বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে বর্তমানে যে ক’টি নাটকের দল নাট্যমান সমুন্নত রেখে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে তাদের মধ্যে ‘বটতলা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বটতলা মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দারের নির্দেশনায় তাদের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক নাটক ‘ক্রাচের কর্নেল’। নাটকটির ৫০তম মঞ্চায়ন হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি মহিলা সমিতি মঞ্চে। এর নানা দিক নিয়ে নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দারের সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম
মঞ্চে কর্নেল তাহেরকে নিয়ে নাটক করার কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল কি?
২০১৪ সালে বটতলা মঞ্চে নিয়ে আসে আফ্রিকান নাটক ‘দি ট্রায়াল অফ মাল্লাম ইলিয়া’। সেই নাটকটি ছিল আফ্রিকার একটি দেশের ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক, হত্যা, ক্যু, পরিবারতন্ত্র—এই সমস্ত বিষয় নিয়ে। যা আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে একেবারে তারই প্রতিবিম্ব। দুটি আলাদা দেশ কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির কি দারুণ মিল। আমরা সেই সময় সেই নাটকের গবেষণার জন্য পাঠ্য হিসেবে পড়েছিলাম শাহাদুজ্জামানের ‘ক্রাচের কর্নেল’ উপন্যাস। উপন্যাসটি পড়ে আমরা সবাই অনেক উত্তেজনা বোধ করি। তখন থেকেই ঠিক করি বটতলার পরবর্তী নাটক হবে অর্থাত্, মাল্লাম ইলিয়ার পরের নাটক হবে ক্রাচের কর্নেল। দলের দুইজন নাট্যকার সৌম্য সরকার ও সামিনা লুত্ফা নিত্রা নেমে পড়লেন উপন্যাস থেকে নাটক রচনায়। আমার নির্দেশনায় শুরু হয় ক্রাচের কর্নেল’র উপন্যাস থেকে মঞ্চযাত্রা।
কর্নেল তাহের অনেক রাজনৈতিক দলের কাছেই বিতর্কিত। সেদিক থেকে নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বাধা পেয়েছেন কি-না?
বটতলার ক্রাচের কর্নেল বাংলাদেশের ইতিহাসের একরকম পাঠ। নাটকে আমরা ইতিহাস বলার থেকে অনেক বেশি প্রশ্ন করেছি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার এক দুঃসহ সময়কে। এই প্রজন্মের সাথে সেই সময়ের ঘটনার আদান প্রদান করেছি। কাজেই আমাদের কর্নেল তাহেরকে আমরা দেখেছি একজন মানুষ হিসেবে, যার মাঝে দ্রোহ ছিল, স্বপ্ন ছিল, একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় ছিল, কিছু ভুল ছিল, কিছু অমীমাংসিত কাজ ছিল। আমরা কর্নেলকে বুঝতে চেষ্টা করেছি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে; যেখানে বিতর্ক আছে, আছে ভাবনার নতুনত্ব। রাজনীতিতে ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই, রাজনীতির বিভিন্ন সময় ও ব্যক্তির কাজ নতুন নতুন ইন্টারপ্রিটেশান তৈরি করে। সেক্ষেত্রে তাহের বিতর্কিত হয় প্রেক্ষাপট, সময়, স্থান বিবেচনায়। বাংলাদেশের একই ইতিহাসে কারো ভূমিকা সমাদৃত আবার কারো কাছে তা বিতর্কিত। ইতিহাস কখনো একটা হয় না। এটা প্রতি মুহূর্তে নির্মিত হয়। নতুন করে, নতুন মানুষের দ্বারা। একই মানুষকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে একেবারে বিপরীত ভাবনায় প্রস্ফুটিত হতে দেখা গেছে। একই মানুষের রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার আগের দিন ও পরের দিনের একেবারে উল্টো রথে চলার ঘটনা এদেশে বিরল নয়। কাজেই কোনো চরিত্রই বিতর্কের বাইরে নয়। তবে হ্যাঁ, নাটকটির অনেক সমালোচনা হয়েছে। কোনো একটি দলের অন্ধ রাজনৈতিক কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাটক দেখে বলেছিলেন, ‘এই নাটক সরকারের উচিত বন্ধ করে দেওয়া’। ইতিহাস তো কোনো স্থির বিষয় নয়। এটি নানা রকম হয় নানান পারস্পেক্টিভ থেকে। কে কোন পারস্পেক্টিভ বা পক্ষ থেকে বলছি, সেটা আসলে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ব্যাখ্যা ভুল হতেই পারে, নতুন ব্যাখ্যা তৈরি হতেই পারে তবে ঢালাওভাবে সেটাকে ‘বিকৃত’ বলা যাবে না। ইতিহাস বলায়, শোনায়—গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে, আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে। তবেই না হবে উন্নত পাঠ।
ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায় বটতলার সবগুলো নাটকই রাজনৈতিক। এর বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?
বটতলা সময়ের সাথে থাকে। দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে। শিল্পের কাজ শুধু মানুষকে বিনোদন দেওয়া নয়, ভাবনার খোরাকও শিল্প থেকে আসবে—বটতলা এই নীতিতে বিশ্বাসী। সমাজের, দেশের, সময়ের যে কোনো প্রয়োজনে বটতলা কথা বলে, সেটা রাজনৈতিক তো হবেই। সময়ের ঠিক কথাটি বললে কারো না কারো তো গাত্রদাহ হবেই। সেই অর্থেই বটতলার নাটক রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, তবে তা ইচ্ছাকৃত নয়।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক কোন দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করেন?
বর্তমানে মঞ্চ নাটক একটা ন্যারেটিভ নিয়ে কাজ করছে। মঞ্চে সবাই একই রকম কথা বলছে। সবাই যেন কেমন রাজার গুণগান প্রচারেই ব্যস্ত। ৬০ থেকে ৯০-এর দশকে বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক ছিল উপেক্ষিত রাষ্ট্রের কাছে। তখন অনেক নাট্যসাহিত্য রচিত হয়েছে, নাটকের নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের যত কাছাকাছি থিয়েটার গেছে, কমে গেছে তার তেজ, হারিয়ে গেছে তার কঠিন ভাষা। একটা মিনমিনে উত্তেজনায় চলছে নাটক রচনা ও পাঠ। এভাবে চললে দর্শক শূন্যের কোঠায় ঠেকবে। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা আমার অধিকার, সুযোগ নয়—থিয়েটার কর্মীদের এই ভাবনায় উদ্দীপিত হতে হবে এবং এই শিল্পকে বাঁচাতে হবে।
বটতলার পরবর্তী মঞ্চ নাটক নিয়ে যদি বলেন...
বটতলার পরবর্তী নাটক কাঙ্গাল হরিনাথকে নিয়ে লিখেছেন নাট্যকার মাসুম রেজা। এটি নির্দেশনা দিচ্ছেন ইউসুফ হাসান অর্ক। এখন পর্যন্ত নাট্যকার নাটকটির নাম দিয়েছেন ‘এডিটর মহাশয়’। এই নাম পরিবর্তন হতে পারে। মহড়া চলছে। মার্চের শেষে বা এপ্রিলের শুরুতে নাটকটি মঞ্চে আসবে বলে আশা করছি।