আজাদ রহমান
পর্ব ৬
গান গাওয়ার জন্য তবলা বাজানোর জন্য হারমোনিয়ামে সহযোগিতার জন্য এমনকি কাউকে গান তুলে দেওয়ার জন্য শিক্ষকরা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এইভাবে শিক্ষকদের সহযোগিতায় আমার ব্যক্তিগত শিক্ষা অনেক সমৃদ্ধ হতো। বাইরে থেকে যেসব গুণী শিল্পী আসতেন তাঁদের সঙ্গেও সহযোগিতা করার সুযোগ আমি পেতাম। শিক্ষকবৃন্দ বিষ্ণুপুর ঘরানার শিল্পী হওয়ায় আলাপ জোড়সহ রাগরাগিণীর উপস্থাপনায় শুদ্ধতা সেই সময় থেকে আমার মধ্যেও সঞ্চারিত হতে থাকে। শিক্ষকবৃন্দ বিষ্ণুপুর ঘরানার, স্বাভাবিক কারণেই ধ্রুপদ, খেয়াল এবং লঘু উচ্চাঙ্গসংগীতের অন্যান্য ধারার বৈশিষ্ট্য ও চলন সম্পর্কে আমি অতি সচেতন হয়ে উঠি। সেই সময় সংগীতচর্চায় বর্ধমানের পরিবেশ অনুকূল ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যাত্রা, লেটো, বাউল এবং নানান ধরনের লোকসংগীত ছাড়াও বোম্বে, দিল্লি, কলকাতার উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী, বিখ্যাত কাওয়ালরা বর্ধমানের বড়োবাজার অঞ্চলে রাজবাড়ির আশেপাশে নানান ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। এই বৈচিত্র্যপূর্ণ সংগীতের একান্ত ভক্ত হিসেবে সংগীতের বিশালতাকে আমি উপলব্ধি করতে থাকি। এমনকি বর্ধমানের মহরম অনুষ্ঠানে আগত কলকাতার ব্যান্ডপার্টির বাজনা আমাকে খুবই আকর্ষণ করত। পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র ব্রাশ ইনস্ট্রুমেন্টের বিশাল দলের সঙ্গে আলী হোসেনের ক্ল্যারিওনেটের রাগাশ্রিত ধুন সুরের কী জাদু বিস্তার করতে পারে, এমনটি আর কোথাও কখনো শুনিনি। এইসব সংগীতের বৈচিত্র্যপূর্ণ আঙ্গিক, উপস্থাপনা ও সুরের সমুদ্রে আমি প্রতিনিয়ত অবগাহন করেছি। এসব মনে হলে আমি আমার জীবন ধন্য বলে মনে করি।
সেই প্রভাবেই পরবর্তীকালে ভারতে নির্মিত ‘মিস প্রিয়ংবদা’ ছায়াছবিতে আমার সংগীত পরিচালনায় ভারতের সুবিখ্যাত ক্ল্যারিওনেট শিল্পী রাজেন দরফদারকে আমি নিয়েছিলাম। তিনি সানন্দে রাজি হয়েছিলেন। ভারতের এই বিখ্যাত শিল্পীর বাজনা সংগীতে এক নব সংযোজন।
আমাদের গ্রামের বাড়িতে বহু সাঁওতাল কাজ করত বিশেষ করে বর্ষাকালে ধান রোপণের সময় এবং পৌষ মাসে ধান কাটার সময়। তাদের গান-বাজনার আমি ছিলাম অনুরাগী। তাই বাংলাভাষী অঞ্চলের লোকসংগীত, ছড়া ও ছোটো নাগপুরের সাঁওতালদের ঝুমুরসহ তাদের নিজস্ব গানের প্রতি আমি খুব আকর্ষণবোধ করতাম। মাদলের তালে তালে এক ধরনের মদ্য ‘হাঁড়িয়া’ পান করে তালে তালে নৃত্য করত তারা। সত্যপীর, পালা কীর্তন, কৃষ্ণযাত্রা, ভাদু অনুষ্ঠান বছরের বিভিন্ন সময়ে লেগেই থাকত। শিবের গাজনের সময় আমরা, আমার নানাবাড়ি যেতাম। নানাবাড়ি ছিল কবি কালিদাস রায়ের জন্মস্থান কড়ুই গ্রাম। কয়েক দিন ধরে শিবের গাজনের উত্সব হতো। হিন্দু মুসলমান সকলে মিলেমিশে শিবের গাজনে অনুষ্ঠিত যাত্রা, লেটো, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন অনুষ্ঠান উপভোগ করতাম।
আমার এক খালা ছিলেন নিঃসন্তান বিধবা। অতি অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে হয় এবং ষোলো-সতেরো বছর বয়সেই স্বামী মারা যান। তিনি আর বিয়ে করেননি। আমার নানার কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তাই পিতার সেবা-শুশ্রূষার জন্য নিজের বাবার সংসারে সেই খালা থাকতেন। আমার নানা ছিলেন দীর্ঘজীবী—তাঁর সুখ-দুঃখ, রোগ-শোক সকল সময় খালা দেখাশোনা করতেন। যখন বর্ধমানে থেকে আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, একদিন সকালে খবর পেলাম নানা মারা গেছেন। বর্ধমান-কাটোয়া একটি ট্রেন চলাচল করে। এই ট্রেনে চড়ে বর্ধমান থেকে আমি কৈচড় স্টেশনে নামলাম। স্টেশন থেকে চার-পাঁচ মাইল পথ হেঁটে আমি নানাবাড়িতে গেলাম, পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর। গিয়ে দেখলাম নানার লাশ গোসল দেওয়া হচ্ছে। মৃত নানাকে দেখতে আসা সকল অতিথিকে খালা শান্তভাবে বসতে অনুরোধ জানাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় সকল দায়িত্ব খালা ধীরস্থির থেকে অত্যন্ত তত্পরভাবে পালন করছেন। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা কান্নাকাটি করছেন। কিন্তু সেই খালা শান্তভাবে কর্মদায়িত্ব পালন করে চলেছেন। যেহেতু নানা শতায়ু ছিলেন, সেই কারণে গ্রাম্য লোকাচার হিসেবে কবর দেওয়ার দিনে গোরখানা অর্থাত্ ঐ দিন সকলকে আপ্যায়নের রীতি প্রচলিত ছিল। আমার খালা তাঁদের গ্রামের মানুষ ও ভিন্ন গ্রাম থেকে আসা লোকজনের জন্য মাংসসহ উন্নতমানের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। দাফন শেষে খাওয়াদাওয়া শেষ হলো।
খালা সকলের খাওয়াদাওয়া তদারকি শেষে ঘরে ফিরে হঠাত্ করে কাঁদতে বসলেন। আমরা সান্ত্বনা দিলেও খালার কান্না থামানো সম্ভব হলো না বরং আরো বেড়ে গেল। বেশ রাত পর্যন্ত কান্না চলল। নানার স্নেহভাজন এক হিন্দু ভদ্রলোক এসে খালাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘মা তুমি তো সবই করেছ, তুমি এত কষ্ট পাচ্ছ কেন? বাবার জন্য যা যা করার প্রয়োজন, যেভাবে সেবা শুশ্রূষা করা দরকার এমনকি মৃত্যুর পরে যে সব আচার-অনুষ্ঠান করার কথা তার কোনোটাতেই তুমি ত্রুটি রাখনি।’ তখন খালা আরো জোরে কাঁদতে থাকলেন। কেঁদে কেঁদে যা বললেন তাতে বোঝা গেল—গোরখানার আহার শেষে কোনো এক ব্যক্তি দুঃখ করে তাঁকে জানিয়েছেন, তাঁর পাতে যথাযথভাবে মাংস পড়েনি, শুধু হাড় পড়েছিল। সেই দুঃখে খালার বিলাপ, তিনি বারবার বিলাপ করতে থাকেন—হায় আল্লাহ আমি এত করেও সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারলাম না কেন?
নানার বন্ধু বয়স্ক হিন্দু ভদ্রলোক শ্রী সত্য সাহা খালাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘যারা এখানে ওখানে খেয়ে বেড়ায়, তারা শুধু এভাবে বদনাম করে। যাঁরা এত মানুষকে খাওয়ান তাঁরা জানেন এ ধরনের ভোজন-উত্সবে সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায় না। জীবনেও সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায় না।’
আমরা সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহানারার বাপের জন্য আত্মত্যাগের কথা জানি। কিন্তু আমার দেখা আমার খালার আত্মত্যাগ কোনো অংশেই কম ছিল না।
গুরু সংগীতাচার্য শ্রী তারাপদ চক্রবর্তী এবং আজাদ রহমান মিস ‘প্রিয়ংবদা’ ছায়াছবির গান রেকর্ডিং উদ্বোধন অনুষ্ঠানে