দেলওয়ার বিন রশীদ
নাদ বা কল্লোল সৃষ্টিকারী প্রবহমান জলরাশিই ‘নদী’। মানুষের জীবন এক নদী। কবি-সাহিত্যিকরা মানুষের মনকে নদীর সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। তবে নদী চলমান তার আপন বেগ নিয়ে নিজ গন্তব্যে। নদী সদা প্রবহমান, নদী ছুটে চলে তার ক্ষুদ্র স্রোত নিয়ে সমুদ্রের বিপুল বক্ষে নিজেকে সঁপে দিতে। যেন সমুদ্র তার প্রেমিক, নদী তার প্রেমিকা। কান্ত দর্শনে ছুটে যায় কান্তা মোহনা সঙ্গমে। অসাম্প্রদায়িক ও উদারতার সবচেয়ে বড়ো নিদর্শন নদী। ধনী, গরিব, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলে নদীবক্ষে স্নান করে পবিত্রতা অর্জন করে। নদীর জলে ওজু করে নামাজ আদায় করে মুসল্লিরা। নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। বাংলার ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে শত শত নদী। বাংলাদেশের প্রবাহিত প্রায় সব নদ-নদীই আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করেছে। হিমালয় থেকে উত্পত্তি হয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমা অতিক্রম করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সর্বশেষ বঙ্গোপসাগরে মিশে গেছে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় এদেশের নদীর সংখ্যা অনেক বেশি। একসময় বাংলাদেশের ছোট-বড়ো ১১০০ নদী ছিল। বর্তমানে নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো হলো—ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, যমুনা, তিস্তা। সব নদী মেঘনা হয়ে সাগরে মিলেছে। প্রবহমান এসব নদী জালের মতো সতত বঙ্গীয় বদ্বীপকে জলধারায় করছে সুখসিক্ত। বাঙালির বহমান জীবনধারার সঙ্গে সদা সর্বদা নদী ও নদীর কল্লোল জড়িয়ে আছে। নদী বাঙালির গানে কবিতায় স্বপ্নে মিশে আছে। নদীকে নিয়ে বাঙালির জীবনের অনেক ভাঙাগড়া কতনা কাহিনি রয়েছে। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের বহু ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা। নদী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। বাঙালির জীবনযাপনে জড়িয়ে থাকা এই যে নদী, এই নদীকে নিয়ে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অতিমূল্যবান ও তথ্যবহুল গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের নদী-নৌযান ও নাবিকের তথ্য-উপাত্ত’। এটি লিখেছেন—এমদাদুল হক বাদশা।
উল্লেখ্য, এমদাদুল হক বাদশা দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। নানা বিষয়ে প্রবন্ধ, নিবন্ধ লেখার পাশাপাশি তিনি কবিতাচর্চাও করে থাকেন। ইতোমধ্যে তার বেশ কয়টি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে, যা পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। অবশ্য তিনি একজন নিভৃতচারী প্রচারবিমুখ লেখক। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট কুমিল্লা জেলাধীন তিতাস উপজেলার চরকুমারিয়া গ্রামে লেখক ও সাহিত্যিক এমদাদুল হক বাদশা জন্মগ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ ৪০ বছর বিআইডব্লিউটিএ-তে কর্মরত ছিলেন। বিআইডব্লিউটিএ-তে তিনি কারিগরি পুলের পরিচালকের দায়িত্ব দীর্ঘসময় পালন করেন। তার দীর্ঘ কর্ম ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে আলোচ্য গ্রন্থটি লিখতে। এতে বাংলাদেশের নদ-নদী সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য ও উপাত্ত ছাড়াও নদ-নদী সম্পর্কে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার তথ্যসহ নানা বিষয় আলোকপাত করা হয়েছে। গ্রন্থের প্রথমেই রয়েছে বাংলাদেশের নদীর উত্স ও ঐতিহাসিক পটভূমিভিত্তিক পরিচিতি। এই গ্রন্থটি পাঠে জানা যাবে, চীন, ভুটান, নেপাল ও ভারতে ১.৫৫ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার অববাহিকার পানি নিষ্কাশনের আধার হচ্ছে বাংলাদেশ। গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-মেঘনা ও তাদের শাখা নদীগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৬ মিলিয়ন কিউসেক পানি প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। ফলে ১,৪৪,০০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় আড়াই বিলিয়ন টন পানি বহন করছে এসব নদী। গ্রন্থটিতে রয়েছে বাংলাদেশের নদ-নদীর দীর্ঘ তালিকা। এতে নদীগুলোর উত্সমুখ, পতিত মুখ ও দৈর্ঘ্যসহ কোন জেলা উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ৩১৩টি নদীর বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে গ্রন্থে, বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তে অভিন্ন নদী ৫৭টি। সর্বমোট নদীর দৈর্ঘ্য ১৬,৮২৫.৫৫ কিলোমিটার। এই গ্রন্থে আরো রয়েছে বাংলাদেশের পুরাতন জেলাভিত্তিক নদ-নদীরও তালিকা। প্রতিটি জেলার নদীগুলোর নাম এতে সন্নিবেশিত হয়েছে—যা পাঠককে প্রতিটি জেলার নদীগুলোর সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেবে। যেমন, বৃহত্তর ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশালসহ সুন্দরবন অঞ্চলের খাল, গাঙ ও নদীর বিবরণ সন্নিবেশিত হয়েছে। নদীর বিভিন্ন ধারা, জীবিকা ও ক্রম পরিবর্তনশীলতা সম্পর্কে আলোকপাত গ্রন্থটিতে রয়েছে। তাছাড়া নদী সম্পর্কে প্রচারিত ও লোকমুখে মুখে প্রচলিত প্রবাদ ও নানা মূল্যবান বাণী এতে রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া, সুরমাসহ অনেক নদীর ঐতিহাসিক তথ্য এতে সন্নিবেশিত হয়েছে। রয়েছে বাংলাদেশের নদী পরিচিতির ভৌগলিক বিবরণ, যা অত্যন্ত তথ্যবহুল ও মূল্যবান। নদী সম্পর্কিত আগ্রহ মেটাতে বইটি সহায়ক হবে। নদীর নাব্যতা হ্রাস করা ও প্রতিকারের ব্যবস্থা, প্রতিকারের উপায়ও এতে উল্লেখ রয়েছে। যার ফলে গ্রন্থটি বাংলাদেশের নদী ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ সম্পর্কিত একটি অতি মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে সব মহলে সমাদৃত হবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষার্থীদের অত্যাবশ্যকীয় পাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে—একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বাংলাদেশের নদী ও নৌপথের উন্নয়নে এই গ্রন্থের তথ্য-উপাত্ত, আলোচনা ও দিকনির্দেশনা সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস।
প্রকাশক :নয়া প্রবাহ