কামরুল হাসানের রাজনৈতিক সচেতনতা

চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান শুরু থেকেই রাজনীতি-সচেতন ছিলেন। প্রগতিশীল চিন্তা মনে প্রাণে লালন ও ধারণ করতেন বলেই রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাবলি তাঁকে ভীষণ প্রভাবিত করত। ফলে বিরূপ সময়ে তাঁর রং ও তুলি হয়ে উঠেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র। অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পী ও ব্যক্তিতে আমরা বিভেদ দেখি। কিন্তু কামরুল হাসান ব্যক্তি ও শিল্পী হিসেবে ছিলেন অভিন্ন সত্তা। ব্যক্তি কিংবা শিল্পীজীবনের বিশ্বাস ও কর্মে তাঁর তফাত ছিল না। শিল্পে তাঁর রাজনীতি-মনস্কতার সফল উপস্থিতি এর যথার্থ উদাহরণ। তিনি সূচনালগ্নে প্রগতিশীলতার যে পথ আঁকড়ে রেখেছিলেন, আমৃত্যু তা থেকে বিচ্যুত হননি।

কামরুল হাসান যৌবনে পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে নেতাজি সুভাষ বসুর ফরোয়ার্ড ব্লকে যোগ দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের সময়ও ছিলেন সক্রিয়। তিনি স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই—এই স্লোগান তখন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে। এ আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা। রাস্তার দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার। ...ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই প্রথম আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, ইমদাদ হোসেন, রশিদ চৌধুরী পোস্টার লিখেছে। এদের তুলির বলিষ্ঠ রেখার পোস্টার শিক্ষাঙ্গনে, রাস্তায়, গলিতে সেঁটে দিয়ে ভাষা আন্দোলনকে করা হয়েছে আরও প্রাণবন্ত। এছাড়া লেখা হয়েছে স্লোগানে, দাবীতে আকীর্ণ ব্যানার। আমি নিজেও আমার ছাত্রদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলাম সেদিন। সে জন্য আমি গর্বিত।’ এসময় ভাষা আন্দোলন নিয়ে তিনি দৈনিক আজাদে কার্টুন আঁকতেন।

প্রগতিশীলদের পথচলা মসৃণ হয় না। কামরুল হাসানেরও হয়নি। মুক্তচিন্তার জন্যে কামরুল হাসানদের প্রতিক্রিয়াশীলদের নিন্দা ও কুত্সা সহ্য করতে হয়েছে অনেক। কিন্তু দমে যাননি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন-পরবর্তীসময়ে কার্জন হলে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সাত দিনব্যাপী এ আয়োজন নিয়ে গোঁড়াপন্থিরা সন্তুষ্ট ছিল না। কামরুল হাসান লিখেছেন, ‘১৯৫৪ সালের এ সাহিত্য সম্মেলনই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রারম্ভিক প্রবাহ। এ প্রবাহ প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের দুর্গে প্রচণ্ড আঘাত হানতে পেরেছিলো। প্রমাণ পাওয়া যাবে এর সেই সময়কার ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার পৃষ্ঠায়। প্রায় দুইমাস ধরে আজাদের পৃষ্ঠায় দুই কলম হেডিং-এ প্রতিদিন আমাদের এই সম্মেলনের বিরুদ্ধে শুধু বিদ্বেষপ্রসূত বিষোদগারই ছিলো না। এতে অশালীন ভাষা প্রয়োগও করা হতো। আমরা অর্থাত্ সম্মেলনের উদ্যোক্তা এবং সমর্থকরা যে ভারতীয় দালাল ও ইসলামবিরোধী এটাই ছিলো তাদের মুখ্য বক্তব্য।’

বাঙালির সংগ্রাম ’৪৭ থেকে ’৫২, ’৫২ থেকে ’৬৬ ধারাবাহিকভাবে চলেছে। কামরুল হাসান এ স্রোতে সক্রিয় ছিলেন আমৃত্যু। ঊনসত্তরে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তিনি এতে যুক্ত হন। ওই সময় গঠিত ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’-এর তিনি সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পরবর্তীসময়ে একাত্তরের ৭ মার্চের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী পাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। ওইসময় ঢাকার হাতিরপুলের প্রতিরোধ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কামরুল হাসান। ১২ মার্চ তিনি ‘বাংলা পটুয়া সমাজ’ ব্যানারে আর্টস এনসেম্বল গ্যালারিতে সভা করেন। উদ্দেশ্য স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে শিল্পীসমাজের প্রস্তুতি। সভায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য চারটি হলো : এক. কার্টুন, পোস্টার, লিফলেট প্রভৃতি সর্বত্র সঠিকভাবে বিলি-বিতরণের জন্য স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। দুই. বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ডিগ্রিধারী শিল্পী ছাড়াও সাধারণ সাইনবোর্ড পেইন্টার এবং অন্যান্য সাধারণ শিল্পীকে সংগ্রামে শামিল করে সব ধরনের কাজের সাহায্য নিতে হবে। তিন. সংগ্রাম উচ্চ পর্যায়ে গেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। সে অবস্থায় স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আরো পটুহস্তে কার্টুন, ফেস্টুন ও পোস্টার করে সংগ্রামী বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পটুয়াসমাজ দৃঢ়সংকল্প। চার. পূর্ব বাংলার পল্লীর জনগণের, হাটের, মাঠের ও ঘাটের অতি আদরের ফুল ‘লাল শাপলা’কে সংগ্রামী বাংলার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ।

২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কামরুল হাসান ভারতে চলে যান। তখন তাজউদ্দীন আহমদ তাঁকে প্রবাসী সরকারের তথ্য ও রেডিও-এর কলা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব প্রদান করেন। শিল্পী নিতুন কুন্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, নাসির বিশ্বাস, প্রাণেশ মণ্ডল ও বীরেন সোম ডিজাইনার হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। বীরেন সোম স্মৃতিকথায় লিখেছেন :“শিল্পী কামরুল ভাই আমাদের সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন। তিনি বললেন, ‘সারা দেশ এখন মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। আমরা শিল্পীসমাজ এ যুদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন নই। আমাদের রংতুলিই এখন আমাদের হাতিয়ার। মুক্তিযোদ্ধাদের মনে দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধের উত্সাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করাই এখন আমাদের কর্তব্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘মনোগ্রাম, পোস্টার, কার্টুন, লিফলেট, ব্যানার, নকশা ইত্যাদির মাধ্যমে দেশে ও বহির্বিশ্বে জনমত সৃষ্টি করাই এখন আমাদের প্রধান কাজ।’ কামরুল হাসানের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ শুরু করলাম।”

কামরুল হাসান কেবল নির্দেশনাই দিলেন না, তিনি নিজেও কাজ শুরু করলেন। ফলস্বরূপ আঁকলেন বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’। দানবাকৃতির রক্তচোষা হিংস্র ইয়াহিয়া খান এ ছবির মূল উপজীব্য। পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যার বিরুদ্ধে চিত্রকর্মটি প্রবল ঘৃণা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আঁকা অদ্বিতীয় প্রতিবাদী শিল্পকর্ম। বীরেন সোম যথার্থ বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ‘এতটা ঘৃণা সঞ্চারকারী এবং ক্রোধ উদ্রেককারী’ শিল্প আর নেই। নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা জানান দিতে চিত্রকর্মটি সেসময় বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছিল। একইসাথে গণহত্যার চিত্র বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে ১৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার বিড়লা একাডেমিতে বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এ আয়োজনের নেতৃত্ব দেন কলকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ চিন্তামণি কর ও কামরুল হাসান। প্রদর্শনীতে কামরুল হাসানের ‘কম্পোজিশন-১’, ‘কম্পোজিশন-২’, ‘বাংলাদেশ গণহত্যার আগে’, ‘বাংলাদেশ গণহত্যার পরে’ ইত্যাদি চিত্রকর্মসহ ১৭ জন শিল্পীর ৬৬টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়।

কামরুল হাসানের রাজনৈতিক সচেতনতার আরেকটি শিল্পকর্ম ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে’। ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি স্বৈরশাসক এরশাদকে নিয়ে আঁকা এটি ছিল তাঁর শেষ শিল্পকর্ম। এটি আঁকার কয়েক মিনিট পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে’ শিল্পকর্মটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে প্রবল করতে সহযোগিতা করেছিল।

অনেকেই মনে করেন, ব্যক্তিজীবনে কামরুল হাসান যত তীব্রভাবে রাজনীতি-সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁর চিত্রকর্ম ততটা নয়। যদিও প্রশ্নটি অমূলক নয়, কিন্তু ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’-এর মতো সার্থক চিত্রকর্মটি যে শত ছবির তৃষ্ণা মেটায় তাও অস্বীকার করা যাবে না। অসুন্দরের বিরুদ্ধে কামরুল হাসানের আঁকা চিত্রকর্ম আজও সমান অর্থবহ এবং অতুলনীয়। তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রইল।