তপন কুমার দাস, বড়লেখা
রোদভরা সকাল। অতিথিরা বইমেলার উদ্ব্বোধন করেছেন। বইপ্রেমীদের উপস্থিতি তখনও কম। লাল সবুজ রঙের পোশাক পরে ৬ শিশু এসেছে। স্টল ঘুরে ঘুরে নেড়েচেড়ে দেখছে বই। নিয়েছে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ। একসঙ্গে অনেক বই দেখে তাদের মন ভরে ওঠে। কিছু বই কিনেছে ওরা। বইমেলায় আসতে পেরে তাদের মুখে তৃপ্তির হাসি। মন ভালো করা এই দৃশ্য বড়লেখা বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণের। বই ও গানের টানে সকাল হতেই বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণ একটু একটু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠতে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতিও।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের বড়লেখার বড়লেখা বালিকা উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণটি ছিল এ রকমই বইয়ের ঘ্রাণে প্রাণের মেলায় উত্সবমুখর। জেলার প্রত্যন্ত এই জনপদে বড়লেখা নজরুল একাডেমি দ্বিতীয়বারের মতো একদিনের এই বইমেলা আয়োজন করে। সঙ্গে ছিল বসন্ত ও পিঠা উত্সব।
দেখা গেছে, বইয়ের স্টলে উপচেপড়া ভিড়। স্টলের সামনের অংশ ফাঁকাই হচ্ছে না। পাশেই মঞ্চে চলছে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সেখানেও ভিড়ের কমতি নেই। ভিড় করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে শুধু শুধু ভিড় নয়, কমবেশি সকলেই বই দেখছেন, বই কিনছেন। এক সময় সবার হাতেই ঝুলতে দেখা গেছে বইয়ের প্যাকেট। দুপুরের দিকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। অনেকেই এসেছে স্কুলের পোশাক পরে। পোশাকের বৈচিত্র্য দেখেই বোঝা যায় এরা উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের বইটি তুলে নিয়েছে হাতে। এসেছেন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজের শিক্ষকরা। তারা নিজের জন্য, প্রতিষ্ঠানের জন্য কিনে নিয়েছেন বই। দক্ষিণ চান্দগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তানিয়া দাস একগাদা বই কিনেছেন। কিন্তু অত টাকা সঙ্গে নেই। তাই সবচেয়ে পছন্দের বইগুলো বাছাই করে প্রায় আড়াই হাজার টাকার বই কিনে নিলেন।
আয়োজনের বিষয়ে বড়লেখা নজরুল একাডেমির উপদেষ্টা জুনায়েদ রায়হান রিপন বলেন, ‘বড়লেখায় দ্বিতীয়বারের মতো বইমেলার আয়োজন হলো। বই থেকে অনেকেই দূরে চলে গেছেন। মানুষকে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনতে আমরা এই বইমেলার আয়োজন করেছি। যাতে এলাকার লোকজন সৃজনশীল বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। বই কেনেন, বই পড়েন। বইয়ের জগতকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এই মেলার আয়োজন। মানুষের উপস্থিতি, আগ্রহ আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে।’
সকালে মেলা উদ্বোধন করেন বড়লেখা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নজরুল একাডেমির সভাপতি দীপক রঞ্জন নন্দী। উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও একাডেমির উপদেষ্টা মো. তাজ উদ্দিনের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামীম আল ইমরান, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার উদ্দিন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূসরাত লায়লা নীরা, বড়লেখা পৌরসভার মেয়র আবুল ইমাম মো. কামরান চৌধুরী, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা চিকিত্সক রত্নদ্বীপ বিশ্বাস, বড়লেখা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অরুন চক্রবর্তী, জুড়ি টি এন খানম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অরুন চন্দ্র দাস, জুড়ি শাহ নিমাত্রা কলেজের অধ্যক্ষ জহির উদ্দিন, বড়লেখা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. নিয়াজ উদ্দীন, নজরুল একাডেমির উপদেষ্টা জুনায়েদ রায়হান রিপন, উপদেষ্টা ও সাংবাদিক লিটন শরীফ প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বড়লেখা নজরুল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মিলন দে।
অনুষ্ঠান মঞ্চে বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এরমধ্যে ছিল অরুন চন্দ্র দাসের কাব্যগ্রন্থ শিশির বিন্দু ও ভাটির দেশে মাটির ঘ্রাণ এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ সবার ওপরে মানুষ, মৃণাল কান্তি দাসের কবিতার বই একদিন ছেড়ে যাব ও শিশুতোষ বই কিচ্ছা শোনার ইচ্ছা, হাসনা বেগমের কাব্যগ্রন্থ নন্দিত সকাল, কাওসার হামিদের গল্পগ্রন্থ যাপিত জীবনের কানাগলি, শাহেদ আহমদের কাব্যগ্রন্থ আর কত দূর, রুমানা ফারজানা লিনুর উপন্যাস রুমানা, সাইফুল্লাহ মনসুর ইছহাক ও সারিয়া আবেদীন ইতুর যৌথ ছোটগল্পের বই তোমার দেওয়া আমার কোনো নাম ছিল না এবং সবচেয়ে কনিষ্ঠ লেখক দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিবেকানন্দ দাসের গল্পের বই সুখে শোকে বাস। এই লেখকদের সবার বাড়ি বড়লেখাতে। এছাড়া লেখক আলমগীর শাহরিয়ারের কবিতার বই নিদাঘ দিনের গানেরও মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
বক্তারা বলেন, ফেসবুক ও ইন্টারনেটের কারণে বইপড়া কমে গেছে। এ রকম একটা সময়ে উপজেলা পর্যায়ে নজরুল একাডেমি এই বইমেলা করে প্রমাণ করেছে এখনও বইয়ের চাহিদা কমেনি। বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ আছে। মানুষ বই পড়তে চায়, শিল্প-সাহিত্যের আনন্দ পেতে চায়। মানবিক উত্কর্ষতা বাড়াতে নতুন প্রজন্মকে বইয়ের কাছে ফেরাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার চালু করতে হবে।
বইমেলা ও বসন্ত উত্সবকে ঘিরে বেশকিছু পিঠার স্টল বসে। সেখানেও আগ্রহীরা ভিড় করেন। নিরাপদ সড়ক চাই বড়লেখা উপজেলা শাখাকেও উত্সবে নিরাপদ সড়ক সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বইমেলা ও উত্সব। এই পুরো সময়টুকু যেমন বই বেচা-বিক্রি হয়েছে।
বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা। চোখের সামনে পশ্চিম আকাশের রাঙা আভার সঙ্গে সূর্যটি মিলিয়ে গেল। তখনও মেলায় উপচাপড়া ভিড়। মেলা মঞ্চে চলে শিল্পী সম্পা চন্দের ধামাইল গান। এ যেন উত্সবের রেশ ধরে রাখার চেষ্টা। এর মধ্য দিয়ে ভাঙতে শুরু করে আনন্দের উত্সব। আয়োজকরাও বই গোছাতে শুরু করেন। শুরু হয় আরেকটি বছরের অপেক্ষা।