নূরুল করিম
এবারের বইমেলায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য ভবন বিশাল এক উপন্যাস নিয়ে এসেছে। ৩২৬ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি লিখেছেন কবি ও কথাশিল্পী আরিফ মঈনুদ্দীন। যার ইতোমধ্যে কবিতা, গল্প-উপন্যাস মিলিয়ে ২২টির মতো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকদের জন্য সব থেকে সুখের বিষয় হলো আরিফ মঈনুদ্দীনের লেখা গদ্য সম্পর্কে প্রয়াত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের মূল্যায়ন। আরিফের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অপ্সরা’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ অল্প কথায় চমত্কার ভূমিকা লিখে দিয়েছেন ওই বইটির। তিনি লিখেছেন, ‘আরিফ মঈনুদ্দীনের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। লেখককে আন্তরিক অভিনন্দন। আমার সৌভাগ্য—তিনি আমাকে তাঁর গল্পগুলো আগেই পড়তে দিয়েছিলেন। আমি আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে পড়েছি।
আরিফ মঈনুদ্দীনের গদ্য চমত্কার। কাহিনি তৈরির কলাকৌশলও তিনি ভালো জানেন। লেখকের প্রধান যে গুণ—চারপাশের মানুষের প্রতি মমতা, তা তাঁর আছে। কাজেই গদ্যের কঠিন ভূমিতে তাঁর পদচারণা সহজ ও স্বাভাবিক হওয়ারই কথা। তাঁকে অভিনন্দন। তাঁর হাতে সোনার ফসল ফলুক এই শুভ কামনা।’
বিশাল ক্যানভাসে লেখা এই উপন্যাসটি পড়ে আমাদের কণ্ঠেও হুমায়ূন আহমেদের কথার প্রতিধ্বনিই থেকে থেকে বেজে যাচ্ছে। ঘটনার ঘনঘটা এই উপন্যাসের পাঠককে চুম্বকের মতো টেনে ধরে রাখবে। কাহিনি তৈরির কলাকৌশলে পারদর্শী আরিফ মঈনুদ্দীন একটির পর একটি ঘটনাকে যেভাবে মালার মতো গেঁথেছেন, তা পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখবে নিঃসন্দেহে। একটি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পাঠক নাওয়া-খাওয়া ভুলে বইতে ডুবে থাকবেন এটাই প্রতিপাদ্য।
উপন্যাসের নায়ক জন্মপরিচয়হীন। যদিও শেষপর্যন্ত তার জন্মপরিচয় উদ্ঘাটিত হবে। তবে অনেক চড়াই-উতরাই তাকে পার হতে হবে। এক নিঃসন্তান দম্পতির ঘরে মানুষ হওয়া নায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে অনার্স মাস্টার্স পাশ করেছে। এখানে পড়ালেখার এক ফাঁকে সতীর্থ একটি মেয়ের সঙ্গে তার ভাব হয়। শুধুমাত্র জন্মপরিচয় নেই বলেই প্রাক্তন কেবিনেট সচিব তার এই মেয়েকে নায়কের সঙ্গে বিয়ে দেননি। নায়ক মনের দুঃখে আত্মহত্যার হাত থেকে বেঁচে নিজের অজান্তেই জুরানপুর চলে আসে। জুরানপুর আসার পর এখানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে আধুনিকতার নান্দনিক স্পর্শ তাকে মুগ্ধ করে। এই মুগ্ধতাই তাকে এখানে স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের ইংরেজি শেখানোর কাজে ব্যাপৃত করে। প্রাসঙ্গিকভাবে এসে যায় এই চমত্কার পরিবেশের স্থপতির নাম, তার পারিবারিক ঐতিহ্য, নিজের এবং পরিবারের অবদানের কথা। ৩২৬ পৃষ্ঠার দীর্ঘ উপন্যাসের পরতে পরতে বারবার উঠে আসে এই ঐতিহ্যবাহী ভূঁইয়া পরিবারের প্রাণপুরুষের নাম। তিনি মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া।
জুরানপুর নামের এই গ্রামে স্কুল-কলেজ, মাদ্রসা, এতিমখানা, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাস নিয়ে ৩৩টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা প্রতিষ্ঠার মূলে তার অবদান অনস্বীকার্য। এখানে যে সুন্দর একটি পরিবেশ গড়ে উঠেছে সেই পরিবেশই উপন্যাসের নায়ক শামীম জামানকে চরম এবং পরমভাবে আকৃষ্ট করেছে। এই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে আরো একটি বিষয় আছে, তা হলো এতিমখানা এবং মাদ্ররাসা। কেননা নায়ক শামীম জামানের মনটা এতিমখানার আবহের সঙ্গে দারুণভাবে অনুভূতিপ্রবণ।
এই উপন্যাসে সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে আমাদেরকে বেশ কিছু বার্তা দেওয়া হয়েছে। যেমন—মানুষ জন্মিলেই মানুষ নয়—মানুষ হতে হয়। কুড়িয়ে পাওয়া শামীম এমন এক পরিবারের হাতে পড়েছে, যারা তাকে সত্যিকার একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। শামীমের জীবন একটি সঠিক দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যা তাকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করে। নায়িকা সানজানার সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হলেও সে এই অবনতির ঘটনাকে পাত্তা দিয়ে বড়ো করেনি। ফলে একসময় শামীমের চরিত্রের মাহাত্ম্য তারা টের পায়।
নায়িকা সানজানার বাবা প্রাক্তন কেবিনেট, সচিব জীবনে এক পয়সা ঘুষ খাননি। এটাও একটা শিক্ষা যা তিনি পৈতৃকসূত্রে পেয়েছেন। অনৈতিক কোনো কাজ তিনি করেননি। কেন করেননি বা তাকে করতে হয়নি—তা এই উপন্যাসের একটি চমত্কার বিষয় হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।
‘জুরানপুরের গল্প’ উপন্যাসের গদ্যে আরিফ মঈনুদ্দীন যে সাবলীলতা উপহার দিয়েছেন, তা পাঠকদের কাছে উপভোগ্য হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। নায়কের জীবনের উত্থান-পতন-উত্থানের সঙ্গে পাঠক-পাঠিকারা একাত্ম হয়ে যাবেন এই আশা করাই যায়। লেখক যখন পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখার মতো অবস্থার সৃষ্টি করেন, তখনই সার্থকতা তার পায়ে চুমু খায়। এর সঙ্গে বাস্তবের নানা সঙ্গ-অনুষঙ্গ যুক্ত হয়ে যে মহাসড়ক নির্মাণ করে সেই সড়কে লেখকের হাত ধরে তার পাঠক-পাঠিকারা হেঁটে চলে এবং সারাজীবন একসঙ্গে হেঁটে হেঁটে জীবন উপভোগ করতে চায়। তাই তো পাঠকরা এমন কাউকে খোঁজেন অর্থাত্ এমন লেখককে খোঁজেন যারা পাঠকদের রসাস্বাদনে ভূমিকা রাখতে পারেন। এই মর্মে বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি ও ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সাহিত্য রসের ব্যাপার। তাত্ত্বিক বিচারে দেখা যাবে অনেক বইয়ের মধ্যে অনেক বড় বড় কথা আছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত রসের সৃষ্টি হলো না বলে তার পাঠযোগ্যতা থাকে না এবং একসময় তা হারিয়ে যায়। কাজেই সাহিত্যের শেষ কথা হচ্ছে রসের সৃষ্টি’।
সুনীল বাবুর কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমরা বলতে পারি—লেখক আরিফ মঈনুদ্দীনের ‘জুরানপুরের গল্প’ উপন্যাসটিতে আমরা পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধের যে বৈচিত্র্য লক্ষ করি, তা এই সাহিত্যকর্মটিকে আলাদা মাহাত্ম্য উপহার দিয়েছে। সুতরাং গদ্যের কঠিন ভূমিতে তার পদচারণা যে সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে তা আমরা ইতোমধ্যে টের পেয়ে গেছি। লেখককে পাঠকদের পক্ষ থেকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। বইটির অত্যন্ত তাত্পর্যমণ্ডিত দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন মাসুম রহমান। বইমেলায় বিশ্বসাহিত্য ভবনের প্যাভিলিয়ন নম্বর ২৪-এ বইটি পাওয়া যাচ্ছে।
প্রকাশক :বিশ্বসাহিত্য ভবনের