কালীগঙ্গা নদীপাড়ের গ্রাম আষাঢ়ে কৃষি শ্রমিকদের কাজ জোটে না। ঘরে খাবার নেই । না খেয়ে তাদের দিনাতিপাত করতে হয়। বর্ষাশেষে অগ্রহায়ণের নতুন ধানে যখন চারদিক ভরে ওঠে তখন চাষিদের ফসল চলে যায় মহাজনী সুদ পরিশোধে। আবারও ধান লাগানোর মৌসুম আসে, চাষিরা সার বিষ কিনতে সুদে পড়ে। এই চক্রের মধ্যেই ছোটবেলা কেটেছে আমার।
এই শোষণ চক্রের হাত থেকে মুক্তি খুঁজতে কিশোর বয়স থেকেই কালীগঙ্গা নদীর ধারে দিনের পর চিন্তা করে কাটিয়েছি। কুষ্টিয়ার কালীগঙ্গা নদীর পাড়ের গ্রামগুলোতে ব্রিটিশ আমলের নীলকরদের শোষণের চিহ্ন, নীলকুঠিও কিশোর বয়সে নাড়া দেয়, একইভাবে পদ্মার দক্ষিণপাড়ের আমাদের পূবপুরুষদের নীলকরদের সাথে লড়াইয়ের গল্পও নতুন করে চাষিদের ভাবিয়ে তোলে। ফলে কৈশোরে সহপাঠীরা স্কুলের মাঠে যখন খেলতে ব্যস্ত ঠিক সেই সময় আমি গ্রামের পর গ্রামে খুঁজে ফিরেছি চাষিদের সংকটের কারণ ও সমাধানের পথ। আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। যা পড়ছিলাম তাতে চাষিদের সমাজ নেই। তাই একাডেমিক পাঠের পাশাপাশি নিজে সমাজের যোগাযোগ পাঠে মনোযোগ দেওয়ার পথ খুঁজে বেড়াই।
পাঠ, আলোচনা, চর্চা ও চাষিদের সমাজ পর্যবেক্ষণের ভেতর দিয়ে ২০০৪ থেকে ২০১১ সাল পেরিয়ে যায়। ২০১১ সালের শেষ দিকে একসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এতদিন যারা এই চর্চার সহযোগী ছিল, তাদের সবাইকে নিয়ে ঢাকায় সাপ্তাহিক আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, নগরে এই আলোচনা আর না, মাঠে নামতে হবে, যে সমাজের সমস্যা সমাধনের কথা বলছি, আমরা সেই সমাজের ভেতরে নিজেরা ঢুকে নিবিড়ভাবে সংকট ও সমাধান নিয়ে কাজ শুরু করব। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো চাষিদের সমাজে ঢুকে কৃষিকাজ শুরু করার, এবং কাজের মধ্যদিয়ে সমাজের সংকটগুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চিহ্নিত করে সমাধানে যাওয়ার।
এই কয়েক বছরে আমাদের এই ধারণা তৈরি হয়েছে—আদিকাল থেকে চাষিদের সামাজে চলে আসা যোগাযোগগুলো (একে অপরের সাথে যোগাযোগ) অনুসন্ধান করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। পরস্পর ও পরম্মরায় যোগাযোগগুলোর শক্তি কাজে লাগানো সম্ভব হলে এই ভূমিকেন্দ্রিক সমাজের সংকটগুলো কাটিয়ে সব প্রাণের মঙ্গলজনক সমাজ তৈরির পথ বের হবে। এই সময়ই সম্মিলিতভাবে কাজটি করার জন্য প্রান্তজনীয় যোগাযোগ গবেষণা কেন্দ্র-প্রয়োগ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয় । প্রয়োগ চর্চায় বলা হয়, কয়েক হাজার বছর ধরে কৃষকসমাজ বংশপরম্পরায় লড়াই করে এই ভূখণ্ডে টিকে আছে। এই লড়াইয়ের জ্ঞানগুলো এই ভূখণ্ডের মানুষের টিকে থাকার পথ বাতলে দিতে পারে।
পরের বছর জমি খোঁজা শুরু হলো। সুবিধামতো জমি হাতে এল ২০১৩ সালে। মানিকগঞ্জের দৌলতপুরের আমতলী গ্রামে আমাদের দলের নুরুল আমীন জাহাঙ্গীরের বাবার জমিতে কাজটি শুরু হয়। ঢাকা থেকে ছুটির দিনে দলবেঁধে জমিতে কাজ ও চাষিদের সাথে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছি আমরা। দীর্ঘ সময় চাষিদের সমাজ ও কৃষি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমাদের জানা হয়ে যায় সংকটগুলো কোথায়? সংকট সমাধানে নিজেরা করে দেখার পালা, শুরু হলো স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে স্বনির্ভর কৃষিচর্চা ।
চাষিদের বাড়ির গোবর ও আবর্জনা পচিয়ে সার তৈরি করে জমিতে দেওয়া হলো। পুরাতন ধলেশ্বরীর সেই জমি কিছুদিনের মধ্যে ফুল-ফসলে ভরে উঠল। গ্রামের চাষিরা দেখতে আসে, কৃষাণিরা আসে, জানতে চায় সব কিছু। কেন বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে আসা তরুণ-তরুণীরা এসেছে? এই সময় শত শত চাষির সঙ্গে আমরা সংলাপ চালিয়ে গিয়েছি। তাদের রাসায়নিক সার ও বিষের কৃষি কোন ধরনের সংকট তৈরি করছে, সেটার সমাধানে তারা কী করতে চান? আমাদের আবাদ দেখতে বললাম। তারা ফসল ও চাষপদ্ধতি দেখে সেটা প্রাকৃতিক বলে জানালেন, চাষিরা এও জানালেন, প্রাকৃতিকভাবে চাষবাদ সম্ভব হলে তারা কোম্পানির বীজ সার বিষ থেকে বের হয়ে নিজেদের সম্পদ ব্যবহার করে স্বনির্ভর হতে পারেন। চাষিদের সেই প্রাকৃতিক নামকরণের সাথে কৃষি যোগ করে আমাদের চাষপদ্ধতির নামকরণ করা হলো প্রাকৃতিক কৃষি।
পরের বছর মানিকগঞ্জসহ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের চাষিদের সাথে কাজ শুরু হয়। চাষিদের সাথে বার বার সংলাপ ও প্রয়োগ গবেষণায় প্রাকৃতিকভাবে উত্পাদিত ফসলের বিপণন সমস্যাগুলো উঠে আসে, সেটি সমাধানে বিকল্প বাজার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমরা বুঝলাম, রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত ফসল উত্পাদন ও সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় বাধা এর বিপণন। স্থানীয় বাজারে কম মূল্য, কৃত্রিম (রাসায়নিক সার ও বিষ দিয়ে উত্পাদিত ফসল) ফসলের বাজার দখল, এসব প্রাকৃতিকভাবে উত্পাদনকারী কৃষকদের কোণঠাসা করে রেখেছে। কৃষকদের রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত ফসলের ন্যায্যমূল্য না দিতে পারলে প্রাকৃতিক কৃষি সম্প্রসারণ করা সম্ভব না। তাই প্রাকৃতিক কৃষি খামারে ফসল উত্পাদনের পাশাপাশি এর বিপণনব্যবস্থার পরিবর্তনে কাজ শুরু করে।
কৃষক-কৃষাণিদের সাথে পরামর্শ করে ২০১৪ সালের অক্টোবরের ২৪ তারিখ থেকে পরীক্ষামূলক ঢাকায় প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্র চালু করে বিপণন শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে বাড়ির আঙিনায় কৃষাণিদের উত্পাদিত প্রাকৃতিক সার ও বিষমুক্ত ফসল বিপণন শুরু হয়। প্রথম দিকে সপ্তাহে ১ দিন খোলা থাকলেও এখন সেটি প্রতিদিন খোলা থাকে। ফসল সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাষিদের সংগঠন গড়ে তোলা হলো। মাঠ তৈরি থেকে বিপণন কেন্দ্র পর্যন্ত ফসলের মান নিশ্চিত করতে গ্রাম থেকে গ্রামে এখনো ছুটে চলে প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলন কর্মীরা। এর পাশাপাশি প্রাকৃতিক কৃষির তরুণ-তরুণীরা নিজহাতে খামারে প্রাকৃতিক কৃষিপদ্ধতিতে ফসল উত্পাদন করে। প্রাকৃতিক কৃষি ঢাকায় মোহাম্মদপুরে ৩/২৯, শহীদ সলিম উল্লাহ সড়কে প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্রের মাধ্যমে ফসল বিক্রি করে থাকে।
প্রাকৃতিক কৃষি শহর ও গ্রামে খাদ্য গ্রহণকারী পরিবার তৈরি হয়েছে। যে আন্দোলন প্রাকৃতিক কৃষি শুরু করেছে তাতে ইতোমধ্যে যোগ দিয়েছেন গ্রামের কৃষক, গঞ্জের ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, হাসপাতালের ডাক্তার, শহর-গ্রামের তরুণ এবং ভোক্তা হিসেবে নগরের সচেতন মানুষ। আন্দোলন স্থায়ী ও ফলপ্রসু করতে মাঠে-ঘাটে ছুটে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন কয়েকজন তরুণ-তরুণী।
চাষিদের কয়েক দশক ধরে রাসায়নিক সার ও বিষের পক্ষে মগজ ধোলাই থেকে বের করে প্রাকৃতিক কৃষিতে ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ। চাষিরা প্রাকৃতিক কৃষিচর্চায় যুক্ত হতে চাইলে প্রয়োজন বিকল্প উপকরণ সহজলভ্যকরণ, তাদের কাছে তথ্য ও জ্ঞান পৌঁছানো এবং প্রাকৃতিক ফসল উত্পাদন করা হলে লাভজনক মূল্যে বিপণন। সেই সাথে স্থানীয় জাত নিশ্চিত করতে বীজের সরবরাহ।
ঢাকা ও মাঠপর্যায়ে কাজের জন্য ১০ জন তরুণ-তরুণী যুক্ত রয়েছে। মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহ, টাঙ্গাইল-সহ ১৫ জেলার চাষিদের সাথে প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলন কাজ করে। এছাড়া চাষিদের প্রাকৃতিক কৃষি শিক্ষণ, প্রাকৃতিক সার ও বালাইদূরীকরণ উপকরণ তৈরি, দেশি বীজ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক জীবনচর্চার শিক্ষণ দিয়ে থাকে প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলনকর্মীরা। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় প্রাকৃতিক কৃষির নিজস্ব খামার ও শিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। আন্দোলনের সাথে জড়িত সবাইকেই কৃষি কাজ করতে হয়। গ্রামে গ্রামে চাষিদের সাথে সংলাপেও যান এসব তরুণ-তরুণীরা।
প্রাকৃতিক কৃষি এই সব প্রাণবান্ধব কৃষিচর্চার মধ্য দিয়ে ইতিবাচক সমাজ গড়ে তুলতে চায়। যে সমাজ পশুপাখি থেকে শুরু করে পোকামাকড়সহ সব প্রাণের জন্য ইতিবাচক হবে।
লেখক :সমন্বয়কারী, প্রাকৃতিক কৃষি