জীবনের ভ্রমণ

জীবনের গল্পের যেমন শেষ হয় না, ভ্রমণের গল্পেরও তেমন শেষ হয় না। জীবন তো একধরনের ভ্রমণই, তারপরও জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি জীবিকার তাগিদে অথবা সেই তাগিদের বাইরে রোমাঞ্চের খোঁজে, নিছক ভালোলাগায়, আশপাশের, দূরে-কাছের কতশত স্মৃতিময় ভ্রমণের গল্প আমাদের জীবনে জমা হয়, সেই গল্পের কোনো শেষ নেই।

আমাদের শৈশব-কৈশোরে বেড়ানো বলতে বোঝানো হতো জীবনে কোনো একবার আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, এর বাইরে ভ্রমণের কোনো চল ছিল না। এখন যেমন খুব কম বয়স থেকেই বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেরিয়ে পড়া যায়, হাইকিং-এ যাওয়া যায়, সেগুলোর উপায় ছিল না তেমন। তাই যে বন্ধুর মামা কক্সবাজারে, খালা শ্রীমঙ্গলে থাকত এবং তারা প্রতি শীতে না হলেও দুই-চার বছরে সেখানে একবার ঘুরতে যেত। তারা আমাদের বেশ ঈর্ষার কারণ ছিল বৈকি!

কিন্তু পরিবারের সদস্যদের সাথে ঘুরতে না পারলেও আমার ভ্রমণ জারি ছিল প্রতিনিয়ত হিমালয় থেকে দুর্গম গিরি কান্তার মরু পেরিয়ে আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমি হয়ে আমেরিকার প্রেইরি ছুঁয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের অতলে—সবটাই খসখসে বইয়ের পাতার মাধ্যমে! রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে মায়ের চাকরির সুবাদে সেই বিশাল গুপ্তধনের খনি খুব ছোটবেলা থেকে আমার জীবনে লেপ্টে ছিল, যার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।

সেই গুটিগুটি কালো কালো হরফ নিংড়ে যখন রস আস্বাদন করা শিখে গেছি, সে তখন থেকেই আমি আর একাকী নই, বইয়ের সমস্ত চরিত্রদের সাথে মিশে তাদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি আমি আর হাকলবেরি ফিন, টম সয়্যার, রবিনসন ক্রুসো, লরা ওয়াইল্ডার, মাস্কেটিয়ারের দল, টারজান, এদের সবাই তখন আমার প্রাণের বন্ধু! এদের সাথেই যেন আমি তাথিয়া তাথিয়া খুঁজে ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য।

এসএসসি পরীক্ষার পরপর রেজাল্টের আগেই এক বাল্যবন্ধুর সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম তার দাদুবাড়ি বরিশালের উজিরপুরের কারফা গ্রাম, পথে আরও ছিল খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর। কী যে অপূর্ব আনন্দের সেই রঙিন অভিজ্ঞতা, বিভূতিভূষণের অপুর বিস্ময় আমাদের দু’চোখে লেপ্টে, জগতের যাই-ই দেখি, অনেক বেশি সুন্দর লাগে! রেলগাড়ির চাকার শব্দকে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম ধ্বনি মনে হয়, দক্ষিণবঙ্গের আকাশ কি আরেকটু নীল? সবুজ কতটা প্রাণময় সবুজ! সেই প্রথম আলাদাভাবে মনের আনন্দে চোখে দেখার নেশা লেগে যায়। এরপর এইচএসসি দিয়ে বন্ধুদের সাথে সমুদ্রভ্রমণে যেয়ে টেকনাফের হোয়াংইক্যং নামের তখন এক ছোট্ট জনপদের ফরেস্ট অফিসে ক’দিন থেকে ছিলাম, পরে রাঙামাটির কাপ্তাই, এভাবেই বন-পাহাড়-সাগর-নদীর সাথে সখ্য আরো বাড়তে থাকে। মনে হয় বই পড়ে, বইয়ের চরিত্রদের সাথে সাথে সারা পৃথিবী ঘুরে, জুল ভার্নের নায়কদের মতো সম্ভব-অসম্ভব সবখানেই যাত্রা করছি, সে ঠিক আছে, কিন্তু বাড়ির কাছে চক্ষু মেলিয়া ‘একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু’ দেখার আনন্দও নেহাত কম নয়!

সেই সাথে পেয়ে বসে প্রকৃতিতে পাখি দেখার নেশা, নতুন নতুন পাখি আবিষ্কারের চেষ্টা নিজের জীবনে এবং বাংলাদেশের জন্য, সেই সুবাদেও ঘোরা হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সকল বন-নদী-হাওড়-চরাঞ্চল, সমস্ত কোনায় কোনায়। প্রকৃতিতে ভ্রমণের পেছনে পাখি দেখার নেশা যে অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে সাহায্য করেছে তা বলাই বাহুল্য। এভাবেই বেলা বয়ে যায় হিমালয়-আল্পসে পর্বতারোহণের নেশার সাথে সাথে আন্দিজ-আমাজন-আফ্রিকা-তিব্বত-সাহারা সবখানে যাবার স্বপ্ন আস্তে আস্তে পূর্ণ হতে থাকে, কিন্তু সবই যেন ছোটবেলায় পড়া বইগুলোর ফসল।

এভাবেই পুরো পৃথিবীটা ঘোরা আর সর্বগ্রাসী নেশায় মাতাল হয়ে এখন পর্যন্ত দেখা হয়েছে ৬ মহাদেশ, ৫ মহাসাগর। একসময় দেশ গুনে গুনে নতুন ক’টা দেশে গেলাম সেটা জানার বাচ্চামি ইচ্ছে ছিল, কিন্তু একপর্যায়ে মনে হলো দেশ তো আসলে মানুষের তৈরি একটা ধারণা, একটা সীমানামাত্র, যুগে যুগে কালে কালে দেশ পরিবর্তন হয়, একই এলাকা নতুন দেশের নামে রূপান্তরিত হয়, আসলে সারা পৃথিবীই তো আমার দেশ! আর খুব অবাক লেগেছিল ভৌগোলিক উত্তর মেরুতে যেয়ে। সেখানে একটি ম্যারাথন দৌড়ের জন্য ২০০৭ সালে আমরা গিয়েছিলাম, যেয়ে দেখি এত ব্যয়বহুল, এত ঝুঁকিপূর্ণ একটি স্থান অথচ সেটি কোনো দেশের সীমানার মধ্যে হওয়া তো দূরে থাক, কোনো মহাদেশেই পড়ে না! উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার মিলনস্থলে উত্তর মেরু অবস্থিত! তাহলে আমি দেখতে পাচ্ছি যে—পৃথিবীর অতি আরাধ্য, অতি দুর্গম এবং সেই সাথে অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের কাছে কাঙ্ক্ষিত বেশকিছু স্থান কোনো দেশ বা মহাদেশের সীমানা হতে পারে না। কাজেই দেশ গুনে গুনে ঘোরা খুব কাজের কিছু বলে মনে হয় না, পথে নামার নেশা থাকলে।

অ্যাডভেঞ্চারের সাথে সাথে আরো হাতছানি দিয়ে ডেকেছে ইতিহাসকে ছোঁয়ার নেশা। তেরোশো বছর আগে বাংলাদেশে স্থাপিত হয়েছিল এক অতি অসাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, যার নাম ছিল সোমপুর বিহার, যা বর্তমানে নওগাঁর পাহাড়পুরে অবস্থিত, সেটা আমার দাদার বাড়ির পাশেই। প্রথমবার পাহাড়পুর দেখার পর আদি বাংলার ইতিহাসময় স্থানগুলোকে দেখার জন্য একে একে বাংলাদেশের সমস্ত ঐতিহাসিক জায়গা ঘুরে দেখা হয়েছে। ভাবার চেষ্টা করেছি একসময়ে পৃথিবী থেকে এখানে ঘুরতে আসা নানা পর্যটকদের অনুভূতি এবং তত্কালীন মানুষের জীবনযাত্রা।

ইতিহাসের সুলুক-সন্ধানে একসময় পাড়ি জমিয়েছি মুর্শিদাবাদ হয়ে দিল্লি থেকে ইউরোপ! লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট জাদুঘরে মীরজাফরের ব্যবহূত হাতির দাঁতের চেয়ার থেকে ব্রিটিশ জাদুঘরে টিপু সুলতানের সোনালি বাঘের ছাপ আঁকা তরবারি সবকিছুই দেখেছি শিশুসুলভ কৌতূহলে উচ্ছ্বাস নিয়ে।

ইতিহাসকে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষায় যাওয়া হয়েছে ট্রয় নগরীতে, সেখানে শিহরিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে, হেক্টর আর অ্যাকিলিসের যুদ্ধ এখানেই কোথাও হয়েছিল, যা অমর হয়ে আছে হোমারের কাব্যে! একই অনুভূতি পেয়েছিলাম আলেকজান্দ্রিয়ায় দাঁড়িয়ে, ভূ-মধ্যসাগর পাড়ের আলেকজান্দ্রিয়া পৃথিবীর সে আমলের জ্ঞান-বিজ্ঞানে সবচেয়ে উন্নত শহর, আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সত্যিকারের বাতিঘর আলেকজান্দ্রিয়া সেই লাইব্রেরি। বর্তমান অবস্থানে দাঁড়িয়ে অভাগিনী বিদুষী হাইপেশিয়ার কথা বড্ড মনে পড়ছে।

ইতিহাসের প্রথম পর্যটকদের আকর্ষণ হিসেবে মিশরের পিরামিড দেখার পরপরই মমির রহস্য জানার চেষ্টা করে শুধু মিশরীয় পিরামিড নয়, মায়ান সভ্যতার পিরামিড দেখতে স্মৃতি পাড়ি জমিয়েছিল মেক্সিকোতে ও সেখানের পিরামিড-রহস্য-বন-রঙ-আদিবাসী সবটুকুই যেন এক অন্যধরনের স্বাদ নিয়ে এল আমাদের জীবনে। সেই রোমাঞ্চের সন্ধানে বিশাল দেশ মেক্সিকোর মায়ান নগরীগুলো ভ্রমণের পরে গুয়াতেমালার সীমান্ত থেকে আমরা এলাম ইনকাদের দেশ পেরুতে, সেখান থেকে বলিভিয়া হয়ে, অভিভূত চিত্তে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য জায়গায় ইতিহাস ও মানুষের খোঁজে।

ঘুরতে ভালো লাগে, দেখতে ভালো লাগে, জানতে ভালো লাগে। কিন্তু মন ঠিক কী দেখতে চায়, আমরা নতুন কোনো জায়গায় গেলে? সেটা একেক মানুষের ক্ষেত্রে একেক রকম। আমার নিজের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে ভালো লাগে অবারিত প্রকৃতি, সেখানে বুনোপশু, পাখি থাকলে আর কিছুই দরকার নেই। এরপর আসে ঐতিহাসিক স্থাপনা, বিশেষত যেখানে জ্ঞানের সাথে মিশে থাকে জানা-অজানা রহস্য। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে সেখানের লোক-সংস্কৃতি যদি হয়, অনেক অনেক প্রজন্মের পুরনো। আসে রঙ ও সংগীতের কথা, রঙ বলতে স্থানীয়দের ঘর-দোর, যানবাহন বা পোশাক-আশাক। আর সংগীতের পাগল  তো আমরা সবাই। পুরনো বইয়ের দোকানের কথা উল্লেখের দরকার আছে বলে মনে হচ্ছে না, সেটা যেকোনো ভবঘুরের কাছেই অতি আকর্ষণীয় স্থান! এমন তালিকা বাড়তেই থাকে, এখানে যোগ দেয় খাবারও। ব্যক্তিগতভাবে আমি ভোজনরসিক না হলেও নিত্যনতুন খাবার চেখে দেখতে কোনো আপত্তি করবার কারণ খুঁজে পাই না। অনেক স্থানেই ওপরের তালিকার একাধিক জিনিস মিলে যায়, তখন ভালো লাগে, ভ্রমণটা আরো বর্ণময় হয়ে ওঠে বহুমাত্রিকতার ছটায়।

আসলে কিসের জন্যে এই আসমুদ্রহিমাচল ভ্রমণ? কী দেখতে চায় মানুষ? কী জানতে চায়? কারণ দিনের শেষে ভ্রমণ করা জিনিসটা খুব একটা সহজ নয়; বরং বেশ সাহসের এবং পরিশ্রমের ব্যাপার। তবে পৃথিবীর পথে পথে এই যত্সামান্য ভ্রমণের পর আমার উপলব্ধি—আমরা সময়কে উপভোগের জন্য, জীবনকে পূর্ণতা দেবার জন্যে ভ্রমণ করি। সেটা অন্যকে জানানোর জন্য নয় (অন্যরা জানলে ভালো, যে কারণে আমরা লিখি, ছবি তুলি, কিন্তু সেটি মুখ্য নয়)। অনেকেই নিজেকে হারিয়ে ফের খুঁজে পাবার জন্য পথে নামেন, অনেকে সংসারজ্বালা থেকে সামান্য সময় নিজেকে আলাদাভাবে দেবার জন্যই ঘুরে ঘুরে বেড়ান, অনেকেই নব শিল্প বা সাহিত্য সৃষ্টির তাগিদে। কিন্তু আমি কেন ভ্রমণ করি? মূল কারণ একটাই—কারণ ভ্রমণ আমি উপভোগ করি, বেঁচে থাকার মতোই।

 

লেখক :পরিব্রাজক