রম্য গল্প
/ তারেকুর রহমান
ছাত্রজীবন থেকেই তোফা বেশ যুক্তি দিয়ে কথা বলে। যে কারণে বন্ধুরা তার নাম দিয়েছে যুক্তিবাদী। তোফা এসব উল্টাপাল্টা নাম না দেওয়ার যুক্তি পেশ করে। তার যুক্তি শুনে বন্ধুরা হাতেনাতে প্রমাণ করে দেয় কেন তাকে যুক্তিবাদী বলা হয়। তোফা হতাশ হয়ে পড়ে। এদেরকে যত যুক্তিই শোনানো হোক না কেন, এরা কখনোই সত্যটা স্বীকার করবে না। যে কোনো ব্যাপারে তোফার যুক্তি দেওয়া বেশ বিরক্তিকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার অযৌক্তিক কথাগুলোর পেছনেও কোনো না কোনো যুক্তি রয়েছে। তোফার আরেকটা গুণও রয়েছে। তবে একে গুণ না বলে দোষ বলাটাই শ্রেয়। তোফা উপস্থিত মিথ্যা গল্প বানিয়ে ফেলতে পারে। যেখানে যেরকম বললে চলবে ঠিক সেরকমই গল্প ফেঁদে বসে। কিছুদিন আগেও তোফাকে বেশ প্রাণবন্ত, চঞ্চল দেখা যেতো। হুট করে কেমন যেন মনমরা হয়ে গেছে। অনেক অনুসন্ধান করে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তোফা আনমনা কেন? জিজ্ঞেস করলে তোফা একটু চিন্তা করে উত্তর দেয়।
—দেখো, মনমরা হয়ে থাকাটা কোনো অপরাধ না। তুমি চাইলে হাসতে পারো। আবার চাইলে কাঁদতেও পারো। ইচ্ছে হলে মনমরা হয়েও থাকতে পারো। আসলে আমার এরকম হয়ে থাকতে ভালো লাগছে।
তোফার এরকম যুক্তিরই আশা করছিল সবাই। কোনো প্রশ্ন করলে সোজা উত্তর না দিয়ে ব্যাঁকা-তেড়া উত্তর দিবেই সে। এটা তার মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছে। আরো কয়েকদিন যাওয়ার পর জানা গেলো তোফার প্রিয় প্রেমিকা প্রাক্তন হয়ে গেছে। এ শোকে সে পাথর হয়ে গেছে। তোফার এখন মানসিক অবস্থা খুবই খারাপ। বন্ধুদের অবশ্যই তার পাশে থাকা উচিত। সবাই মিলে তোফার বাসায় হাজির। সবাই ভাবল—তোফা হয়ত কান্নাকাটি করছে। একজন তো বলেই উঠল—এ শোক থেকে সে সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবে না। তোফার বাসায় এসে সবার ভুল ভাঙল। তোফা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। মনে হয় বহুকাল এমন ঘুম আর দেয়নি সে। তার পাশে বসে বহুবার ডাকার পরও কোনো সাড়া-শব্দ নাই। তোফার গায়ে হাত দিয়ে অনেকক্ষণ নাড়ানোর পর সে ঘুম থেকে জাগল। এ অসময়ে বন্ধুদের দেখে কিছুটা অবাক হলো সে।
—হঠাত্ তোদের আগমনের কারণ কি জানা যাবে?
—জানা তো যাবেই।
—তো কী কারণে আসলি তোরা?
—ভাবলাম প্রেমিকা হারানোর শোকে তুই বিধ্বস্ত, তাই তোর পাশে থেকে একটু বুদ্ধি-ভরসা দিতেই এসেছি।
—আমার কি বুদ্ধির অভাব পড়ছে নাকি যে তোদের কাছ থেকে নিতে হবে।
বেশ কিছুক্ষণ এরকম বাক্য বিনিময়ের পর তোফার কাছে জানতে চাওয়া হলো, কেন তার প্রেমিকা তাকে ছেড়ে গেলো। প্রশ্ন শুনে তোফা নড়েচড়ে বসল। একটু বুদ্ধিজীবী ভাব নিয়ে বলল, ‘তার চলে যাওয়ার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে’।
—কী সেই যুক্তি।
—আমি বেকার। আমাকে সে কীভাবে গ্রহণ করবে?
—আগেও তো বেকার ছিলি, তখন কীভাবে গ্রহণ করেছিল?
—আগের সঙ্গে বর্তমান তুলনা করলে হবে না। সে ভালো করেই বুঝে ফেলেছিল যে, আমার বেকারত্ব সহজে দূর হবে না। তাই সে চম্পট দিয়েছে। অবশ্য...।
—অবশ্য কী?
—অবশ্য তার চলে যাওয়ায় আমারই লাভ হয়েছে।
—কীভাবে?
—আমার পকেটে যে অল্প টাকাপয়সা থাকত তা তার পেছনে ইনভেস্ট করতে হতো। দিনশেষে ফলাফল শূন্য হতো। তাহলে আমার ইনভেস্ট করে লাভ কী হলো? আর এত ঘ্যানর ঘ্যানর ভালো লাগে না। হয়ত কিছুদিনের মধ্যে আমিই তাকে বয়কট করতাম, কিন্তু সে-ই আগেভাগে বুঝতে পেরে হাওয়া হয়ে গেলো।
সবাই জানে তোফা এমন এমন যুক্তি দিবে যে তার কোনো ক্ষতিই হয়নি। তোফা হঠাত্ গম্ভীর হয়ে গেলো।
—একটা আইডিয়া মাথায় এলো।
—কি সে আইডিয়া?
—আসলে ওর পেছনে থাকতে থাকতে নিজেকে নিয়ে ভাবতেই পারিনি।
—এসব প্যাঁচাল বাদ দিয়ে আইডিয়াটা কি সেটা বল।
—ভাবলাম, একটা রেস্টুরেন্ট দেবো।
—ভালো উদ্যোগ।
—আসলে এই বেকারকাল আর ভালো লাগে না। চাকরি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যাচ্ছি। তাই ভাবলাম রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নামব।
—আমরা তোকে এপ্রেশিয়েট করি।
—তবে আমার প্ল্যান একটু ব্যতিক্রম। এটি যেনতেন রেস্টুরেন্ট হবে না।
—কী রকম হবে?
—এই রেস্টুরেন্ট হবে কচুরিপানা রেস্টুরেন্ট।
তোফার কথা শুনে সবাই হো হো করে হাসতে লাগল।
—ভালো ভালো, কাস্টমার নিশ্চয়ই গরু হবে।
তোফা রাগ হয়ে বলল, কি যা তা বলছিস, গরু কেন হবে?
—কচুরিপানা তো গরুই খায়; মানুষকে তো খেতে দেখিনি কখনো।
—আরে পাগল, একটু ভালোভাবে চিন্তা কর। গরু কচুরিপানা খায়, মানুষ গরু খায়। আলটিমেটলি মানুষ কচুরিপানা খায়। আর গরু যদি কচুরিপানা খেতে পারে তবে মানুষের খেতে অসুবিধা কী?
—অসুবিধা আমাদের আছে। তোর যদি না থাকে তাহলে তুই খেয়ে নিস। আমরা গেলাম।
তোফা কিছুটা হতাশ হলো। এসব বন্ধুদের সে কোনোভাবেই সহজে কিছু বুঝাতে পারে না। কিন্তু সে হেরে যাওয়া মানুষ না।
ছোটখাটো একটা রেস্টুরেন্ট চালু করল তোফা। নাম দিয়েছে কচুরিপানা রেস্টুরেন্ট। কচুরিপানা দিয়ে নানান আইটেম রান্না করা আছে। কচুরিপানার রোস্ট, কচুরিপানা ভর্তা, কচুরিপানা ভাজি, মাছ দিয়ে কচুরিপানা রান্না সহ আরো নানান আইটেম। রেস্টুরেন্টের সবগুলো মেনুতে কচুরিপানা রয়েছে। প্লেট সাজাতেও কচুরিপানা ব্যাবহার করা হয়েছে। তোফার বিশ্বাস খুব ভালো চলবে তার রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্টের বাইরে মানুষের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। তোফা ভাবল, তার কাস্টমার এলো বুঝি। হঠাত্ ‘হাম্বা হাম্বা’ শব্দ শোনা গেলো। তোফা বের হয়ে এলো। এসে দেখে মানুষ গরু নিয়ে এসেছে তার রেস্টুরেন্টে। একজন তো বলেই উঠল, গরুর জন্য রেস্টুরেন্ট খুব ভালো হইছে। আমার গরুটা কিছুই খাইতে চায় না। এবার যদি কিছু খাওয়ানো যায়।
তোফা বেশ অবাক হলো। কাদের জন্য এই রেস্টুরেন্ট, আর কারাই-বা এর কাস্টমার! g