সোনারগাঁয়ের বড় সরদার বাড়ির কাজ শুরু করতে গিয়ে প্রথমত আমাদের একটা দীর্ঘ গবেষণার ভেতর যেতে হয়েছে। গবেষণা অনেক ধরনের হতে পারে। স্থাপত্যের ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক ইতিহাস—এরকম নানান ধরনের ইতিহাস-গবেষণা রয়েছে। স্থাপনার ড্রয়িং করে, দালানে ব্যবহূত উপকরণ দেখে সেটার স্থাপতিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা মেলে। এমনকি ছাদ, ছাদ-নির্মাণের কৌশল, দেয়ালের পুরুত্ব দেখে, এরকম নানান স্থাপত্য-গবেষণা দ্বারা দালানের নির্মাণকাল অনুমান করা সম্ভব। আরেকটা ব্যাপার হলো, দালান বা স্থাপনাটি কী কাজে ব্যবহার করা হতো। সেটার রুমের আয়তন, একটার সঙ্গে আরেকটা রুমের বিন্যাস এসব দেখেও অনুমিত হয়, কী কাজে ব্যবহূত হতো। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভবন হলে তার বিশাল শেড প্রয়োজন, আবাসিক ভবন হলে তার পাশে টয়লেট দরকার বা অন্য সুবিধাগুলো দরকার, একটা বড় বেড থাকা দরকার। কিন্তু আমরা যেটা বলতে পারি না, সেটা হলো—আসলে কে ভবনটি নির্মাণ করেছেন, নির্মাতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদি। এটা কিন্তু ঐতিহাসিক সত্যতায় গবেষণা করে বের করা যায়। সেদিক থেকে বলা যেতে পারে, আমরা ব্যর্থ হয়েছি আসলে বড় সরদার কে ছিলেন সেটার সঠিক তথ্য পেতে। এটা অনুসন্ধান-লব্ধ হয়নি অনেক বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করেও, শেষমেষ যেটুকু পেয়েছি, তার সামান্য বর্ণনা দিই, ১৯২৩ সালে একটা গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল, সেখানে উল্লেখ আছে—যিনি বন্দরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন তার নাম ছিল সরদার। এছাড়া সরদারের আর কোনো উল্লেখ বা সূত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সামনের ভবনটার গায়ে লেখা আছে ১৯১০ সালে ভবনটা তৈরি হয়েছে। তার মানে বড় সরদার এটা তৈরি করেন। গোপিনাথ সাহা সরদার বা এরকম নাম ফলক আছে তিন-চারজনের। ভবনটি নির্মাণ করেছেন সরদার পরিবার, তা আমরা এই ফলকগুলো দ্বারা জানি এবং যা প্রমাণিত। কিন্তু আমরা যখন স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করি, সেটা করতে গিয়ে দেখি, ভবনের ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। পুরো এলাকা বা কমপ্লেক্সটি আটটি ভবন দ্বারা বিন্যাসিত। প্রতিটি ভবনের নির্মাণশৈলী বা নির্মাণকাল ভিন্ন। সবচেয়ে পুরাতন ভবনটি তৈরি হয় মুসা খাঁ-র সময়। এই সোনারগাঁয়েই আরেকটি ভবন আছে, যার নাম মুসা খাঁ গেট। এ কমপ্লেক্স-এর ভেতর আরো একটি ভবন লুকনো আছে, যেটা পুরোপুরি মুসা খাঁ-র ভবনের মতো দেখতে। একদম প্রতিচ্ছবি। কাজ করতে গিয়ে দেখতে পাই পেছনে আরো তিনটা ভবন রয়েছে। যেগুলো আসলে সেই সময়ের, মুসা খাঁ ও প্রাক মোগল আমলের। তো প্রশ্ন আসে মোগল আমল বুঝব কীভাবে? সেটা উপলব্ধ হয় ছাদের গঠন, ছাদের ইট, কড়ি-বর্গার ব্যবহারহীনতা, বিম বা কাঠ এ সমস্ত দেখে। ঔপনিবেশিক ভবনগুলো যেভাবে তৈরি হয়, এই ভবনগুলো সে রকম না। একেবারে ইট দিয়ে তৈরি ছাদ ও মেঝে। এ রকম নির্মাণশৈলী আসলে প্রাক মোগল আমলের। পেছনে তিনটি এবং মাঝে একটি ভবন পাই, সেগুলো প্রাক মোগল আমলের বা মুসা খাঁ-র সময়কার। আর বাকিগুলির একটা দীর্ঘ বিরতি আছে। প্রায় ১৫০-২০০ বছর পর নির্মাণ করা হয় বাকি ভবনগুলো। মোগল আমল বা বারো ভূঁইয়াদের আমল শেষে রাজধানী যখন অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়, যেকোনো কারণেই ভবনটা তখন পরিত্যক্ত হয়ে যায়। প্রায় ১৫০ বছর এসব ভবনগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। তারপর সরদাররা যখন এগুলো কেনেন, উনারা আবার নতুন চারটি ভবন নির্মাণ করেন। এর সঙ্গে একটা বারান্দা তৈরি করেন সবগুলি ভবনকে যুক্ত করার জন্য। এসব বারান্দা ঔপনিবেশিক আমলের, যাতে অনেক কারুকাজ। অন্যদিকে মোগল আমলের নিদর্শনে ওরকম কারুকাজগুলো নেই, সমান, শুধু লাল রঙের ভবন, চুন-সুরকির ভবন। এই বৈশিষ্ট্যগুলো দেখে আমরা ভবনগুলোকে শনাক্ত করি। স্থাপত্য-গবেষণার মাধ্যমে ভবনের নির্মাণকাল কিছুটা অনুমিত। কিছু ভবন আছে প্রায় মুসা খাঁ-র সময়কার, আর অনেকগুলো ভবন হলো মাত্র ১০০ বছর আগেকার অর্থাত্ ব্রিটিশ শাসনামলের এই দুই ধরনের ভবন আমরা পাই। আদি রঙে সাজিয়ে আমরা ভবনগুলোকে উপস্থাপন করি। যেটা ঔপনিবেশিক ভবন, ঔপনিবেশিক আমলের রঙে সাজানো অর্থাত্ সাদা এবং অন্যটা চুন-সুরকির।
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ করার অনেকগুলো উদ্দেশ্য। একটা হলো—এটাকে যদি আমরা গোল বা প্রধান লক্ষ্যও বলি, স্থাপনার জীবনকে আরও অনেক বছর প্রলম্বিত করা। জীবনটাকে দীর্ঘ করাই হলো সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য। এখন জীবনটাকে প্রলম্বিত করতে যা কিছু করা প্রয়োজন, যেমন ভবনে যদি লোকজন এনে বসবাস করানোর প্রয়োজন মনে করি, পরিচর্যার জন্য তাও করা উচিত। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, ভবনটা যেন আরও লম্বা সময় পর্যন্ত টিকে থাকে। এই কাজের সংরক্ষণে আরেকটা দায়িত্ব হলো যুক্ত, প্রাচীন সময়ের ভবনটাকে তো এই আধুনিক সময়ের মতো করলে হবে না। আদি সময়ের মতো নির্মাণকৌশল ব্যবহার করলেই ভবনটার আরও স্থায়িত্ব বাড়বে। আমি যদি একটা চুন-সুরকির ভবনকে সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করে দিই, তাহলে কিন্তু ভবনটা মারা যাবে বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে। আমরা বলি চুন-সুরকি নিশ্বাস নেয় এবং প্রশ্বাস ছাড়ে। অর্থাত্ চুন-সুরকির দেয়াল আর্দ্রতা শোষণ করে এবং প্রতিক্ষেপণ করে। আমাদের প্রথম কাজ ছিল—সিমেন্ট আর যত প্লাস্টার ছিল সব ফেলে দেওয়া। আজ থেকে ২৫ বছর আগে সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ ভবনটা রিস্টোর করার সময় সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করে দেয়। সব সিমেন্ট ফেলে দিয়ে তারপর আমরা আবার চুন-সুরকির প্লাস্টার করি। আগে যেভাবে করা হয়েছিল, যেই উপাদানসমূহ দেওয়া হয়েছিল, সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করা হয়। সংরক্ষণের আরেকটা লক্ষ্য হলো—পুরনো নির্মাণ-পদ্ধতিকে আবার ব্যবহার করা।
এখন আপনি বলতে পারেন, আগে কীভাবে করেছিল তা আপনি জানলেন কীভাবে? কিছু বইপত্রে ওই সময়ের নির্মাণশৈলীর প্রমাণ পাই, আর কিছু প্রথাগতভাবে চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
চুন-সুরকির মিস্ত্রি এখনও যথেষ্ট পরিমাণে আছে। ভবন সংরক্ষণ কাজের ব্যয় আধুনিক ভবনের তুলনায় খুবই কম। মূল খরচ জনবলে। আমরা ব্যবহার করি তিন নম্বর বা কম পুড়ানো ইট। এর দাম আদতেই কম। কারণ এটা গুঁড়ো করে পেস্ট করতে হয়। এক নম্বর ইট গুঁড়ো করা কঠিন। আর চুনের তো দাম খুবই কম। এই দুইটাই হলো আমাদের ভবনের মূল উপাদান। এর সঙ্গে দেশীয় বা সনাতন উপকরণ সংযুক্ত করি, সেগুলো হলো প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত সুপারির কষ, খয়ের, কলুইয়ের ডাল ইত্যাদি। তারপর যেমন পোকামাকড় যেন না ধরে তার জন্য সবসময় রাব বা গুড় ব্যবহার করি। যেন ভবনের দেয়াল নষ্ট না হয়। এটা অ্যান্টি টারমাইড। জীব ও উদ্ভিদজনিত যে বৃদ্ধিগুলো হয়, সেগুলোকে প্রতিহত করে কিন্তু রাব। রাব হচ্ছে গুড়ের একদম নরম স্তর। এগুলো মিশ্রণ করা হয় মসলার মতোই। উপাদানগুলোর কথা আমরা বইপত্রে পাই, পাই না যেটা, সেটা হলো এটার অনুপাত। এক বালতির মধ্যে এক চামচ লবণ দেব, না তিন চামচ চিনি দেব... ওই অনুপাতটা আমরা জানি না। ওটা আমরা পরীক্ষা করে করে দেখেছি।
প্রথম দেখি প্লাস্টারটা শক্ত হয় কিনা। চুন আর সুরকির অনুপাতটা কেমিক্যাল বিশ্লেষণ করে বলা যায়। কিন্তু তিন নম্বর উপাদানটা কী, ওই যে কতটুকু সুপারির কষ, কতটুকু গুড় এটা বলতে পারব না, অনেকটা অনুমানভিত্তিক পরীক্ষা করেও করতে হয়। এ ভবনে দরজা-জানালায় অনেক কাঠ ব্যবহার হয়। তখনকার সময় লোহা-কাঠ ব্যবহার করা হতো। আমরা লোহা-কাঠটা বাদ দিয়েছি, কারণ তা খুব ভারী। ভবনটা অনেক পুরনো, লোহা-কাঠের ওজন নিতে পারবে না। লোহা-কাঠের পরিবর্তে জারুল কাঠ ব্যবহার করেছি। কেননা জারুল কাঠে এ দেশে নৌকা বানানো হয়। যা সারাবছর পানিতে থাকে। কিন্তু পচন ধরে না। এভাবে আমাদের আবহাওয়ায় যা প্রযোজ্য, সেসব উপাদান আমরা ব্যবহারের চেষ্টা করেছি।
আমাদের এখানে স্থাপত্যের ইতিহাসবিষয়ক গবেষণা খুব কম হয়েছে। আমরা যে কাজটা করলাম, এই ভবনটা সংরক্ষণ করা মানেই হলো আমরা কিন্তু স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছি। অনেক তথ্য পাওয়া গেল এতে। তথ্যগুলো হলো—আমাদের অঞ্চলের কোনো ভবন-এর দেয়াল প্লাস্টার ছাড়া ছিল না। আমরা বর্তমানে পাহাড়পুর দেখি, প্লাস্টার নেই। কান্তজির মন্দির দেখি, প্লাস্টার নেই। তার মানে এই না যে, প্লাস্টার ছিল না। আমাদের প্রতিটা ভবনেই প্লাস্টার ছিল। প্লাস্টার না থাকলে দেয়াল পানি শোষণ করবে। আমাদের এখানে ঐতিহাসিক ভবনগুলির বর্তমান অবস্থা দেখে একটা ভুল ব্যাখ্যা করা হয় যে, আগে আমাদের ভবনে প্লাস্টার ছিল না। এই ধারণাবশত অনেক স্থপতি বাংলাদেশে প্লাস্টার ছাড়া ‘বাংলা ইটের’ বাড়ি বানাচ্ছেন। এটা পুরোপুরি ভুল এবং আমাদের মতো বৃষ্টিপ্রবল দেশে ভবনের জন্য ক্ষতিকারক। কারণ প্লাস্টার এখানকার আবহাওয়ার জন্য অতি জরুরি।
পুরা দেশ জরিপ করে কোন কোন ভবনটা হেরিটেজ ভবন, এটা কিন্তু সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগের দায়িত্ব, এ কাজটা সরকার করছে বা করার চেষ্টা করছে যথাযথভাবে। তালিকায় এখন হয়তো চারশ’ ঐতিহাসিক ভবন আছে, এটা ঠিকমতো করা গেলে একসময় কমপক্ষে চার হাজার হয়ে যাবে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটা গ্রামে একটা করে জমিদার বাড়ি পাবেন, এগুলো তো সংরক্ষণের তালিকায় আনা দরকার। এটা সরকারের কাজ, আমরা সহযোগিতা করতে পারি। ঐতিহ্যভবনের তালিকাভুক্তি করা ছাড়াও সরকারি প্রত্নতত্ব বিভাগ আর্কিওলজিস্টদের দ্বারা নতুন নতুন প্রত্নতত্ব আবিষ্কার করতে পারে। তারপর হলো তা সংরক্ষণের কাজ। এটা সরকারের একা করার বাধ্যবাধকতা নেই। সারা দুনিয়াতেই দেখা যায় অনেক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংগঠনও এধরনের কাজ করে। ‘বড় সরকার বাড়িসংরক্ষণ প্রকল্প’ তার প্রথম উদাহরণ। ইয়াংওয়ান কোর্পোরেশন নামক কোরিয়ান একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান-এর আর্থিক সহযোগিতায় ও সার্বিকতত্ত্বাবধানে এই বড় সরকার বাড়ি সংরক্ষণ প্রকল্প শেষ হয়। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের এই মডেল বাংলাদেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক এবং সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট