এক বিকালে আহাদ সাহেবের খুব শ্বাস কষ্ট শুরু হল। উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের সাথে হাঁপানি থাকায় আত্মীয়স্বজন ভাবলেন হয়ত তার হাঁপানি বেড়ে গেছে। চিকিত্সক এসে রক্ত পরীক্ষার উপদেশ দিয়ে ওষুধ এডজাষ্ট করে দিলেন। রক্ত পরীক্ষা করতে করতে তিন দিন চলে গেল। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট থেকে জানা গেল তাঁর নতুন করে হার্ট এটাক হয়ে হার্ট সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা হারিয়েছে। ২ দিন পর চিকিত্সা চলাকালে বাসায় আহাদ সাহেব পরলোক যাত্রা করলেন। হার্ট ফেল নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে হয়ত তাঁর জীবন-আলো অসময়ে এত দ্রুত নিভে যেত না। আর নিভে গেলেও কষ্ট হয়ত কম হোত। হার্ট ফেল হূদপৃন্ডের একটি নাজুক অবস্থা যা সময়মত নির্ণয় করে যথাযথ চিকিত্সার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। হূদপিন্ড একটি ফাপা মাংসপিন্ড যা মানবদেহের অত্যাবশ্যক অঙ্গ। হূদপিন্ড প্রতি মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যম দেহের প্রতিটি কোষে বিশুদ্ধ রক্ত ও খাদ্যকনা পৌঁছে দেয়, একই সাথে দেহের দূষিত রক্তকে বিশুদ্ধ করনের জন্য ফুসফুসে সরবরাহ করে। দেহের প্রতিটি অঙ্গের বেঁচে থাকার জন্য হূদপিন্ডকে সূস্থভাবে বেঁচে থাকতে হয়। নিজের প্রয়োজনীয় রসদ হূদপিন্ড নিজস্ব ৩টি করোনারী আর্টারির মাধ্যমে নিয়ে থাকে। হূদপিন্ড তার কাজ ঠিকমত করতে না পারাকেই হার্ট ফেইল্যুর বলা হয় যা সহজভাবে হার্ট ফেল নামে পরিচিত। হার্ট ফেল করলে হূদপিন্ড সংকোচনের মাধ্যমে রক্ত বের করতে পারে না ফলে ফুসফুস, পা এবং পেটে পানি জমে যায়। হার্ট ফেইল্যুর হঠাত্ হতে পারে আবার ধীরে ধীরে হতে পারে। হার্ট ফেইল্যুর বা হূদপিন্ডের ব্যর্থতা
বা কর্মহীনতার জন্য সময়মত প্রয়েজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরী।
অনেকে ভুলক্রমে হার্ট এ্যাটাক
এবং হার্টফেইলকে একই রোগ
ভেবে থাকেন। হার্ট এ্যাটাক এবং হার্ট ফেইলর আলাদা সমস্যা,
যদিও একটির কারণে অন্যটি
হতে পারে। আবার দুটি
একসঙ্গেও হতে পারে। বয়স
বৃদ্ধির সাথে সাথে হার্ট ফেইলুরের সম্ভাবনা ও তীব্রতা বেড়ে যায়, সেই সাথে কমে যায় আরোগ্যের সুযোগ। হার্ট ফেইলুর কেন হয় এবং কি কি কারণে চরম আকার ধারণ করে তা আগে থেকে জানা থাকলে এই জীবন্ত মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
হার্ট ফেলের কারণ
হার্ট এটাক (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, আনষ্টেবল এনজাইনা), উচ্চ রক্ত চাপ, হার্টের ভাল্বের সমস্যা, এনিমিয়া (রক্তশূণ্যতা), হার্টে ভাইরাস সংক্রামণ, থাইরয়েড গ্রন্থির রোগ, পেরিকার্ডিয়ামের রোগ,
সিসটেমিক রোগ ইত্যাদি।
যে সব কারণে হার্টের সমস্যা থাকাকালে হার্ট ফেইলুর চরম পর্যায়ে যেতে পারে-
১. মায়োকার্ডিয়াল ইসকেমিয়া / ইনফার্কশন।
২. সংক্রমণ (Infection)
৩. হূদপৃন্ডের ছন্দহীনতা, যেমন: Atrial Fibrillation
৪. ডায়াবেটিস ।
৫. হার্ট ফেলের অপর্যাপ্ত চিকিত্সা।
৬. শরীরে পানি ধরে রাখার মত ওষুধ ব্যবহার,যেমন-ব্যথানাশক, ষ্টেরয়েড।
৭. গর্ভাবস্থা, রক্তশূন্যতা ও থাইরয়েডের রোগ
৮.শরীরে অতিরিক্ত পানি প্রয়োগ।
হার্ট ফেলের উপসর্গ
১. শ্বাস কষ্ট
২. শরীরে অতিরিক্ত পানি বা ইডেমা
৩. কাশি
৪. দূর্বল লাগা
৫. রাতে অতিরিক্ত প্রস্রাব হওয়া
৬. ক্ষুধা মন্দা, বমি ভাব
৭. বুক ব্যথা
৮. জটিলতা নিয়ে উপস্থিতি, যেমন-
কিডনি বিকল ইলেকট্রলাইটের তারতম্য, লিভারের সমস্যা, ষ্ট্রোক,
হূদপৃন্ডের ছন্দহীনতা।
রোগ নির্ণয়
১. রোগীর ইতিহাস
২. দৈহিক পরীক্ষা
৩. ইসিজি
৪. ইকোকার্ডিওগ্রাম
৫. রক্ত পরীক্ষা
৬. বুকের এক্সরে
৭. এনজিওগ্রাম
হার্ট ফেইলুর-এর চিকিত্সা
হূদরোগ চিকিত্সকের অধীনে চিকিত্সা গ্রহণের পাশাপাশি জীবন যাত্রায় পরিবর্তন প্রয়োজন। ধারাবাহিকভাবে চিকিত্সা চালাতে হবে। চিকিত্সার ব্যাপারে অবহেলা কোন মতেই কাম্য নয়। ফেইলুরের- এর রোগীর অবস্থা যে কোন সময়ে খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই হূদরোগের চিকিত্সকের তত্বাবধানে যথাযথ চিকিত্সা চালিয়ে যেতে হবে। জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্য হার্ট ফেইলুরের চিকিত্সার বিকল্প নেই।
হার্ট ফেল প্রতিরোধের জন্য যা করতে হবে-
১. ধূমপান/ তামাক/ জর্দা/ গুল/ নস্যি বর্জন করতে হবে।
২. কাঁচা/ভাজা সকল প্রকার আলগা লবণ বন্ধ করতে হবে।
৩. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস থাকলে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৪. কায়িক শ্রম
৫. উত্তেজনা পরিহার
৬. যে কোন সংক্রমণ-এর চিকিত্সা করাতে হবে জরুরি ভাবে।
৭. রক্তশূণ্যতা পূরণ করতে হবে।
৮. ওজন আদর্শ মাত্রায় রাখতে হবে
৯. সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে।
১০. পরিমিত ঘুম ও বিশ্রাম নিতে হবে
১১. আদর্শ জীবন যাপন করতে হবে।
শেষ কথা-
হার্ট ফেইলুর একটি ধারাবাহিক রোগ যা নিয়মিত চিকিত্সা ও জীবন যাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মনে রাখা দরকার Once Heart Failure means always Heart Failure. তাই হূদরোগ বিশেষজ্ঞের তত্বাবধানে নিয়মিত চিকিত্সা এবং প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে হবে।
nঅধ্যাপক ডা: লিয়াকত হোসেন তপন
অধ্যক্ষ, শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেল কলেজ, গোপালগঞ্জ
চেম্বার: মেডিনোভা মেডিকেল
সার্ভিসেস লি:
উত্তরা শাখা, ঢাকা