গাইবান্ধা-২: নৌকা ও ধানের শীষেই ভোটের মূল লড়াই

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই পরিবর্তন হচ্ছে ভোটার ও ভোটের মাঠের প্রেক্ষাপট। গণসংযোগ, প্রচার-প্রচারণা, উঠান বৈঠক ও সভাসহ নানা কার্যক্রমে ব্যস্ত গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের প্রার্থীরা। গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত গাইবান্ধা-২ (সদর) আসন। এ আসনটিতে এবার মোট ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এখন মাঠে গণসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মহাজোট সমর্থিত আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাহাবুব আরা বেগম গিনি (নৌকা), ঐক্যফ্রন্ট সমর্থিত বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রশিদ সরকার (ধানের শীষ) ও বাম গণতান্ত্রিক জোট প্রার্থী সিপিবির মিহির ঘোষ (কাস্তে)। তারা এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন বলে ভোটারদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

এ আসনে অন্য প্রার্থীরা হলেন- ন্যাশনাল পিপলস পার্টির জিয়া জামান খান (আম), ইসলামী ঐক্য জোটের মাওলানা যুবায়ের আহমদ (মিনার), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আল আমিন (হাতপাখা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মকদুবর রহমান (সিংহ)।

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ পাঁচবার, জাতীয় পার্টি দুইবার, স্বতন্ত্র দুইবার ও বিএনপি প্রার্থী একবার নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ১৯৭৩, ১৯৭৯ ও ২০০১ সালের আওয়ামী লীগের লুৎফর রহমান, ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র আবদুর রউফ মিয়া, ১৯৮৮ সালের (৩ মার্চ) স্বতন্ত্র সাবেক সেনা কর্মকর্তা আজগর আলী খান, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় পার্টির আবদুর রশিদ সরকার, ১৯৯৬ সালের (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিএনপির সাইফুল আলম সাজা, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে মাহাবুব আরা বেগম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আরো পড়ুন: পটুয়াখালী-৪: আসন দখলে মরিয়া আওয়ামী লীগ, বিএনপি চায় পুনরুদ্ধার

এর মধ্যে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মাহাবুব আরা বেগম গিনি এক লাখ ৬৬ হাজার ৭২৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির শফিকুর রহমান পান ৪৮ হাজার ৬৮২ ভোট। ওই সালে মোট ভোটার ছিল দুই লাখ ৬৪ হাজার ৩০৩ জন।

স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আসনটি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দখলেই ছিল। মাঝখানে জাতীয় পার্টি (জেপি) আওয়ামী লীগের এই দুর্গটি দখল করে নিয়েছিলো। কিন্তু পুণ:রায় তা উদ্ধার করেছে মহাজোট প্রার্থী বর্তমানে জাতীয় সংসদের হুইপ মাহাবুব আরা বেগম গিনি। এছাড়া সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি জেলায় প্রথম মহিলা সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন।

এবারেও নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে তিনি মাঠে ময়দানে জনসংযোগে ভোটারদের কাছে তার অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট প্রার্থনা করছেন। বর্তমানেও এই আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি বেশ মজবুত। এছাড়া তার নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে আছে জোটভুক্ত জাতীয় পার্টি (এ), ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ অন্য শরিক দলগুলো।

অপরদিকে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রশিদ সরকার জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করে সদ্য বিএনপিতে যোগদান করে দলীয় মনোনয়ন পান। প্রথমে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ায় স্থানীয়ভাবে দলের একাংশ তাকে মেনে নিতে পারেননি। কারণ তাদের নিজস্ব দলীয় প্রার্থী ছিলো। কিন্তু ক্রমেই আব্দুর রশিদ সরকার দলের সকলের প্রার্থীতে পরিণত হয়ে গেছেন। দলে বিভেদ দূর করে সবাই এক প্লাটফরমে এসে রশিদকে জয়ী করতে একসাথে কাজ করছে এখন। আব্দুর রশিদ দু’বার সংসদ সদস্য ছাড়াও গাইবান্ধা পৌরসভার কমিশনার, চেয়ারম্যান ও ২০০৯ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে এখানকার বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াত থেকে দলের জেলা সেক্রেটারি মো. আব্দুল করিম। এছাড়া দুই বারের সাবেক সংসদ সদস্য জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আব্দুর রশিদ সরকার জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করে সদ্য বিএনপিতে যোগদান করে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী হিসাবে এই আসনে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে আব্দুর রশিদের নিজস্ব কিছু ভোট এসে যোগ হবে ধানের শীষে। অন্যদিকে জামায়াতের ভোটও চলে আসবে এই প্রতীকে।

১৯৮৩ সালে মজিদ খানের গনবিরোধী শিক্ষানীতির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ পর দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি প্রার্থী মিহিরি ঘোষ তার পরিচ্ছন্ন ইমেজ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হয়ে উঠেছেন। স্থানীয় বিভিন্ন আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকায় বিগত দুটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ব্যাপক ভোটও তিনি টানতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি বহু আগেই নির্বাচনী মাঠে গণসংযোগে নেমে তার প্রচার -প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।

তাই স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এ আসনে মাহাবুব আরা বেগম গিনি (নৌকা) ও আব্দুর রশিদ সরকারের (ধানের শীষ) মধ্যে হাড্ডা হাড্ডি লড়াই হবে। তবে পিছিয়ে নেই বাম গণতান্ত্রিক জোট প্রার্থী সিপিবি’র মিহির ঘোষ (কাস্তে)।

মাহাবুব আরা বেগম গিনি বলেন, আশা করছি দেশের ও গাইবান্ধার সার্বিক উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে ভোটাররা আবারো তাকে নির্বাচিত করবে।

জেলা বিএনপি সভাপতি অধ্যাপক ডা. মইনুল হাসান সাদিক বলেন, প্রথমদিকে বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রশীদকে নিয়ে দলে দ্বিধাবিভক্তি থাকলেও এখন আর তা নেই। সবাই ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থীকে জয়ী করতে মাঠে কাজ করছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তার জয়ের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মাহবুবর রহমান জানান, এ আসনে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭৮ জন ভোটার এবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

ইত্তেফাক/বিএএফ