মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক মারা গেছে। মঙ্গলবার দেশটির কায়রো হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তদার বয়স হয়েছিলো ৯১ বছর। মিসরের সাবেক এই স্বৈরশাসক স্ত্রী সুজানে ও দুই ছেলে জামাল, আলাকে রেখে গেছেন। প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক মিসরের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শাসক।
হোসনি মোবারক ১৯২৮ সালের ৪মে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম মুহাম্মদ হোসনি সাইদ মুবারক। তার বাবা ছিলেন বিচার মন্ত্রণালয়ের একজন ইন্সপেক্টর। মুবারক মিশরের জাতীয় সামরিক অ্যাকাডেমি, বিমানবাহিনী অ্যাকাডেমি এবং মস্কো-র ফ্রুনযে জেনারেল স্টাফ অ্যাকাডেমিতে শিক্ষালাভ করেন।
১৯৮১ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মিসরের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপালন করেন তিনি। ১৯৭৫ সালের উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং সাদাত নিহত হবার পর ১৯৮১ সালের ১৪ অক্টোবর মুবারাক মিশরের রাষ্ট্রপতি হন। মোহাম্মদ আলীর পরে রাজনীতিতে প্রবেশের পূর্বে মুবারাক মিশরীয় বিমান বাহিনীর একজন কমান্ডার হিসেবে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
আরও পড়ুন: শিশুর জন্য খাবার কিনে বাড়ি ফেরা হলো না বাবার
মিশরীয় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার আল সাদাতের অধীনে তিনি বেশ কিছু সামরিক পদে দায়িত্বপালন করেন। এর মধ্যে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি উপ-যুদ্ধমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি মিশরের উপ-রাষ্ট্রপতি হন।
১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর সাদাতকে হত্যা করা হলে মুবারাক মিশরের রাষ্ট্রপতি হন। ক্ষমতায় এসে তিনি একটি অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন প্রকল্প শুরু করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে ইসরায়েলের সাথে সাক্ষরিত শান্তিচুক্তি ধরে রাখার ব্যাপারেও অনমনীয় ছিলেন। মিশরের সাথে ইসরায়েলের শান্তিচুক্তির ফলে অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলে তিনি তার অনেকটাই সামাল দেন। তিনি বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতি ‘ইতিবাচক নিরপেক্ষতা’র নীতি গ্রহণ করেন। ১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাসে তার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নির্বাচনে জিতলে তিনি পুনরায় মিশরের রাষ্ট্রপতি হন।
অর্থনৈতিক সমস্যা এবং ইসলামী মৌলবাদের মত অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকলেও মুবারাক ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নেন। ১৯৮৮ সালে তিনি এ ব্যাপারে কথা বলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। ১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত দখল করলে জাতিসংঘের ইরাকের বিরুদ্ধে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে মুবারাক তা সমর্থন করেন, ইরাকের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আরব লীগকে মত দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে প্রায় ৩৯ হাজার সেনা সরবরাহ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে যুদ্ধ-পরবর্তী পদক্ষেপগুলিকে সমর্থন দেন।
১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাসে সংসদীয় নির্বাচনের ঠিক আগে মুবারক সরকার মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে জঙ্গী ইসলামী দলদের মদদ দেবার অভিযোগ আনেন। মুসলিম ব্রাদারহুডের বহু নেতাকর্মীকে এর জের ধরে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, মুবারাক শান্তিপ্রিয় বিরোধীদেরও নির্মূল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। নির্বাচনে মুবারাকের দলের বিশাল জয় হয় এবং ১৯৯৯ সালে মুবারাক চতুর্থবারের মত ৬ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হন।
২০০০-এর দশকে মুবারাক চরমপন্থী ইসলামীদের দমনের ধারা অব্যাহত রাখেন এবং কেবল দর্বল বিরোধীদেরই দল গঠনের অনুমতি দেন। তিনি ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার নিন্দা জানান। একই সময়ে দেশের মধ্যপন্থী ইসলামী দলগুলি ইসলামী শরিয় অনুসারে দেশ চালানোর জন্য চাপ দিতে থাকে। ২০০৫ সালে ফিলিস্তিনে অনুষ্ঠিত অপেক্ষাকৃত উন্মুক্ত নির্বাচনের পর মিশরীয়রা নিজদেশেও অধিকতর গণতন্ত্রের প্রত্যাশা প্রকাশ করে।
২০০৫ সালে মুবারাকের চতুর্থ মেয়াদ শেষ হয়ে আসলে কিছু দল সংবিধানের সংশোধন কামনা করে। ২০০৫ সালের মে মাসে সংবিধানে সংশোধন আনা হয় এবং মিশরের ইতিহাসে প্রথমবারের মত সরাসরি বহুদলীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মুবারাক ৮৫ শতাংশর বেশি ভোট পেয়ে পঞ্চমবারের মত ছয় বছর মেয়াদের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু বিরোধী প্রার্থীরা তার বিরুদ্ধে ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনেন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে মুবারাকার নিয়ন্ত্রণের ফলে তাদের প্রচারে বিঘ্ন ঘটছে বলে দাবি করেন।
২০১১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভের ১৮ দিনের মাথায় ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন হোসনি মোবারক। আরব বসন্তের সময় তার নির্দেশে ২৩৯ বিক্ষোভকারীকে নিরাপত্তা বাহিনী সদস্যরা গুলি চালিয়ে হত্যা করেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়। ফলে ২০১২ সালে দেশটির নিম্ন-আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
কিন্তু ওই রায়ের বিরুদ্ধে দু'বার উচ্চ আদালতে আপিল করেন হোসনি মোবারক। এছাড়া সরকারি তহবিল তসরুফের অভিযোগেও তিন বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেন তিনি। ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পান হোসনি মোবারক।
ইত্তেফাক/বিএএফ