বিপত্তি আসবেই। তিনি বলেন, ‘তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের বাধা-বিপত্তি আসেনি। কিছু কিছু সময়ে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছি, তবুও হাল ছাড়িনি। ভেবেছি, হতাশ না হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যবসায় মানেই লাভ-লোকসানের একটি জায়গা। লাভ যেমন থাকবে, মাঝে মধ্যে লোকসানও হতে পারে’।

তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠাতা শারমিন বলেন, ‘নতুন উদ্যোক্তা এবং স্টুডেন্ট অবস্থায় অনেকেই অনেক কিছু করতে চান। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হলো টাকার অভাবে কিছু করতে পারে না। আমি বলব, তাদের জন্য উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা খুবই সহজ। তবে মনে রাখা চাই, উদ্যোক্তা হয়ে গড়ে উঠতে অবশ্যই দুটি জিনিস লাগে—যার প্রথমটি হলো আগ্রহ এবং দ্বিতীয়টা সাহস। অধ্যয়নরত অবস্থায় লেখাপড়ার পাশাপাশি আমরা অনেকেই পার্ট-টাইম কাজ করে থাকি। অন্য একজনকে নিজের শ্রম দিয়ে থাকি। তা না করে নিজেই কিছু করলে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায়। তরুণ-তরুণীদের উচিত এমন ইচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসা’।

শিক্ষাজীবন শেষ করে শারমিন ও ইমতিয়াজ দুজনই এখন নিজ নিজ ক্ষেত্রে চাকরি করছেন। বর্তমানে শারমিন আক্তার পেশায় একটি গার্মেন্টসের মার্চেন্ডাইজার এবং ইঞ্জিনিয়ার মো. ইমতিয়াজ আহমেদ একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছেন। তাই বলে থেমে নেই ‘পরী’। পরীর কাজগুলো তারা দুই ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন। শারমিন কমিউনিকেশন ও বিক্রিটা দেখেন, ইমতিয়াজ দেখেন অ্যাকাউন্ট, কারখানা এবং প্রডাক্ট  ডেলিভারি। অন্যদিকে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের আরো ৮টি দেশ থেকে ড্রেসের অর্ডার আসে পরীর।