ভাষা আল্লাহ প্রদত্ত এক মহা নেয়ামত

‘সব বাঙালি মাতৃভাষায় কয় যে মনের কথা, বাংলা মায়ের মুখের কথায় জুড়ায় মনের ব্যথা।’ মহান আল্লাহ মানুষকে যত ক্ষমতা দিয়েছেন সেগুলোর অন্যতম হলো মানুষের কথা বলার ক্ষমতা। এ ক্ষমতাই মানুষকে অন্য সকল প্রাণী থেকে পৃথক ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন—‘দয়াময় আল্লাহ, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনি তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ভাব প্রকাশের ক্ষমতা বা কথা বলার ক্ষমতা।’ (সুরা আর-রাহমান, আয়াত :১-৪) পৃথিবীর সকল মানুষ যেমন মহান আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি, তেমনি সকল ভাষাও আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি। সুতরাং কোনো ভাষাকে অন্য ভাষা থেকে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাময়, প্রিয় বা ঘৃণ্য ভাষা বলে মনে করার কোনো অবকাশ নেই। প্রত্যেক মানুষের কাছে নিজের পিতা-মাতা ও দেশের যেমন মর্যাদা ও গুরুত্ব, তেমনি গুরুত্ব ও মর্যাদা তার মাতৃভাষার। মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন—‘স্বজাতির ভাষা বা মাতৃভাষা ছাড়া আমি কোনো রাসুলই প্রেরণ করিনি।’ (সুরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪) তাইতো পৃথিবীর মানুষ, প্রকৃতি ও অন্যান্য সকল সৃষ্টির বৈচিত্র্যের ন্যায় ভাষার বৈচিত্র্যও আল্লাহর কুদরতের মহা-নিদর্শন।

মাতা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি এ তিনটি পরম শ্রদ্ধার বস্তু। মাতৃভাষা বাংলা মোদের খোদার সেরা দান। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ার পিছনে রয়েছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রফিক উদ্দীন আহমদ, আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত, আব্দুস সালামসহ অনেকে শহিদ হন এবং আরো অনেক আহত হন। নিজের কিংবা দেশের সম্পদ বা স্বীয় অধিকার আদায়ের জন্য কথা বলে, দাবি আদায়ের চেষ্টা করে যদি কেউ নিহত হন, তবে সে ব্যক্তি শহিদ হন বলে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। তাই এদেশের মানুষের মাতৃভাষায় অধিকার রক্ষার জন্য কথা বলে বা সংগ্রাম করে যারা নিহত হয়েছেন তাদের মৃত্যু শহিদী মৃত্যু; যা বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয়। এ সকল শহীদদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব হলো প্রথমত তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, দ্বিতীয়ত জান্নাতে তাঁদের উচ্চ মাকামের জন্য দোয়া করা এবং তৃতীয়ত মাতৃভাষার সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দেওয়া। চতুর্থত আমাদের প্রিয় মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করে আন্তর্জাতিক মর্যাদার স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দেওয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।

ভাষা আল্লাহ প্রদত্ত মহা নেয়ামত। ব্যক্তি বা জাতীয় জীবনে কোনো নেয়ামত অর্জনে যাঁদের অবদান রয়েছে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ; যা ইসলামের নির্দেশ। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম দিক হলো ভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের কথা স্মরণ করা, স্বীকৃতি দেওয়া, আলোচনা ও প্রশংসা করা। বিভিন্ন হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘কেউ তোমাদের কোনো উপকার বা কল্যাণ করলে তার প্রতিদান দিবে এবং তার জন্য দোয়া করবে।’ (বুখারী, আস-সহীহ, খণ্ড-৬, পৃ. ২৬৩১) অন্য হাদিসে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয় সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ। সে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ যে মানুষের প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ।’ (আহমদ, আল-মুসনাদ, খণ্ড-৫, পৃ. ২১২)। তাই কাউকে কিছু প্রদান করলে সে তাকে -এর প্রতিদান দিবে। যদি প্রতিদান দিতে না পারে তবে সে তার গুণকীর্তন ও প্রশংসা করবে। যে ব্যক্তি উপকারীর গুণকীর্তন ও প্রশংসা করল সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। আর যে উপকারীর উপকারের কথা গোপন করল সে অকৃতজ্ঞ। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায় যে, কোনো অমুসলিম কাফিরও কোনো কল্যাণ করলে রাসূলুল্লাহ (স) তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রশংসা করতেন এবং তাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে স্মরণ করতেন।

ইসলামী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে বাংলা ভাষায় অন্তর্ভুক্ত করে এটাকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। মুসলিম উম্মাহর অন্যান্য ভাষা, যেমন—আরবি, ফার্সী, তুর্কি, সোহেলী, মালয়ী ইত্যাদি ভাষায় পারদর্শী হয়ে এসব ভাষায় রচিত মূল্যবান গ্রন্থাদি বাংলায় অনুবাদ করতে হবে। তাফসীর, হাদীস, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য সকল শাখায় বাংলা অনুবাদ কর্মের বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলতে হবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে মাতৃভাষার মতো মহা নেয়ামতের যথার্থ সম্মান করার, ভাষার অপপ্রয়োগ ও অপভাষা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক প্রদান করুন। আমীন।

—লেখক :এম. ফিল গবেষক ও শিক্ষক, জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট